জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষনেতারা যখন ঢাকা-খুলনা লংমার্চে, তখন সেখানে দেখা গেল না জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) শীর্ষনেতাদের। অথচ ১১ দলীয় ঐক্যের আগের লংমার্চগুলোতে একসঙ্গেই ছিলেন তারা। তাহলে এই জোটে কি ভাঙনের সুর বাজছে- এই প্রশ্ন এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে।
গত ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের আগে জোটবদ্ধ হওয়া দল দুটির নেতারা অবশ্য এখনই জোট ভাঙার কথা বলছেন না। তবে ঢাকা সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় নির্বাচনে পাল্টাপাল্টি প্রার্থী ঘোষণায় এক ধরনের শীতল সম্পর্কের আভাস পাওয়া যাচ্ছে দল দুটির নেতাদের কথায়।
তবে এই দূরত্ব কি জোট ভাঙনের পূর্বাভাস, নাকি আসন্ন সিটি নির্বাচনে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করে জামায়াতের সঙ্গে দরকষাকষির কৌশল- এ বিষয়টিই এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনায়।
জোট গড়ে সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পর একসঙ্গে পথ চললেও স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে জামায়াত ও এনসিপির মধ্যে দূরত্ব বাড়ার ইঙ্গিতই পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থী ঘোষণা এবং নির্বাচনে জোটগত সমঝোতার প্রশ্নে দুই দলের মধ্যে তৈরি হয়েছে মতবিরোধ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে রাজনৈতিক সমাবেশ—বিভিন্ন জায়গায় দুই দলের নেতাকর্মীদের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের পর গতকাল শনিবার ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা-খুলনা-কুষ্টিয়া লংমার্চে এনসিপির শীর্ষ নেতাদের অনুপস্থিতি আলোচনার পালে দিয়েছে হাওয়া।
লংমার্চের আগের দিন গত শুক্রবার ঢাকায় শাহবাগে সমাবেশ করে এনসিপি। সেই কর্মসূচিতে দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এককভাবে অংশগ্রহণের পক্ষে অবস্থান তুলে ধরেন। একই সময়ে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থী হিসেবে যথাক্রমে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর নাম ঘোষণা করেন। পুরো সমাবেশে জোটের অংশ হয়েও নির্বাচনী মাঠে নিজেদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয় ও সাংগঠনিক সক্ষমতা তুলে ধরার ইঙ্গিত দেয় দলটি।
গত শুক্রবার ঢাকায় সমাবেশে নাহিদ ইসলামসহ এনসিপির শীর্ষনেতারা। ছবি: নাহিদ ইসলামের ফেসবুক পেজওই সমাবেশে আসিফ মাহমুদ ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থীর নির্বাচন পরবর্তী আচরণেরও সমালোচনা করেন। তার বক্তব্যে নির্বাচন নিয়ে আপসকামিতার প্রশ্ন উঠে আসে। ঠাকুরগাঁওয়ের নির্বাচন ঘিরে জামায়াতের অভিযোগ এবং পরবর্তী সময়ে মিষ্টিমুখের ঘটনা নিয়ে এনসিপির এই অবস্থান দুই দলের রাজনৈতিক বক্তব্যে নতুন মাত্রা যোগ করে।
জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের দল এনসিপির নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে আপাতত দলীয় পরিচয় ও নিজস্ব সাংগঠনিক শক্তি তুলে ধরতে চায় তারা। এ কারণে ১১ দলীয় ঐক্যে থাকলেও জামায়াত নেতৃত্বাধীন কর্মসূচিতে আগের মতো সক্রিয় অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
নিজেদের কর্মসূচিতেও জামায়াতের সাংগঠনিক সহযোগিতা না নেওয়ার বিষয়েও এনসিপির মধ্যে আলোচনা রয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নিজেদের প্রার্থী নিয়ে তৃণমূল পর্যায়ে প্রস্তুতি এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে দলটি।
এর পরদিন ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা-খুলনা-কুষ্টিয়া লংমার্চে বিষয়টি আরও দৃশ্যমান হয়। রাজধানীর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের দক্ষিণ গেটে লংমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও সদস্যসচিব আখতার হোসেনসহ শীর্ষ নেতাদের কাউকে দেখা যায়নি।
