কারো জমিতে ছিল মাছের ঘের, কারো বা ফসলি জমি। কেউ উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া পৈতৃক ভিটায় বসবাস করতেন, কেউ জীবনের সঞ্চয় দিয়ে জমি কিনে গড়ে তুলেছিলেন নিজের স্বপ্নের ঠিকানা।
এসব আবাসন প্রকল্পের বিরুদ্ধে জমি দখল, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও হয়রানির অভিযোগ সামনে আসার পর এলাকায় ক্ষোভ বাড়ছে।
এ অবস্থায় পূর্বাচল ও আশপাশের এলাকায় গড়ে ওঠা অনুমোদনহীন আবাসন প্রকল্পগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ ল্যান্ড ডেভেলপার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএলডিএ)। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ও প্রশাসনের কাছে চিঠিও পাঠিয়েছে সংগঠনটি, যেখানে ওয়েল কেয়ার হাউজিং, লন্ডন হাউজিং, এসেন্ট টাউন, আনন্দ হাউজিংসহ সব অবৈধ আবাসন প্রকল্প চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার আহবান জানানো হয়েছে।
জমি ও স্থাপনা দখলের অভিযোগ : ওয়েল কেয়ার হাউজিংয়ের (গ্রিনসিটি) বিরুদ্ধে জমি দখল ও প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগে গত ২১ অক্টোবর রূপগঞ্জ থানায় জিডি করেছেন মোহাম্মদ আমির হোসেন (৫২) নামের এক ব্যক্তি (জিডি নম্বর-১৪৬৫)। জিডিতে আমির হোসেন অভিযোগ করেন, রূপগঞ্জের কায়েতপাড়া ইউনিয়নের মাঝিনা মৌজায় আরএস ১০১৫ ও ১০১৭ দাগে ২৩ শতাংশ জমি কিনে তিনি বালু ভরাট ও স্থাপনা নির্মাণ করেন। পরে ওয়েল কেয়ার গ্রিনসিটি আবাসন প্রকল্পের কর্মকর্তারা পেশিশক্তি প্রয়োগ করে তাঁর জমি ও নির্মিত স্থাপনা দখল করে নেন। জমি উদ্ধারের চেষ্টা করলে তাঁকে বিভিন্ন সময় ভয়ভীতি প্রদর্শন ও হুমকি দেওয়া হয়। অভিযোগে ওয়েল কেয়ার গ্রিনসিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান, সহকারী ব্যবস্থাপক শামীম হোসেন সোহাগ এবং সাইট অফিস কর্মকর্তা মো. হোসেনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
জিডিতে আরো বলা হয়, গত ২০ অক্টোবর সকালে নিজের জমি ও স্থাপনা দেখতে গেলে সাইট অফিস কর্মকর্তা মো. হোসেন তাঁকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করেন। আবার জমি দেখার উদ্দেশ্যে গেলে প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়। এতে নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হয়ে থানায় অভিযোগ করেন তিনি। জিডির পর রূপগঞ্জ থানার ওসি জানান, লিখিত আবেদনের ভিত্তিতে জিডি গ্রহণ করা হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পৈতৃক জমি ফেরত চান আনন্দ হাউজিংয়ের ভুক্তভোগীরা
আনন্দ হাউজিং সোসাইটির বিরুদ্ধে জমি দখল, উচ্ছেদ, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও হয়রানির অভিযোগ বহুদিনের। চলতি বছর ১১ এপ্রিল নিজেদের জমি ফেরতের দাবিতে প্রকল্পের ভেতরে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেন আগারপাড়া, মধ্যপাড়া, নামাপাড়া, মধুখালী, গুতিয়াব, পিতলগঞ্জসহ আশপাশের এলাকার শত শত বাসিন্দা। এক পর্যায়ে পুলিশ গিয়ে তাঁদের কর্মসূচি ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
তখন মানববন্ধনে নিজের জমি হারানোর বেদনা জানাতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্থানীয় বাসিন্দা হাজি সোলাইমান। অভিযোগ করে হাজি সোলাইমান বলেন, ‘আগে আমার অনেক জমি ছিল, সব দখল করে নিয়েছে। নিজের জমিতে তিনটি মাছের ঘের করেছিলাম। মাছসহ সব ঘেরে বালু ফেলে ভরাট করে দিয়েছে। আজ আমি পথের ভিখারি। এখন মানুষের জমিতে কাজ করে খাই। আমার ছেলে রাজমিস্ত্রির কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছে। আমি এর বিচার চাই।’
