Image description

সকালে ঘুম থেকে উঠে মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ রাখেন জ্যোত্স্না খাতুন (ছদ্মনাম)। মেসেঞ্জারে পাঠানো একটি ছবি দেখে আঁতকে ওঠেন তিনি।

তাঁর অতি সাধারণ একটি ছবিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে বিকৃত (অশ্লীল) করে দেওয়া হয়েছে। দ্রুত তিনি মেসেঞ্জার থেকে ওই মেসেঞ্জারে কল করেন। অন্য প্রান্তের ব্যক্তিটি তাঁকে স্পষ্ট হুমকি দেন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৫০ হাজার টাকা না পাঠালে ছবিটি ফেসবুকে ছড়িয়ে দেওয়া হবে। পাঠানো হবে আত্মীয়-স্বজনের কাছেও।
 
এটুকু বলে তিনি কল কেটে দেন। পরে একাধিকবার কল করেও তাঁকে আর পাওয়া যায়নি। পরদিন বিকাশ নাম্বার পাঠিয়ে ওই ব্যক্তি আবারও ছবি ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেন জ্যোত্স্নাকে।

জ্যোত্স্না খাতুন বলেন, ‘আমি জানি অশ্লীল ছবিটি আমার নয়।

এআই ব্যবহার করে একটি নগ্ন ছবিতে আমার মুখ জুড়ে দেওয়া হয়েছে। তার পরও ছবিটি দেখার পর আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। মনে হচ্ছিল, ছবিটি ছড়িয়ে দিলে আমি মুখ দেখাব কিভাবে? কতজনকে আমি বোঝাব যে ওই অশ্লীল ছবির ব্যক্তি আমি নই। পরিচিত-অপরিচিতরা কিভাবে নেবেন ছবিটি!’

পরে এক বন্ধুর সহায়তায় জ্যোত্স্না সাইবার সাপোর্ট সেন্টারে অভিযোগ করেন। এরপর পরিবারকে বিষয়টি জানান।

জ্যোত্স্নার মতো নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ এভাবেই এআইয়ের অপব্যবহারের শিকার হচ্ছেন। বাদ যাচ্ছে না রাষ্ট্র ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠান। নারীদের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঘটনা বেশি ঘটছে। সরকারপ্রধানের কন্যাকে নিয়েও অর্ধশতাধিক এআই ছবি-ভিডিও প্রকাশ করার খবরও গণমাধ্যমে এসেছে। সম্প্রতি অভিনেত্রী পরীমনি ও মেহজাবীন চৌধুরীর এআই দিয়ে তৈরি আপত্তিকর ভিডিও একটি টেলিভিশন চ্যানেলের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এ ঘটনায় দুই অভিনেত্রীই তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। মেহেজাবীন চৌধুরী বলেন, ‘এআই ব্যবহার করে কারো নামে মিথ্যা ও বানোয়াট কনটেন্ট তৈরি করা এবং কাউকে হেয় করার উদ্দেশ্যে তা ছড়িয়ে দেওয়া বিনোদন নয়। এটি জঘন্যতম অপরাধ।’ ওই টেলিভিশনের উদ্দেশে পরীমনি বলেন, ‘আমার স্বাভাবিক জীবনটা এভাবে আবার দুর্বিষহ করে দিয়েছেন, এর সম্পূর্ণ দায়ভার আপনাদের। আমি সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো পোস্ট দিতে পারছি না।’

পরে এ ঘটনায় টেলিভিশন চ্যানেলটি পরীমনি ও মেহজাবীন চৌধুরীর কাছে ক্ষমা চায়।

এআইয়ের ছবি যখন হয়রানির অস্ত্র

গত ২৫ সেপ্টেম্বর ‘মাহমুদ রাফাত’ নামের ফেসবুক প্রোফাইল থেকে এআই নির্মিত একটি ভিডিও ছড়ানো হয়। তাতে সেনাবাহিনীর পোশাকের মতো পোশাক পরা এক ব্যক্তিকে সরকার গঠন নিয়ে আপত্তিকর প্রশ্নে দেশবাসীর কাছে মতামত চাওয়া হয়। রিউমার স্ক্যানার জানায়, সেনা সদস্যের বক্তব্য হিসেবে প্রচারিত ভিডিওটি ভুয়া। সেনাবাহিনীকে নিয়ে এমন আরো নানা ধরনের এআই ভিডিও ছড়ানো হচ্ছে।

শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বজুড়েই বাড়ছে এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনিকে নিয়েও ছড়ানো হয়েছে এআই নির্মিত একাধিক ভুয়া ছবি ও ভিডিও। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মেলোনি জানান, তাঁর ভুয়া ছবিকে বাস্তব হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘ডিপফেক ও এআই অত্যন্ত বিপজ্জনক হাতিয়ার, যা মানুষকে বিভ্রান্ত ও অপমানিত করতে পারে।’ সাধারণ মানুষকে তিনি অনলাইনে কোনো কিছু বিশ্বাস বা শেয়ার করার আগে ভালোভাবে যাচাই করার আহবান জানান। মেলোনি জানান, তিনি নিজের পক্ষে প্রতিবাদ জানাতে পারলেও অনেক ভুক্তভোগীর সে সামর্থ্য নেই।

চাকরিজীবী রাহাত রাকিব (ছদ্মনাম) কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কিছুদিন আগে এক নারীর সঙ্গে আমার ছবি জোড়া লাগিয়ে উদ্দেশ্যমূলকভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। পরে আমি থানায় জিডি করি।’ ভুক্তভোগী আরেক নারী জানান, তাঁর ছবি ব্যবহার করে নগ্ন ভিডিও তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার পর অনেকে তাঁকে খারাপ চোখে দেখা শুরু করেন। অথচ এতে তাঁর কোনো দায় ছিল না।

তবে কেউ কেউ বিকৃত এসব ছবিকে গুরুত্ব দিতে রাজি নন। তাঁদের একজন উম্মে সালমা ঊষা। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘হঠাৎ খেয়াল করলাম মেসেঞ্জারের আউটবক্সে আমার মুখ জোড়া দেওয়া কয়েকটি নুড ছবি। দেখেই ওই আইডি ব্লক করে দিই। এরপর ভিন্ন আইডি দিয়ে আবারও আমাকে একই ছবি পাঠানো হয়। পরে এক বন্ধুর সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি, তাঁর মুখ ব্যবহার করেও একই ধরনের ছবি পাঠানো হয়েছে। তখন ভাবলাম, আমাদের পরিচিত কেউ এই বিকৃত কাজটি করেছে। পরে আর গুরুত্ব দিইনি। কারণ এগুলো ফেক।’

সাইবার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিভিন্ন এডিটিং সফটওয়্যারে আগে ছবি বা ভিডিও বিকৃত করা হতো। এখন নতুন করে যুক্ত হয়েছে এআই। এসব ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে ব্যক্তির মর্যাদা ক্ষুণ্ন করা, সামাজিকভাবে হয়রানি ও বিদ্বেষ ছড়ানোর প্রবণতা বাড়ছে। সম্প্রতি দেবী দুর্গার প্রতিমায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার মুখ বসিয়ে তৈরি করা একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এ বিষয়ে কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘এআই দিয়ে তৈরি আমার ছবিটি ছড়িয়ে সাম্প্রদায়িক বিভাজন ও ঘৃণা ছড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে। এই চিন্তা সব ধর্মের জন্যই ক্ষতিকর।’

অভিযোগ বাড়লেও মামলা করতে অনীহা : সাইবার জগতের এসব গুরুতর অপরাধ মোকাবেলায় গত বছর ২০ নভেম্বর প্রতিষ্ঠা করা হয় ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) সাইবার সাপোর্ট সেন্টার। প্রতিষ্ঠানটি এ ধরনের ভুক্তভোগীদের আইনি সহায়তা ও পরামর্শ দেয়। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, এআই বা অন্য প্রযুক্তির অপব্যবহারের শিকার হয়ে প্রতিকার পেতে চাইলে রাজধানীর মিন্টো রোডে তাদের কার্যালয়ে নির্ভয়ে যেতে পারবেন ভুক্তভোগীরা। এ ছাড়া ‘০১৭৩০২০২০২০’ মোবাইল নম্বরে কল করে, ‘পুনবত্ংঁঢ়ঢ়ড়ত্ঃফনফসঢ়—ঢ়ড়ষরপব.মড়া.নফ’ ই-মেইলে এবং ‘ঈুনবৎ ঝঁঢ়ঢ়ড়ত্ঃ ঈবহঃত্ব, উগচ, উযধশধ’ ফেসবুক পেজে অভিযোগ জানালেও ব্যবস্থা গ্রহণ করে প্রতিষ্ঠানটি।

চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত সাইবার সাপোর্ট সেন্টারটিতে এক হাজার ৯৯৭টি জিডি হয়েছে। এর মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচার ও মানহানির অভিযোগ ৩৪৯টি, ব্যক্তিগত ছবি ছড়িয়ে হয়রানির অভিযোগ ১৯৮টি এবং ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগ ১৬৬টি।