আগের দুটি লংমার্চে এনসিপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সক্রিয় উপস্থিতি থাকলেও এবার অংশগ্রহণ ছিল তুলনামূলক সীমিত। পরে অবশ্য এনসিপির কয়েকজন নেতা লংমার্চের বহরে যোগ দেন।
জামায়াত ও এনসিপির মধ্যে দূরত্বের অন্যতম বড় কারণ হিসেবে সামনে এসেছে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থী।
গত ১৩ সেপ্টেম্বর এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাকা উত্তরে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং দক্ষিণে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর নাম ঘোষণা করেন। অন্যদিকে জামায়াত ঢাকা উত্তরে দলটির উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন এবং দক্ষিণে ডাকসুর ভিপি আবু সাদিক কায়েমকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দুই দলই রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ দুই সিটিতে নিজেদের প্রার্থী নিয়ে মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এতে একই জোটের দুই দলের মধ্যে সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে এনসিপি চায় ঢাকার অন্তত একটি সিটিতে জোটের সমর্থন নিয়ে নির্বাচন করতে। এ নিয়ে দুই দলের নেতাদের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা হয়েছে বলেও জোটসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
তবে জামায়াত নিজেদের সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দুই সিটিতেই নিজেদের প্রার্থী রাখার অবস্থানে অনড়। শুধু ঢাকা নয়, অন্য সিটি করপোরেশনেও নিজেদের প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে দলটির।
এনসিপির একাধিক সূত্র বলছে, ঢাকার অন্তত একটি সিটিসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিটিতে জোটগত সমর্থন চায় দলটি। কিন্তু জামায়াত কোনো সিটিতে ছাড় দিতে রাজি না হলে এনসিপিও নিজেদের স্বতন্ত্র অবস্থান ধরে রাখতে চায়।
সেক্ষেত্রে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণসহ বিভিন্ন সিটি করপোরেশনে এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে এনসিপির। এতে নির্বাচনী ফলাফল যা-ই হোক, নিজেদের সাংগঠনিক সক্ষমতা ও জনসমর্থন যাচাই করতে চায় দলটি। তবে শেষ পর্যন্ত সমঝোতা হলে রাজনৈতিক অবস্থানে পরিবর্তন আসতে পারে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এনসিপির এক কেন্দ্রীয় নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে আগামীর সময়কে বলেন, ‘ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আসন্ন নির্বাচনে আসিফ মাহমুদ এবং নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে মেয়র প্রার্থী হিসেবে ঘোষণার পর থেকেই জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির কিছুটা দূরত্ব ও দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিভিন্ন এলাকায় প্রার্থী ঘোষণা নিয়েও মতবিরোধ রয়েছে। সেই জায়গা থেকেই লংমার্চে শীর্ষ নেতাদের অনেকে যাননি। তবে আপাতত জোট ভাঙার কোনো সম্ভাবনা নেই।’
এনসিপির নেতৃস্থানীয় আরেক নেতা আগামীর সময়কে বলেন, ‘জামায়াতকে আমরা একটা বার্তা দিতে চাই। সে কারণেই লংমার্চের আগের দিন এবং পরের দিন আমাদের দলের বড় দুটি কর্মসূচি রাখা হয়েছে। পাশাপাশি নিজেদের রাজনীতিকে আরও এগিয়ে নিতে চাই। এজন্য জোটের কর্মসূচিতে আমাদের অংশগ্রহণ কিছুটা কমেছে। দলের শীর্ষ দুই নেতা এবার অংশগ্রহণ থেকে বিরত থেকেছেন।’
ঢাকা-খুলনা লংমার্চে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। ছবি: জামায়াতের ফেসবুক পেজ
তবে এনসিপির পক্ষ থেকে লংমার্চে অংশগ্রহণ কম হওয়ার পেছনে ব্যস্ততার কথাও বলা হয়েছে। দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ, যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব এবং রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য আব্দুল হান্নান মাসউদসহ কয়েকজন নেতা লংমার্চে যোগ দেন। হাসনাত আব্দুল্লাহ যশোরের পথসভায় বক্তব্য দেন। যদিও তাকে লংমার্চের অন্যান্য সময় নিষ্ক্রিয় থাকতে দেখা গেছে। অন্যদিকে আদীব ও হান্নান মাসউদকে বিভিন্ন পথসভার মঞ্চে দেখা যায়।
