Image description

ইসরায়েলের নির্বাচন শেষ হয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কাটেনি। দীর্ঘদিন দেশটির ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আবারও সরকার গঠন করতে পারবেন কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তাঁর বিরোধীরাও প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেননি। ফলে নতুন জোট গঠনের আলোচনা সামনে এসেছে। এরই মধ্যে জনমনে ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে একটি প্রশ্ন উঠেছে। নেতানিয়াহু ক্ষমতা হারালে কি ফিলিস্তিন সংকট সমাধানের সুযোগ তৈরি হবে? নাকি নেতৃত্ব বদলালেও গাজা, পশ্চিম তীর ও ইরান প্রশ্নে ইসরায়েলের অবস্থান অপরিবর্তিত থাকবে?

 

২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ভোট গণনা শেষে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন। গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী শিবির পেয়েছে ৪৮টি এবং আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলো ১৯টি আসন। ইসরায়েলের ১২০ আসনের পার্লামেন্ট নেসেটে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন অন্তত ৬১টি আসনের সমর্থন। কোনো প্রধান জোটই সেই সংখ্যা অর্জন করতে পারেনি। ফলে নির্বাচনের ফলাফল যতটা না ক্ষমতার পরিবর্তন নিশ্চিত করেছে, তার চেয়ে বেশি সামনে এনেছে জোট রাজনীতির জটিলতা।

 

এই নির্বাচনকে শুধু নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ভবিষ্যতের প্রশ্ন হিসেবে দেখলে এর বৃহত্তর তাৎপর্য বোঝা যাবে না। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলা এবং পরবর্তী গাজা যুদ্ধ ইসরায়েলের নিরাপত্তা রাজনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। যুদ্ধ পরিচালনা, জিম্মিদের মুক্তি, সরকারের জবাবদিহি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে দেশটির সমাজে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কিন্তু নেতানিয়াহুর নেতৃত্ব নিয়ে মতবিরোধ থাকলেও ফিলিস্তিন প্রশ্নে প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে মৌলিক নীতিগত সাদৃশ্য বিদ্যমান।

 

 

নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরেই স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করে আসছেন। তাঁর সরকারের অতি-ডানপন্থী অংশ পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ এবং অধিকৃত ভূখণ্ডের ওপর ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তবে নেতানিয়াহুর বিরোধী শিবিরকে সম্পূর্ণ ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতিনিধি ভাবাও ঠিক হবে না।

 

 

 

 

দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো। যার লক্ষ্য ইসরায়েল ও স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। কিন্তু সীমান্ত, পূর্ব জেরুজালেম, শরণার্থীদের অধিকার, বসতি এবং নিরাপত্তার প্রশ্ন অমীমাংসিত। শুধু নেতৃত্ব পরিবর্তন করে এসব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।

 

 

 

 

প্রধান বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকট সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ফিলিস্তিন প্রশ্নে আমার অবস্থান বরাবরই একই—দুই জনগোষ্ঠীর জন্য পৃথক দুটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধারণাটি ‘ভুল’। একই সঙ্গে তিনি পশ্চিম তীর ও গাজার লাখ লাখ ফিলিস্তিনিকে ইসরায়েলের অন্তর্ভুক্ত করার ধারণাও প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর মতে, এমন পদক্ষেপ ইসরায়েলের জন্য বিপর্যয়কর হবে। ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনী বেসামরিক বিষয় পরিচালনা করলে তাঁর আপত্তি নেই। তবে সামগ্রিক নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ ইসরায়েলের হাতেই রাখার পক্ষে তিনি। এই অবস্থান দেখায়, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের বিরোধিতা করলেও আইজেনকট প্রচলিত দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সমর্থক নন।

 

