Image description

বিমান বাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরির মৃত্যু ঘটনায় রহস্য আরও বাড়ছে। তাহসিফের জুনিয়র বন্ধু শাহরিয়ার দীপকে হেফাজতে নিয়ে তথ্য সংগ্রহের পর তদন্তেও নতুন মোড় নিয়েছে। দীপ দু’দিনে দুই ধরনের তথ্য দেয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও ধোঁয়াশার মধ্যে আছে। তবে ঘটনার পুরোটাই দীপ জানেন- এটা মনে করছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা। তাই তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেই পুরো রহস্য উদ্‌ঘাটনের চেষ্টা করছেন তারা। দীপের দেয়া তথ্যে ঘটনাস্থল নির্ধারণ, তাহসিফের মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া ঘটনা সংঘটনের সময়েরও একটা ধারণা মিলেছে। প্রথমে দীপ দাবি করেছিলেন- উত্তরার রেস্তরাঁ থেকে খাবার খেয়ে দু’জন দু’দিকে চলে যান। কিন্তু পিবিআই’র জিজ্ঞাসাবাদে তিনি তথ্য দিয়েছেন- টঙ্গীর মাজার বস্তিতে তাহসিফ ও তিনি একসঙ্গে ছিলেন। সেখানে মধ্যরাতের পর একদল লোক তাদের ধাওয়া দিলে তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেন আর তিনি নিজে পালিয়ে চলে আসেন। তবে তাহসিফের পরিবারের দাবি- তিনি সাঁতারে দক্ষ ছিলেন। নদীতে ঝাঁপ দিলেও তার মৃত্যু হওয়ার কথা না। ঘটনাকে ভিন্নখাতে নেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। পিবিআই সূত্র জানিয়েছে, দীপের দেয়া বক্তব্য যাচাই করা হচ্ছে।

এর আগে জাতীয় জরুরি সেবা-৯৯৯ এর মাধ্যমে খবর পেয়ে বুধবার বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে ভাসমান অবস্থায় লাশ উদ্ধার করে টঙ্গী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ি। ওই ঘটনার পর সামনে আসে গত ২৭শে অক্টোবর জুনিয়র বন্ধু দীপের ফোনেই বাসা থেকে নিচে নামেন তাহসিফ। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ওইদিন সন্ধ্যা ৬টা ২৪ মিনিটে দীপের সঙ্গেই নিজের মোটরসাইকেলে চেপে বাসা থেকে বের হন তাহসিফ। এরপর কুরকুরে নামে একটি রেস্টুরেন্টের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়- রাত ১১টা ৫৪ মিনিটেও ওই রেস্টুরেন্টে দীপের সঙ্গে খাবার খাচ্ছেন তাহসিফ। মৃত্যুর আগে দীর্ঘ সময় দীপের সঙ্গেই ছিলেন তাহসিফ। এরই ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার রাতে মোহাম্মদপুর বাবর রোডের বি ব্লকের একটি বাসা থেকে তাকে হেফাজতে নেয় পিবিআই। হেফাজতে নেয়ার পর রাতভর রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালায় পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তর। দীপের দেয়া তথ্যেই তুরাগ নদে যেই স্থান থেকে তাহসিফের ভাসমান লাশ উদ্ধার করা হয় তার প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরের টঙ্গী পশ্চিম থানার অধীন মাজার বস্তি এলাকা থেকে গতকাল সকালে নম্বরপ্লেটবিহীন অবস্থায় তাহসিফের মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করে পিবিআই। মোটরসাইকেল উদ্ধারের সময়ে দীপ ঘটনাস্থলে পিবিআই সদস্যদের বলেন, ওই রাতে কুরকুরে রেস্টুরেন্টে খাবার খাওয়ার পর তারা দু’জনেই মোটরসাইকেল চালিয়ে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় যান।

এরপর রাস্তার পাশের দোকানের সামনে মোটরসাইকেল রেখে গলি রাস্তা ধরে মাঠের ইটের সলিংয়ের রাস্তা দিয়ে আনুমানিক ৫০ গজ দূরে তুরাগ নদের দিকে তারা দু’জনে হেঁটে যাচ্ছিলেন। ঠিক ওই সময়ে পুলিশের পোশাক পরা কিছু মানুষ তাদের ধাওয়া দেয়। ধাওয়া খেয়ে তাহসিফ দৌড়ে তুরাগ নদে ঝাঁপ দেয়। আর নদীর সীমানা নির্ধারণের ২৯ নম্বর পিলারে পেছনে পালিয়ে থাকেন দীপ। পরে লোকগুলো চলে গেলে সে তাহসিফকে খুঁজতে থাকেন। প্রায় ঘণ্টাখানেক খোঁজ করার পরও না পেয়ে রাত দেড়টার পরে সে একা ওই মাঠ থেকে বের হয়ে মোটরসাইকেল নিয়ে মোহাম্মদপুরের বাসায় চলে আসেন। যদিও এর আগে দীপ বলেছিলেন, ওইদিন কুরকুরে রেস্টুরেন্টে খাবার খেয়ে রাত ১২টার দিকে তিনি বাসায় চলে যান।