প্রতিষ্ঠানটির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, অপপ্রচার-মানহানি, ব্ল্যাকমেইল ও ব্যক্তিগত ছবি ছড়িয়ে হয়রানির ঘটনায় চলতি বছরের জানুয়ারিতে ৫৮ জন অভিযোগ করেন। ফেব্রুয়ারিতে ৫৯, মার্চে ৮১, এপ্রিলে ৮৬, মে মাসে ৯১, জুনে ৭৯, জুলাইয়ে ৭২, আগস্টে ৮৮, সেপ্টেম্বরে ৬৫ এবং ২০ অক্টোবর পর্যন্ত ৩৪ জন অভিযোগ জানান।

এ ছাড়া পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন (পিসিএসডাব্লিউ) থেকে জানানো হয়, এআই বা যেকোনো ধরনের ডিজিটাল হয়রানির শিকার ভুক্তভোগীরা পিসিএসডাব্লিউর ফেসবুক পেজ ও ০১৩২০০০০৮৮৮ নম্বরে কল বা মেসেজ পাঠিয়ে অভিযোগ জানাতে পারবেন। পিসিএসডাব্লিউর কাছে ২০২২ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ছবি ও ভিডিওভিত্তিক যৌন হয়রানির ৩৮৪টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এসব অভিযোগ নিয়ে করা গবেষণায় দেখা গেছে, ১২২টিতে নারীর মুখ অন্য নগ্ন বা যৌন ছবি কিংবা ভিডিওতে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা মোট অভিযোগের ৩১.৮ শতাংশ। গবেষণাটি শুধু এআইয়ের তৈরি ছবি নিয়ে নয়; এতে এআই বা অন্য ছবি সম্পাদনার প্রযুক্তি ব্যবহারের ঘটনা রয়েছে। পিসিএসডাব্লিউ ২০২৪ সালে নারীদের সব ধরনের সাইবার হয়রানি নিয়ে ৯ হাজার ১১৭টি অভিযোগ পেয়েছিল।

সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন অ্যান্ড চিলড্রেনের (সিএসডাব্লিউসি) ফোকাল পারসন মনীষা বিশ্বাস কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের কাছে যাঁরা অভিযোগ জানান, তাঁদের অনেকে আইনগত প্রক্রিয়ায় (জিডি-মামলা) যেতে চান না। তাঁদের মূল দাবি থাকে কনটেন্ট ডিলিট করানোর। সিএসডাব্লিউসি মোট ১৭টি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে কাজ করে। ২০২৫ সালে আমরা ৭১টি ঘটনা নথিভুক্ত করি। এসব ভুক্তভোগী সশরীরে আমাদের কাকরাইলের অফিসে আসেন। এর মধ্যে ২০টি মামলা হয়। জিডি হয় ১৫টি। বাকি ৩৬টি ঘটনায় ভুক্তভোগীরা মামলা বা জিডি করতে চাননি। তাঁরা গোপনে সমস্যার সমাধান চেয়েছেন। এ ছাড়া আমাদের ফেসবুক পেজে ৪০টি অভিযোগ আসে। এর মধ্যে ১৭ জনকে জিডি করতে বললেও চারটি জিডি হয়েছিল। এসব ঘটনায় মেটার মাধ্যমে ১৯টি কনটেন্ট টেকডাউন করা হয়। ২০২৬ সালে এসংক্রান্ত অভিযোগের হিসাব এখনো সমন্বয় করা হয়নি। তবে প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ জনের মতো ভুক্তভোগী অভিযোগ জানান। আমরা চাই, আমাদের ফেসবুক পেজ সিএসডাব্লিউসিতে সাইবার স্পেসে ভুক্তভোগী নারী ও শিশুরা অভিযোগ জানাক। আমরা তাদের আইনি সহায়তা দেব।’

জাতিসংঘের বাংলাদেশ কার্যালয়ের গত ১৮ জুন প্রকাশিত এক নিবন্ধে জাতীয় নারী নির্যাতন জরিপ ২০২৪-এর তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, বাংলাদেশের প্রতি ২০ জন নারীর মধ্যে একজনের বেশি প্রযুক্তির মাধ্যমে সংঘটিত সহিংসতার শিকার হন; এ ছাড়া ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের ক্ষেত্রে এই হার প্রতি ছয়জনে একজন। এই পরিসংখ্যানও কেবল এআইয়ের তৈরি ছবি নিয়ে নয়। বিভিন্ন প্রযুক্তির অপব্যবহারের শিকার তাঁরা। নিবন্ধে বলা হয়, প্রযুক্তির অপব্যবহার করে কনটেন্টগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানোর পর ভুক্তভোগীদের কেউ কেউ জনপরিসরের ভূমিকা থেকে সরে যান।

