সাড়ে ১২ লাখ পরীক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় ৬ লাখই ফেল। এমন ফল বিপর্যয় ঘটেছে চলতি বছরের উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) ও সমমান পরীক্ষায়। এই বিপর্যয়ের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হলো, খাতা মূল্যায়ন করা হয়েছে ‘নির্মোহভাবে’। পাশাপাশি বের হয়ে আসার চেষ্টা করা হয়েছে পাসের হার বেশি দেখানোর প্রবণতা থেকে।
আজ শনিবার বেলা ১১টার দিকে দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডের ফলাফল প্রকাশ করা হয়। ফলাফলে গড় পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ।
২০২৫ সালের এ পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৫৮ দশমিক ৮৩। অর্থাৎ গতবারের চেয়ে পাসের হার ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ কমেছে। এবারের ফলে পাসের হার গত ২২ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। এর আগে সবচেয়ে কম পাসের হার ছিল ২০০৪ সালে। সেবার এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৪৭.৭৪ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন ৩ হাজার ৩৬ জন শিক্ষার্থী।
ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেছেন,শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পরীক্ষা যেভাবে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে, একইভাবে পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নও শতভাগ নির্মোহভাবে করা হয়েছে।
উপদেষ্টার ভাষ্য, পূর্বের সময়ে খাতা মূল্যায়নে কৃত্রিম জিপিএ-৫ বা পাসের হার বৃদ্ধির প্রবণতা পরিহার করে শতভাগ মেধানির্ভর ও নিরপেক্ষ মূল্যায়ন নিশ্চিত করা হয়েছে।
২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ছাত্রীদের তুলনায় ছাত্রদের অকৃতকার্য হওয়ার হার বেশি। প্রকাশিত ফলাফলে পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এবার মোট পরীক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্রদের ৫২ দশমিক ২৫ শতাংশ ফেল করেছেন। ছাত্রীদের ফেল করার হার ৪৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ।
এবার এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাস করেছেন ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন শিক্ষার্থী। জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৪০ হাজার ৮৪ জন। অকৃতকার্য হয়েছেন ৫ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ জন শিক্ষার্থী।
ছাত্রদের ফেল করার হার ৫২ দশমিক ২৫ শতাংশ হলেও ছাত্রীদের ক্ষেত্রে এ হার ৪৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ। অর্থাৎ ছাত্রীদের তুলনায় ছাত্রদের অকৃতকার্য হওয়ার হার ৮ দশমিক ৫৬ শতাংশ বেশি।
ফেল করলেও এসএসসির মতো এইচএসসি পরীক্ষায়ও পূর্ণাঙ্গ খাতা পুনঃনিরীক্ষার সুযোগ রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা।
এ বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন, খাতা দেখায় স্বচ্ছতার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অসঙ্গতি পাওয়া গেলে সেগুলো নিয়ে ছাত্র-ছাত্রীরা রি-এক্সামিন করতে পারে। তখন আগামী দিনে কী হয়েছে, সেটা আমরা বলতে পারব।
‘এই রেজাল্টটি যতটা হয়েছে, যদিও আমরা উদ্বিগ্ন, কিন্তু রেজাল্টে ত্রুটি আছে কি-না, সেই বিষয়ে আমরা এখনো নির্ধারণ করতে পারিনি। রি-এক্সামিন করার পর বোঝা যাবে’, বলছিলেন শিক্ষামন্ত্রী।
এদিকে, এবারের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় সর্বোচ্চ দুই বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়া পরীক্ষার্থীরা এক মাসের মধ্যে কেবল ফেল করা বিষয়ে পুনরায় পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। এবারে এক ও দুই বিষয়ে ফেল করা পরীক্ষার্থী ৪ লাখ ২২ হাজার ৯০৫ জন।
বর্তমানে এসএসসি ও এইচএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষায় কোনো পরীক্ষার্থী এক বা একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য হলে তাকে এক বছর পর (পরের বছরের পরীক্ষায়) আবার পরীক্ষায় বসতে হয়। সে ক্ষেত্রে শুধু অকৃতকার্য হওয়া বিষয়গুলোতে অথবা চাইলে সব বিষয়ে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ থাকে।
কিন্তু একটি বা দুটি বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ার কারণে একজন শিক্ষার্থীকে দীর্ঘ এক বছর অপেক্ষা করতে হয়। এতে শিক্ষাজীবনে পিছিয়ে পড়ার পাশাপাশি বাড়তি মানসিক চাপও তৈরি হয়।
শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন বলেন, অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক-দুই বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের পুনরায় পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে। আগামী এক মাসের মধ্যে এসব পরীক্ষা আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী, চলতি বছর কুমিল্লা বোর্ডে পাশের হার ৪৮ দশমিক ০৪ শতাংশ। পাশাপাশি এই বোর্ডে জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ হাজার ৩১৩ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে কুমিল্লা বোর্ডে পাশের হার ৪৮ দশমিক ০৪ শতাংশ। পাশাপাশি এই বোর্ডে জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ হাজার ৩১৩ জন শিক্ষার্থী।
এ ছাড়া বরিশাল বোর্ডে পাশের হার ৪৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ৫ হাজার ৯৫০। যশোর বোর্ডে পাশের হার ৪৪ দশমিক ৯২ শতাংশ। আর জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩ হাজার ২২৮ জন।
পাশাপাশি দিনাজপুর বোর্ডে পাশের হার ৪৫ দশমিক ৯৮ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছেন ২ হাজার ৯৫৩ জন। এ ছাড়া সিলেট বোর্ডে ৫০ দশমিক ৯০ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছেন ১ হাজার ২০৪ জন।
এছাড়া রাজশাহী বোর্ডে ৪৫ দশমিক ০৬ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ৪ হাজার ৫২০ জন। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৬১ দশমিক ০৭ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে তিন হাজার ২৫০ জন শিক্ষার্থী।
অন্যদিকে বিএম-ভোকেশনাল (কারিগরি) পরীক্ষায় গত বছরের তুলনায় এবার পাসের হার কমলেও বেড়েছে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা। বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত এ বছরের পরীক্ষায় পাস করেছেন ৪৯ দশমিক ৪৩ শতাংশ পরীক্ষার্থী। সর্বোচ্চ ফল জিপিএ-৫ পেয়েছেন ১ হাজার ৮৮৬ জন।
বিদেশ কেন্দ্রের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, এ বছর বিদেশের ৮টি কেন্দ্রের পরীক্ষার্থী ছিল ২৩০ জন। এর মধ্যে ২০৯ জন পাস করেছেন। বিদেশে কেন্দ্রে ফেল করেছেন ২১ জন। পাসের হার ৯০ দশমিক ৮৭ শতাংশ। একটি প্রতিষ্ঠানে শতভাগ পাস করেছে।
আর মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৬১ দশমিক ০৭ শতাংশ এবং জিপিএ ৫ পেয়েছেন তিন হাজার ২৫০ জন শিক্ষার্থী।