Image description

নেপাল বাংলাদেশকে ৩ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত সস্তা জলবিদ্যুৎ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। এই বিপুল বিদ্যুৎ আমদানির জন্য আঞ্চলিক সঞ্চালন লাইন (গ্রিড) নির্মাণের জন্য ভারতকে প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। সম্প্রতি মুম্বাইয়ে অনুষ্ঠিত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিদ্যুৎ সচিবদের ১৯তম সম্মেলনে এ প্রস্তাব দেওয়া হয়। অন্যদিকে, বৈঠকে নিজেদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে (সেভেন সিস্টার্স) বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়াতে বাংলাদেশের পার্বতীপুর দিয়ে ৭৬৫ কেভির হাইভোল্টেজ সঞ্চালন লাইনের (করিডর) অনুমোদন চেয়েছে ভারত। তবে সমান সুযোগ ও আঞ্চলিক গ্রিড ব্যবস্থার নিশ্চয়তা ছাড়া ভারতকে নিজেদের ভূখণ্ড ব্যবহার করে একক কোনো লাইন না দেওয়ার বিষয়ে শক্ত অবস্থান তুলে ধরেছে ঢাকা। বিদ্যুৎ বিভাগের উচ্চপর্যায়ের সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

৯-১০ অক্টোবর ভারতের মুম্বাইয়ে বিদ্যুৎ সচিবদের ওই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্বব্যাংকের আয়োজনে এতে মালদ্বীপ, ভারত, শ্রীলংকা ও বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা অংশ নেন। বৈঠকে ভারত তাদের সেভেন সিস্টার্সে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পার্বতীপুর দিয়ে ৭৫ থেকে ৮০ কিলোমিটার করিডর ব্যবহারের অনুমতি চায়। ভারত জানায়, এই লাইন দিয়ে বাংলাদেশও চাইলে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ আমদানি করতে পারবে।

তবে বৈঠকে অংশগ্রহণকারী এক নীতিনির্ধারক নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে বলেন, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে স্পষ্ট বলা হয়েছে, সমান সুযোগ ছাড়া বাংলাদেশ এই করিডরের অনুমতি দেবে না। বাংলাদেশ মনে করে নেপাল, ভুটানের সঙ্গে বাংলাদেশের আলাদা গ্রিড লাইন থাকা দরকার। এই লাইন আঞ্চলিক গ্রিড লাইনও হতে পারে। তিনি বলেন, এই গ্রিড লাইন ভারত-ভুটান-বাংলাদেশ বা নেপাল-ভারত-বাংলাদেশও হতে পারে। এ ক্ষেত্রে কোনো দ্বিপাক্ষিক নয়, বাংলাদেশ চাইছে আঞ্চলিক গ্রিড লাইন।

বৈঠকে অংশগ্রহণকারী অন্যান্য দেশও আঞ্চলিক গ্রিড নির্মাণের পক্ষে বলে জানা গেছে। বৈঠকের আলোচনার ওপর ভিত্তি করে বিশ্বব্যাংক একটি রিপোর্ট সংশ্লিষ্ট সরকারের কাছে জমা দেবে। আগামী বছর বিদ্যুৎ সচিবদের আঞ্চলিক বৈঠক ঢাকায় অনুষ্ঠিত হবে।

বৈঠকে নেপাল বাংলাদেশকে ৩ হাজার মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ বিক্রির প্রস্তাব দেয়। গ্রীষ্মে বাংলাদেশে বিদ্যুতের চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট ছাড়ালেও শীতে তা ১০ হাজারের নিচে নেমে যায়। এ কারণে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র বসে থাকে। অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে নেপালে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যায়। তাই বাংলাদেশ শীতে নেপালে বিদ্যুৎ রপ্তানির চিন্তাও জানিয়েছে।

বর্তমানে বাংলাদেশ নেপাল থেকে দিনে ৪০ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ নিচ্ছে, যার প্রতি ইউনিটের দাম মাত্র ৮ টাকা ১৭ পয়সা। অথচ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) দেশি-বিদেশি বিভিন্ন কোম্পানির কাছ থেকে গড়ে ১৩ টাকার বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনছে। নেপাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটির পরিচালক অমসু কিরণ শাহী ২৬ অক্টোবর এক ফেসবুক পোস্টে জানান, নেপাল থেকে বিদ্যুৎ রপ্তানির বিষয়ে ভারত ও বাংলাদেশের সচিবদের সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় আলোচনা হয়েছে, যা আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বিনিময়ের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।

বৈঠকে উপস্থিত এক কর্মকর্তা জানান, আসিয়ান দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক গ্রিড থাকলেও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে তা গড়ে ওঠেনি। এই অবিশ্বাস দূর করতে না পারলে নেপাল, ভুটান ও ভারতের বিপুল সস্তা জলবিদ্যুতের সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাবে না।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন সূত্র জানায়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের ঠিক আগে ১৯-২০ জুলাই দুই দেশের বিদ্যুৎ সচিব পর্যায়ের জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের (জেডব্লিউজি) বৈঠকে ভারতের করিডর প্রস্তাব নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছিল। ওই নথিপত্রে ২০২৫ সালে লাইনের নির্মাণকাজ শুরু করে ২০২৮ সালে শেষ করার তাগিদ ছিল। তবে পরবর্তীতে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারই এর চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়নি।

৬ আগস্ট ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ওই সময় তিনি ৭৬৫ কেভি গ্রিড লাইন নির্মাণের বিষয়টি উত্থাপন করেন। পরে মন্ত্রী যুগান্তরকে বলেন, ভারত যেভাবে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে গ্রিড লাইন নিয়ে যেতে চাচ্ছে, সেভাবে আমরা চিন্তা করছি না।