সাইবার সাপোর্ট সেন্টারের সহকারী পুলিশ কমিশনার দীল আশরাফী লতিফ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নারী-পুরুষ সবাই এ বিষয়ে অভিযোগ করেন। তবে নারীর সংখ্যা বেশি। ৯০ শতাংশেরও বেশি অভিযোগকারী বা ভুক্তভোগী মামলা করতে চান না। ভুয়া ছবি বা ভিডিও হলেও সামাজিকভাবে মর্যাদাহানিসহ নানা কারণে তাঁরা ভীত থাকেন। তাঁদের বড় অংশের চাওয়া থাকে, ছবিটি বা ভিডিওটি সরিয়ে ফেলা হোক।’

দীল আশরাফী আরো বলেন, ‘চলতি বছর এ ধরনের ৫৪টি অভিযোগ বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনে (বিটিআরসি) পাঠানো হয়েছে। বিটিআরসি সেগুলো মেটা বা সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মকে জানায়। তবে বড় আইডির ক্ষেত্রে অনেক সময় ছবি বা ভিডিও সরানো হয় না। ছোট আইডির ক্ষেত্রে ভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। ঢাকার বাইরের ভুক্তভোগীদের সংশ্লিষ্ট জেলা ডিবি অফিসে যোগাযোগ করতে বলা হয়।’

এ বিষয়ে বিটিআরসির সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সাইবার সাপোর্ট সেন্টারসহ সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এ ধরনের অভিযোগ পাঠালে তা দ্রুত মেটাসহ সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মকে জানানো হয়। তবে পরে কী ব্যবস্থা নেওয়া হলো, তার হিসাব বিটিআরসি রাখে না।’

ভুক্তভোগী বেশি, মামলা কম : ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (উত্তর) বিভাগের উপকমিশনার খালেদা বেগম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আগে ছবি বা ভিডিও সম্পাদনা করে হয়রানি করা হতো। এখন এর সঙ্গে ব্যাপকভাবে এআই যুক্ত হয়েছে। আমার বিভাগের হিসাবে, ২০২৬ সালের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ১৫৫টি মামলা হয়েছে। ২০২৫ সালে হয়েছিল ১৩৬টি।’

খালেদা বেগম ২০২১ সাল থেকে পিসিএসডাব্লিউতে কাজ করেছেন। তিনি জানান, ২০২১ সালের দিকে প্রতি মাসে গড়ে ৭০০ থেকে ৭৫০ নারী অভিযোগ জানাতেন। তাঁদের মধ্যে ১০০ থেকে ১২০ জন জিডি করতেন আর মাসে মামলা হতো সর্বোচ্চ তিনটি। কোনো কোনো ভুক্তভোগী মামলা করার পর তা তুলে নিতেন। ওই সময়ে মামলার সংখ্যা দেড় শ হলেও ভুক্তভোগী ছিলেন প্রায় ১০ হাজার। তবে বেশির ভাগই মামলা করতে চাননি।

খালেদা বেগম বলেন, ‘এর জন্য আমি ভুক্তভোগীকে দায়ী করব না। ২০২২ সালে এক নারী মামলা করেছিলেন। উনি এখনো কোর্টের বারান্দায় ঘুরছেন। এই দীর্ঘসূত্রতার ফলে অন্যরা মামলার জন্য এগিয়ে আসতে দশবার ভাবেন।’

ফরেনসিক পরীক্ষায় দীর্ঘসূত্রতা : খালেদা বেগম জানান, তাঁর বিভাগে বিভিন্ন সময়ে সাইবার আইনে করা ৫৫টি মামলার তদন্ত শেষ করা হয়েছে। প্রাথমিক প্রমাণের ভিত্তিতে আসামি গ্রেপ্তার ও আলামত জব্দ করা হয়েছে। সেগুলো সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হলেও ছয় মাসের বেশি সময় ধরে প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। এক্সপার্ট ওপেনিয়ন পেলে কাজের সুবিধা হয়। দেরির ফলে মামলার অভিযোগপত্র দেওয়া যাচ্ছে না। দীর্ঘদিন পড়ে থাকলে আলামত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (দক্ষিণ) বিভাগের উপকমিশনার তরিকুল ইসলামও ফরেনসিক প্রতিবেদন পেতে দেরির কথা জানান। তাঁর বিভাগে ২০২৫ সালে ১৫৫টি এবং চলতি বছর এ পর্যন্ত ১৬১টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ১৯টি মামলার তদন্ত সিআইডির ফরেনসিক প্রতিবেদনের অপেক্ষায়। রাষ্ট্রের জন্য হুমকি বা গুরুত্বপূর্ণ মামলায় দ্রুত প্রতিবেদন পাওয়া গেলেও সাধারণত ছয় মাসের আগে তা পাওয়া যায় না।

