দেশজুড়ে প্রতিদিন গড়ে ১০টি এবং ঢাকায় প্রতি তিন দিনে ঘটছে দুটি খুনের ঘটনা। এর অনেকগুলোই পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। পুলিশের তথ্য বলছে, এ ধরনের অপরাধে পিস্তল-রিভলবারের মতো ছোট অস্ত্র বেশি ব্যবহার করা হচ্ছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) এমন ৪০১ জন ব্যক্তিকে ‘শুটার’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যারা প্রতিদ্বন্দ্বী বা অন্য কোনো লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে ছোট অস্ত্র ব্যবহার করে। এদের অনেকের বিরুদ্ধেই ১০ থেকে ৪০টি পর্যন্ত মামলা রয়েছে। এর মধ্যে শুধু মতিঝিল বিভাগেই রয়েছে ১১৮ জন, ওয়ারীতে ৭৩ জন, তেজগাঁওয়ে ৬১ জন, মিরপুরে ৬০ জন, রমনায় ৩৬ জন, লালবাগে ২৪ জন, গুলশানে ১৬ জন এবং উত্তরায় ১৩ জন।
ডিএমপির মতিঝিল বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ টাইমসকে জানান, মতিঝিল একটি বাণিজ্যিক এলাকা হওয়ার কারণে এখানে অনেকেই বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে থাকে। তিনি আরও বলেন, এদের একটি বড় অংশকে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকিদেরকেও আইনের আওতায় আনতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে, শুধু রাজধানী নয়, সারা দেশেই ছোট অস্ত্রের ব্যবহার দিন দিন বেড়েই চলেছে। অপরাধীদের কাছে এখন বিভিন্ন ধরনের অত্যাধুনিক অস্ত্র চলে এসেছে। এমনকি কিশোর গ্যাংগুলোর হাতেও মারাত্মক সব আগ্নেয়াস্ত্রের দেখা মিলছে। আইন প্রয়োগকারী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ধারণা অনুযায়ী, দেশের ২০টি সীমান্ত রুট দিয়ে অবৈধ অস্ত্রের চালান দেশের ভেতরে প্রবেশ করে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় পুলিশের হেফাজত থেকে লুট হওয়া ১ হাজার ৩০৩টি সরকারি আগ্নেয়াস্ত্র এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া থানায় সাধারণ মানুষ বা লাইসেন্সধারীদের জমা দেওয়া কতগুলো ব্যক্তিগত অস্ত্র লুট হয়েছে, সে বিষয়ে পুলিশ পরিষ্কার করে কিছু জানায়নি।
পুলিশের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, নতুন অপরাধী থেকে শুরু করে বড় বড় সংঘবদ্ধ চক্র-সবার কাছেই বিদেশি অস্ত্রের মজুত বেড়ে গেছে। এর মধ্যে রিভলবার ও পিস্তলের চাহিদাই সবচেয়ে বেশি। অন্যদিকে, সুন্দরবন ও নদীপথের জলদস্যুদের কাছে দেশীয় তৈরি রিভলবার, গান, শুটার গান এবং পাইপ গানের মতো অস্ত্র দেখা যাচ্ছে।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ওমর ফারুক টাইমসকে বলেন, গুলি করে মানুষ হত্যা করা এবং এভাবে সমাজে আতঙ্ক সৃষ্টি করা সাধারণ মানুষের মনে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
অন্যদিকে, পুলিশের মুখপাত্র ও সহকারী পুলিশ মহাপরিদর্শক (এআইজি) কামরুন মুনিরা টাইমসকে জানান, গত মে মাস থেকে পুরো দেশজুড়ে অস্ত্র উদ্ধারের একটি বিশেষ অভিযান চলছে। এর মাধ্যমে নিয়মিত অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং এর সাথে জড়িত অপরাধীদের আটক করা হচ্ছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে দেশজুড়ে ১ হাজার ৪৪২টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু ডিএমপি এলাকাতেই উদ্ধার হয়েছে ১৫৫টি অস্ত্র। এসব ঘটনায় অস্ত্র ও বিস্ফোরক আইনে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ২৮৩ জনকে। একই সময়ে পুরো দেশে ২ হাজার ৬৫৯টি হত্যা মামলা দায়ের হয়েছে।
পুলিশের তথ্য মতে, মাত্র সাত মাসের মধ্যে ১২৩টি গুলিবর্ষণের ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৫৯ জন। জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডিএমপি এলাকায় ১৯৯টি হত্যা মামলা হয়েছে, যার মধ্যে ১৩টি সরাসরি গুলি সংক্রান্ত।
এছাড়া জুন থেকে আগস্ট—এই তিন মাসের মধ্যে দেশজুড়ে অস্ত্র আইনে ৪২৪টি মামলা হয়েছে, যার বড় একটি অংশ অর্থাৎ ১৫৯টি মামলা হয়েছে শুধু আগস্ট মাসেই।
ডিএমপি সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ওই তিন মাসে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় অস্ত্র আইনে ৪০টি মামলা হয়েছে, যেগুলোতে পুলিশ ৭৮ জনকে গ্রেপ্তার এবং ৯০টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করেছে।
সাবেক আইজিপি মো. বাহারুল আলম টাইমসকে বলেন, ‘আমাদের দেশে অবৈধ অস্ত্র সবসময়ই কম-বেশি ছিল। তবে পুলিশ হেফাজত থেকে লুট হওয়া অস্ত্রগুলো এখন সন্ত্রাসীদের হাতে চলে যাওয়ার কারণে এর ব্যবহার অনেক বেড়ে গেছে।’