আগারপাড়ার বাসিন্দা মানিক মিয়ার অভিযোগ, জমি দখল করে তাঁদের চলাচলের পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সরকারি একটি রাস্তার ব্রিজ ভেঙে সেটিও বন্ধ করা হয়েছে। পানি নিষ্কাশনের একমাত্র খাল ভরাট করে ফেলায় বর্ষাকালে হাজারো পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়ে। জরুরি প্রয়োজনে থানা, হাসপাতাল ও উপজেলা পরিষদে যেতে তাঁদের ছয়-সাত কিলোমিটার ঘুরতে হয়। নামাপাড়ার মহসিন মোল্লাও একই ধরনের অভিযোগ করেছেন। স্থানীয় বাসিন্দা মিঠু সরকার জানান, তাঁর বাবার আড়াই বিঘা জমি জোর করে দখল করা হয়েছে। নামাপাড়ার হাজি মোহাম্মদ আমানুল্লাহর অভিযোগ, তাঁদের পূর্বপুরুষদের জমি ভরাট করে সীমানাপ্রাচীর দেওয়া হয়েছে। প্রতিবাদ করতে গেলে ১২ হাত মাটির নিচে পুঁতে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়। পুলিশ ও লোকজন দিয়ে হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি। রূপগঞ্জের বাসিন্দা জাহের আলীর অভিযোগ আরো গুরুতর। তিনি দাবি করেন, একটি মিথ্যা মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার করে ১০ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। এ সময় নির্যাতন করে তাঁর প্রায় ৬২ বিঘা জমি লিখে নেওয়া হয়েছে। জীবন বাঁচাতে জমি লিখে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন বলে জানান তিনি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, আনন্দ হাউজিংয়ের নামে জমি দখল ও প্রকল্প সম্প্রসারণের সময় ভয়ভীতি, মামলা এবং প্রভাব খাটানোর ঘটনা ঘটেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রকল্প কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অনুমোদনহীন প্রকল্প নিয়ে বিএলডিএর উদ্বেগ : পূর্বাচল ও আশপাশের এলাকায় যথাযথ সরকারি অনুমোদন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ছাড়পত্র ছাড়া গড়ে ওঠা আবাসন প্রকল্পগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে বিএলডিএ। সংগঠনটির সচিব এ কে এম নওশেরুল আলম স্বাক্ষরিত চিঠিতে ওয়েল কেয়ার হাউজিং, লন্ডন হাউজিং, এসেন্ট টাউন ও আনন্দ হাউজিংয়ের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, অনুমোদনহীনভাবে জমি কেনাবেচা, প্লট বরাদ্দ ও অপরিকল্পিত ভূমি উন্নয়নের ফলে সাধারণ ক্রেতারা আর্থিক ও আইনি ঝুঁকিতে পড়ছেন। একই সঙ্গে পরিকল্পিত নগরায়ণ, পরিবেশ সংরক্ষণ ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ ধরনের কার্যক্রমের কারণে বৈধ ও নিবন্ধিত ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানগুলোর ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হচ্ছে। বিএলডিএর দাবি, অনুমোদনহীন প্রকল্প চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। অবৈধ প্লট বিক্রি ও বরাদ্দ বন্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা, সাধারণ ক্রেতাদের বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সমান সুযোগ তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি পূর্বাচল ও আশপাশের এলাকায় পরিকল্পিত নগরায়ণ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত তদারকি জোরদার করতে হবে।
আবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্থানীয় বাসিন্দা ও জমির মালিকদের অভিযোগ এবং বিএলডিএর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে পূর্বাচল ও আশপাশের আবাসন প্রকল্পগুলোর অনুমোদন, জমির মালিকানা এবং ভূমি উন্নয়ন কার্যক্রম তদন্তের দাবি উঠেছে। ভুক্তভোগীদের প্রত্যাশা, শুধু অভিযোগ গ্রহণ নয়, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে জমির মালিকানা ও দখল সংক্রান্ত বিরোধের নিষ্পত্তি হবে এবং তাঁরা ফিরে পাবেন তাঁদের জমি ও নিরাপদে বসবাসের অধিকার।