সাইবার ক্রাইম বিভাগ জানায়, সম্প্রতি তিনজন চিকিৎসক অভিযোগ করেন, তাঁদের ছবি ও কণ্ঠস্বর এআই দিয়ে নকল করে ভিডিও তৈরি করা হয়েছে। সেগুলো ব্যবহার করে ভুয়া ওষুধসহ বিভিন্ন পণ্যের বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে দুজন মামলা করতে চাননি, একজন করেছেন। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তাঁদের নাম প্রকাশ করতে চাননি।

গত ২০ আগস্ট ইউরোলজিস্ট ও কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট সার্জন অধ্যাপক মো. কামরুল ইসলামের ছবি, নাম, পরিচয় ও কণ্ঠস্বর এআই দিয়ে নকল করে ওষুধের বিজ্ঞাপন ও বিক্রির অভিযোগে চট্টগ্রাম থেকে দুজনকে গ্রেপ্তার করে ডিএমপি।

পুলিশ স্টাফ কলেজের রিসার্চ অ্যান্ড পাবলিকেশন বিভাগের পরিচালক নুরুল আমিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা এআই নিয়ে গবেষণার জন্য প্রাথমিকভাবে চিন্তা করেছি। কারণ সাম্প্রতিক সময়ে এআইয়ের অপব্যবহারের শিকার হচ্ছেন অনেকে। এর আগে অনলাইনে হ্যারাসমেন্ট সংক্রান্ত গবেষণা হলেও এআই নিয়ে আলাদাভাবে গবেষণা হয়নি।’

আইনের অস্পষ্টতা, সচেতনতা প্রয়োজন : এআইয়ের অপব্যবহার ও করণীয় নিয়ে ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘সাইবার অপরাধের মামলাগুলোর মধ্যে হ্যাক করে টাকা নেওয়া, নগদ-বিকাশ প্রতারণা ও জালিয়াতি ছাড়া অন্য মামলাগুলো ঝুঁকিতে রয়েছে।’ তাঁর দাবি, অনেক ঘটনার সঙ্গে প্রচলিত আইনের ভাষার মিল নেই। ফলে মামলা খারিজ হচ্ছে বা আদালত তা নিতে পারছেন না।

রফিকুল ইসলামের মতে, প্রযুক্তি ও অপরাধের ধরন বদলানোর সঙ্গে আইনও হালনাগাদ করা প্রয়োজন। সাইবার সুরক্ষা আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধন জরুরি। আইনের ভাষা বর্তমান ঘটনাগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়ায় ভুক্তভোগীরা প্রত্যাশিত প্রতিকার পাচ্ছেন না।

প্রযুক্তিবিদ ও সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রযুক্তি দিয়ে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এআই বা অন্য প্রযুক্তিতে ছবি-ভিডিও বিকৃত করে ছড়ানো কিংবা কারো সম্মানহানি করার ঘটনায় কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করতে হবে, যাতে অন্যরা এমন কাজ করতে সাহস না পায়। পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে হবে, বিশেষ করে কম বয়সী ছেলেমেয়েদের মধ্যে। বিকৃত ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে সেটিকে অতিরিক্ত গুরুত্ব না দেওয়ার মানসিকতা তৈরি করা জরুরি। কারণ ছবিটি বা ভিডিওটি অসত্য হলেও তরুণ-তরুণীরা এমন পরিস্থিতিতে আত্মহত্যার মতো পথ বেছে নিতে পারে। এ বিষয়ে জনসচেনতা বাড়ানো জরুরি। কোনটি আসল আর কোনটি ভুয়া ছবি, তা চিহ্নিত করার উপায়গুলো প্রচার করতে হবে।’

সুমন সাবির বলেন, ‘এআইয়ের অপব্যবহার বিশ্বজুড়েই সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু প্রযুক্তি দিয়ে যেহেতু এটা রোধ করা যাবে না, তাই সচেতনতার বিকল্প নেই।’