যশোরের পথসভায় এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক হাসনাত আব্দুল্লাহর বক্তব্যে আবার জামায়াতের সঙ্গে রাজনৈতিক অবস্থানের পার্থক্যের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
তিনি বলেন, বিরোধী দলকে বিকল্প সরকার হিসেবে নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে। নির্বাচনে কারচুপি হলে তা স্পষ্টভাবে বলতে হবে।
ঠাকুরগাঁও উপনির্বাচনের দিকে ইঙ্গিত করে হাসনাত বলেন, একদিকে ভোট কারচুপির অভিযোগ তোলা, অন্যদিকে মিষ্টিমুখ করে আসা—এ ধরনের অবস্থান বিরোধী রাজনীতি হতে পারে না।
এর জবাব আসে জামায়াতের পক্ষ থেকেও। কুষ্টিয়ায় লংমার্চের সমাপনী সমাবেশে সাদিক কায়েম বলেন, বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে যাদের ছাত্র উপদেষ্টা করা হয়েছিল, তাদের ব্যর্থতার কারণেই এখন গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ নিয়ে আন্দোলন করতে হচ্ছে। এ দায় তাদেরও রয়েছে।
এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরব হন ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম। এক ফেসবুক পোস্টে তিনি গণভোট জাতীয় নির্বাচনের আগে আয়োজনের প্রশ্নে জামায়াতের অনড় অবস্থানের যৌক্তিকতা তুলে ধরেন।
তার বক্তব্যে অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা, সংস্কার প্রক্রিয়া এবং সাবেক ছাত্র উপদেষ্টাদের দায়িত্ব পালন নিয়েও সমালোচনা ছিল। এতে দুই দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাল্টাপাল্টি প্রতিক্রিয়া আরও দৃশ্যমান হয়।
তবে লংমার্চে শীর্ষ নেতাদের অনুপস্থিতিকে জোটের দূরত্বের ফল হিসেবে দেখতে নারাজ এনসিপির কয়েকজন নেতা।
দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব সারজিস আলম আগামীর সময়কে বলেন, ‘শীর্ষ পর্যায়ের তিনজনসহ অনেকে লংমার্চে অংশ নিয়েছেন। আমাদের ব্যস্ততা ছিল। দিনে কর্মসূচি থাকার পাশাপাশি রাতে সমন্বয় সভা থাকায় সকালের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তারা অংশ নিতে পারেননি। জোট ভাঙার মতো কোনো বিষয় নেই।’
যুগ্ম আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য আব্দুল হান্নান মাসউদ বলেন, ‘জোট ভাঙছে বা জোট ছাড়ছি, বিষয়টি এমন নয়। আমাদের দলের প্রধান ব্যস্ততার কারণে লংমার্চে আসতে পারেননি।’
‘আগে আমাদের রাজনৈতিক পর্ষদের ১৬ জনের মধ্যে আটজন আসতেন, এবার চারজন এসেছেন। আগে যেমন আমি আসতে পারিনি, এবার অন্য কেউ আসতে পারেননি। আমরা নিজেদের কর্মসূচি পালন করছি, একইভাবে ১১ দলীয় জোটের সঙ্গেও আছি,’ বলেন তিনি।
অন্যদিকে জামায়াতের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে আগামীর সময়কে বলেন, ‘ঢাকা সিটিতে প্রার্থী নিয়ে এনসিপি কিছুটা নাখোশ বলে মনে হয়েছে। তারা নিজেদের কৌশল ও পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করছে। লংমার্চে আগের মতো উপস্থিতি না থাকায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দলের শীর্ষ নেতারাও বিষয়টি জানেন। তবে আমরা চাই, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সব দল এককভাবে অংশ নিক।’
জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতারা অবশ্য এনসিপির সীমিত অংশগ্রহণ নিয়ে সরাসরি কোনো সমালোচনা করতে চাইছেন না।
দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ আগামীর সময়কে বলেন, ‘১১ দলীয় ঐক্য অটুট রয়েছে। আমরা একসঙ্গে আন্দোলনে রয়েছি। সিটি করপোরেশন তথা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আপাতত আমরা এককভাবেই নির্বাচনের দিকেই আছি।’
এর আগে লংমার্চের আগের দিন সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলছিলেন, তাদের মধ্যে কোনো বিভক্তি নেই। ১১ দলীয় ঐক্য যে লক্ষ্য নিয়ে গঠিত হয়েছে, সেই দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত ঐক্য অটুট থাকবে।