আইজেনকট আরও স্পষ্ট জানিয়েছেন, আরব নেতৃত্বাধীন রা’আম দলকে বর্তমান অবস্থায় তাঁর সম্ভাব্য সরকারে নেবেন না। তিনি বলেছেন, তাঁর সরকারে থাকতে হলে ইসরায়েলকে ইহুদি ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। সমর্থন করতে হবে দেশটির স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ও সবার জন্য বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার নীতিকে। সেই সঙ্গে হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে স্বীকার করতে হবে এবং নির্মূল করার পক্ষে থাকতে হবে। আইজেনকটের দাবি, রা’আম নেতা মনসুর আব্বাস এসব শর্ত মানেন না।

 

সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটের অবস্থানও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি জানিয়েছেন, ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে কঠোর অবস্থান বজায় রাখবেন। একই সঙ্গে দেশটিকে ইহুদি জনগণের জন্য একটি নিরাপদ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেবেন। নির্বাচনের আগে আরব দলগুলোর সমর্থন নিয়ে সরকার গঠনের সম্ভাবনাও তিনি নাকচ করেছেন। তাঁর ভাষায়, ‘আমরা সরকার গঠনে শুধু ইহুদিবাদী দলগুলোর ওপরই নির্ভর করব’। ফলে নেতানিয়াহুর বিরোধী প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্যে মিল থাকলেও ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে অবস্থান অভিন্ন নয়।

 

তবে বিরোধী শিবিরের সবাই একই কথা বলছেন না। মধ্য-বামপন্থী ডেমোক্র্যাটস দলের নেতা ইয়ার গোলান সেপ্টেম্বরে বলেছেন, ‘একটি আরব দলও সরকারে থাকতে পারে। এটি স্বাভাবিক, যৌক্তিক, যথাযথ ও গণতান্ত্রিক’। তাঁর বক্তব্য ইসরায়েলের রাজনীতিতে ইহুদি ও আরব নাগরিকদের যৌথ অংশগ্রহণের প্রশ্নকে সামনে এনেছে।

 

এবারের নির্বাচনে আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর ১৯টি আসন অর্জন তাই বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাদের সমর্থন ছাড়া নেতানিয়াহুবিরোধী শিবিরের পক্ষে সরকার গঠন কঠিন। কিন্তু সংসদীয় সংখ্যার হিসাব এবং রাজনৈতিক সমঝোতার মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। বিরোধী নেতাদের কেউ কেউ আরব দলগুলোর সহযোগিতা গ্রহণ করতে প্রস্তুত হলেও অন্যরা তা প্রত্যাখ্যান করছেন। ফলে আরব ভোটারদের নির্বাচনী সাফল্য সরকার গঠনের সিদ্ধান্তে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা এখনো অনিশ্চিত।

 

 

 

 

ইরান ও ফিলিস্তিন প্রশ্ন পরস্পর সম্পর্কিত হলেও এক নয়। ইরানের সঙ্গে নতুন সংঘাত শুরু হলে গাজার পুনর্গঠন এবং ফিলিস্তিন প্রশ্নে কূটনৈতিক উদ্যোগ পিছিয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে আঞ্চলিক উত্তেজনা কমলে মানবিক সহায়তা এবং রাজনৈতিক আলোচনার জন্য কিছু সুযোগ তৈরি হতে পারে।

 

 

 

 

ফিলিস্তিন সংকটের সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতা অবশ্য নির্বাচনী সমীকরণের বাইরেই রয়ে গেছে। পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ, ভূমি নিয়ন্ত্রণ এবং ফিলিস্তিনিদের চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ একটি কার্যকর স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথকে জটিল করেছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত তার পরামর্শমূলক মতামতে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের অব্যাহত উপস্থিতিকে বেআইনি বলে উল্লেখ করে। আদালত অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের বেআইনি উপস্থিতি যত দ্রুত সম্ভব শেষ করা এবং অবিলম্বে নতুন বসতি স্থাপন বন্ধ করার বাধ্যবাধকতার কথাও জানায়। কিন্তু আন্তর্জাতিক আইনের অবস্থানকে রাজনৈতিক বাস্তবতায় রূপ দেওয়া এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।

 