দীপের বাসার দারোয়ান বলেন, ওইদিন রাত দেড়টার দিকে তাকে ফোন দিয়ে দীপ বলেন- তার আসতে একটু দেরি হবে। পরে রাত আড়াইটার দিকে বাসার গেটের সামনে এসে তিনি আমাকে ফোন দেন। এর মিনিট পাঁচেক পর আমি গেট খুলে দিই। আনুমানিক রাত ২টা ৩৫ মিনিট থেকে ৪০ মিনিটের দিকে সে বাসায় ঢোকে।
তবে তাহসিফের মায়ের ফোনের তথ্য বলছে, ওইদিন রাত ১টা ৩৫ মিনিটে তাহসিফ তার মায়ের মোবাইলে ভয়েজ পাঠিয়ে বলেন, ‘আমি রওনা হয়েছি, আসছি’। তাই দীপের দেয়া তথ্য অনুযায়ী রাত ২টার দিকে টঙ্গীর ওই নদীর পাড়ে থাকা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। এমনকি ধাওয়া খেয়ে নদীতে ঝাঁপ দেয়ার তথ্যটিও মানতে নারাজ তার পরিবার।

মূল ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে: এদিকে নিহত তাহসিফের বাবা এ কে এম এনায়েতুল করিম বলেন, এ ধরনের কিছু হতে পারে না। কেন তাকে ধাওয়া দিতে যাবে? এগুলো বাজে কথা, প্রশ্নই আসে না। আমার ছেলে সাঁতার জানতো। ও তো পাইলট। ওদের সুইমিংয়ের কোর্স করা এবং তার উপর সার্টিফিকেট আছে। সাঁতারের উপর বড় ধরনের কোর্স করা আছে আমার ছেলের। তিনি বলেন, ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। বিষয়টিকে ভিন্নভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা চলছে বলে আমার মনে হচ্ছে।

ছেলের মৃত্যুর মামলার বিষয়ে এনায়েতুল করিম বলেন, আমরা পারিবারিকভাবে এখনো কোনো ধরনের মামলা করার সিদ্ধান্ত নিইনি। মামলা করবো কি না, সে বিষয়েও সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে আমরা চাই, থানায় গিয়ে দুই কলম কী লিখলাম বা না লিখলাম, সেটির উপর সরকার গুরুত্ব না দিয়ে নিজস্ব আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিক। দেশে সুন্দর একটি সরকার রয়েছে। তারা সঠিক তদন্ত করলেই সব বেরিয়ে আসবে। তিনি বলেন, আমার ছেলে এ দেশের একজন সুনাগরিক ছিলেন। সশস্ত্র বাহিনীর একজন সদস্যও ছিলেন। তার এ ধরনের মৃত্যুর যেন সুষ্ঠু তদন্ত হয় এবং প্রকৃত কারণ বের হয়ে আসে আমরা এতটুকুই চাই।

ছায়া তদন্তে পিবিআই: তাহসিফের বাবার মতো দীপের কথার সঙ্গে একমত হতে পারছেন না পিবিআইয়ের সদস্যরাও। গতকাল দীপকে নিয়ে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় অভিযানে যাওয়া পিবিআইয়ের ঢাকা মেট্রো উত্তরের পরিদর্শক সৈয়দ সাজেদুর রহমান বলেন, দীপ একেক সময় একেক রকম কথা বলেছেন। তার সর্বশেষ বক্তব্যের ভিত্তিতে ঘটনাস্থলে গিয়ে মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়েছে। তবে তাহসিফ ও দীপ একসঙ্গে এখানে আসার পর তাহসিফকে ফেলে কেন দীপ একা চলে গেলেন, সেটি আমাদের কাছে এখনো ধোঁয়াশা। আমরা তদন্ত করছি। তদন্ত শেষে বিষয়টি জানা যাবে।
পিবিআইয়ের ঢাকা মেট্রো উত্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. এনায়েত হোসেন মান্নান বলেন, তাহসিফ যেদিন রাতে নিখোঁজ হন, সেদিন তার সঙ্গে বন্ধু দীপ ছিলেন। দীপকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া বিভিন্ন তথ্য যাচাই-বাছাই করছি আমরা। তার দেয়া সব তথ্য সরাসরি বিশ্বাস না করে প্রতিটি বিষয় তদন্ত করা হচ্ছে। তিনি জানান, দীপ বলেছে, ওই রাতে পুলিশের পোশাক পরা দু’জন লোক আসছিল।

তাদের দেখে তারা দৌড় দিয়েছে। এখন তারা কারা, তা আমরা যাচাই করে দেখবো। আদৌ কোনো পুলিশ সদস্য ছিলেন কি না, ইউনিফর্ম পরা পুলিশ ছিলেন কি না কিংবা কারও দায়িত্ব ছিল কি না, এসব বিষয় যাচাই করা হবে। পিবিআইয়ের এ কর্মকর্তা বলেন, আগের দিন দীপ তাদের জানিয়েছিলেন, রাত ১২টার দিকে হাউস বিল্ডিং এলাকা থেকে তাহসিফের সঙ্গে আলাদা হয়ে তারা দু’জন দু’দিকে চলে যান। এরপর থেকে তাদের মধ্যে আর কোনো যোগাযোগ হয়নি। তাহলে রাত ২টার দিকে তারা কেন ওই এলাকায় এসেছিলেন এবং গভীর রাতে মোটরসাইকেল নিয়ে সেখানে যাওয়ার কারণ কী, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, দীপের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে একটি কালো রঙের সুজুকি জিক্সার ১৫০ মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে। তবে এটি তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। মোটরসাইকেলটির কাগজপত্র যাচাই করা হচ্ছে।

এদিকে উত্তরখান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাবিব বলেছেন, আমি নিহত তাহসিফ সাউরির বাবাকে ফোন দিয়েছিলাম থানায় এসে মামলা করার জন্য। এখনো তিনি থানায় আসেননি। তিনি থানায় আসলে আমাদের থানায় মামলা দায়ের হবে।