গাজার পরিস্থিতি আরও জরুরি মনোযোগ দাবি করে। দীর্ঘ যুদ্ধের ফলে ঘরবাড়ি, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মৌলিক অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। খাদ্য, চিকিৎসা ও নিরাপদ আশ্রয়ের প্রয়োজনও রয়ে গেছে। তাই ইসরায়েলের পরবর্তী সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হবে বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, মানবিক সহায়তার প্রবেশ সহজ করা এবং পুনর্গঠনের বাস্তব পরিবেশ সৃষ্টি করা। তবে শুধু অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ করলেই স্থায়ী শান্তি আসবে না। গাজার প্রশাসন, নিরাপত্তা এবং ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও গ্রহণযোগ্য সমাধান প্রয়োজন।

 

 

এই আলোচনায় ইরান প্রশ্নকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক সামরিক প্রভাবকে ইসরায়েলের নিরাপত্তার প্রধান হুমকি হিসেবে তুলে ধরেছেন। সাম্প্রতিক সামরিক সংঘাত দুই দেশের সম্পর্ককে আরও জটিল করেছে। নির্বাচনী প্রচারেও নেতানিয়াহু ইরানকে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ইস্যু হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তবে তিনি ক্ষমতা হারালেই ইরানের প্রতি ইসরায়েলের কঠোর অবস্থান বদলে যাবে, এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।

 

ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা সীমিত রাখা এবং দেশটির আঞ্চলিক সামরিক প্রভাব মোকাবিলার বিষয়ে ইসরায়েলের প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য মিল রয়েছে। পার্থক্য দেখা যেতে পারে কৌশলে। নতুন সরকার সামরিক পদক্ষেপের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে কূটনৈতিক সমন্বয়কে কতটা গুরুত্ব দেবে, তা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নেতৃত্ব পরিবর্তন মানেই ইরান প্রশ্নে মৌলিক নীতিগত পরিবর্তন নয়।

 

ইরান ও ফিলিস্তিন প্রশ্ন পরস্পর সম্পর্কিত হলেও এক নয়। ইরানের সঙ্গে নতুন সংঘাত শুরু হলে গাজার পুনর্গঠন এবং ফিলিস্তিন প্রশ্নে কূটনৈতিক উদ্যোগ পিছিয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে আঞ্চলিক উত্তেজনা কমলে মানবিক সহায়তা এবং রাজনৈতিক আলোচনার জন্য কিছু সুযোগ তৈরি হতে পারে।

 

এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ইসরায়েলের প্রধান নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে ওয়াশিংটন দেশটির আঞ্চলিক নীতিতে প্রভাব রাখে। একই সঙ্গে মিসর, জর্ডান, সৌদি আরবসহ আরব রাষ্ট্রগুলো এবং ইউরোপীয় শক্তিগুলোর কূটনৈতিক অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আঞ্চলিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ যদি ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন এড়িয়ে যায়, তাহলে দীর্ঘস্থায়ী শান্তির ভিত্তি দুর্বল থেকে যাবে।

 

দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো। যার লক্ষ্য ইসরায়েল ও স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। কিন্তু সীমান্ত, পূর্ব জেরুজালেম, শরণার্থীদের অধিকার, বসতি এবং নিরাপত্তার প্রশ্ন অমীমাংসিত। শুধু নেতৃত্ব পরিবর্তন করে এসব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন স্পষ্ট রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সদিচ্ছা, বাস্তবসম্মত সমঝোতায় পৌঁছানোর আগ্রহ এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা। তবে নেতৃত্ব বদলালেও এসব বিষয়ে আগের অবস্থান থেকে সরে এসে মৌলিক কোনো পরিবর্তন আনার ইঙ্গিত মিলছে না।

 

  • মোহাম্মদ শাকিল ভূইয়া: সহকারী অধ্যাপক, পলিটিক্যাল স্টাডিজ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট; পিএইচডি গবেষক, শানসি বিশ্ববিদ্যালয়, চীন।