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরশেদ মনে করেন, পুলিশকে কার্যকরভাবে কাজ করাতে হলে সবার আগে তাদের মনোবল বাড়াতে হবে; তবেই তারা লুট হওয়া অস্ত্রগুলো সফলভাবে উদ্ধার করতে পারবে। তিনি আরও বলেন, অনেক সময় হামলার ভয়ে পুলিশ অভিযান পরিচালনা থেকে বিরত থাকে।
সাবেক পুলিশ প্রধান ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, অবৈধ অস্ত্র দ্রুত উদ্ধার করা না গেলে আগামীতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে। বিশেষ করে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়লে এসব অস্ত্রের ব্যবহার আরও মারাত্মকভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ছোট অস্ত্রের এই বেপরোয়া ব্যবহারের চিত্র দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিনিয়ত দেখা যাচ্ছে। গত শনিবার রাজধানীর পল্লবীতে একটি চেকপোস্টে পুলিশ একটি পিস্তল ও গুলিসহ দুজনকে আটক করে। একই দিন ভোরে মগবাজারের বিশাল সেন্টারের সামনে একটি অটোরিকশায় বসা এক ব্যক্তি গায়ক আসিফ আকবরের গাড়ির ওপর গুলি চালায়, যদিও ওই বন্দুকধারীকে এখনো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
গত ৭ আগস্ট বিকালে মিরপুর ১১ নম্বর সেকশনের ‘বি’ ব্লকে একটি চায়ের দোকানে বন্দুকধারীরা হামলা চালালে বিএনপি নেতা আলমগীর হোসেনসহ দুজন আহত হন।
এর আগে ২৪ জুলাই রাতে কাফরুলে সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের এলোপাতাড়ি গুলিতে যুবদলকর্মী ইউসুফ বেপারী নিহত হন এবং গুলিবিদ্ধ হন আরও দুজন। পল্লবীতে জুনের প্রথম সপ্তাহে গুলিবিদ্ধ হন আবদুল্লাহ ও হৃদয়। ১৬ জুলাই মোহাম্মদপুরের নবোদয় হাউজিং এলাকায় চালক ইব্রাহিমকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
ঢাকার বাইরে খুলনার পরিস্থিতি আরও বেশি উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। গত রোববার সেখানে মোটরসাইকেলে করে এসে এক যুবদল নেতা এবং পরবর্তীতে এক বেসরকারি কোম্পানির কর্মচারীকে গুলি করা হয়। এমনকি পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকির যখন গত শনিবার খুলনায় ছিলেন, সেদিন সকালেই যুবদল নেতা রামিম বিশ্বাস এবং সন্ধ্যায় মুদি দোকানি আকাশ কুন্ডু গুলিবিদ্ধ হন।
মোটরসাইকেল আরোহী বন্দুকধারীদের এভাবে গুলি করার ঘটনা সেখানে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই ঘটছে। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত খুলনায় নিহত হয়েছেন ৭২ জন, যার মধ্যে ৩৮ জনই মেট্রোপলিটন এলাকার। সেখানে প্রতি পাঁচটি খুনের ঘটনার মধ্যে অন্তত একটিতে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার হয়েছে।
মোটরসাইকেল আরোহী বন্দুকধারীদের এভাবে গুলি করার ঘটনা সেখানে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই ঘটছে। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত খুলনায় নিহত হয়েছেন ৭২ জন, যার মধ্যে ৩৮ জনই মেট্রোপলিটন এলাকার। সেখানে প্রতি পাঁচটি খুনের ঘটনার মধ্যে অন্তত একটিতে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার হয়েছে।
এ ছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগে নয় মাসে ৫৬৪টি হত্যা মামলা হয়েছে, যার মধ্যে ৪১টি চট্টগ্রাম মহানগরীর এবং এই মৃত্যুর একটি বড় অংশের পেছনেও রয়েছে গুলির ঘটনা।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চোরাকারবারিরা নির্দিষ্ট কমিশনের বিনিময়ে ভারত ও মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অস্ত্র দেশে নিয়ে আসে এবং স্থানীয় ডিলারদের কাছে হস্তান্তর করে।
কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান টাইমসকে জানান, অনেক রোহিঙ্গা অস্ত্র ও মাদক চোরাকারবারের সঙ্গে জড়িত। তারা নানা কৌশলে বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে অস্ত্র দেশের অভ্যন্তরে নিয়ে আসছে। এর মধ্যে কিছু অস্ত্র ধরা পড়লেও অস্ত্রের চালান আসার ধারা থামছে না। পুলিশের তথ্য মতে, চোরাচালানের এসব অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে সাব-মেশিন গান বা এসএমজি, রিভলবার, পিস্তল এবং রাইফেল। পরবর্তীতে এসব অস্ত্র বিভিন্ন সহিংসতা, খুন, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার এবং চাঁদাবাজির কাজে ব্যবহার করা হয়। এমনকি এখন অনলাইনের মাধ্যমেও অবৈধ অস্ত্রের অর্ডার দেওয়া যাচ্ছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো সম্প্রতি অনলাইনে অস্ত্র বিক্রির সাথে জড়িত কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করেছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতার পরিবর্তনের সময় পুলিশের হেফাজত থেকে মোট ৫ হাজার ৭৬৩টি আগ্নেয়াস্ত্র লুট হয়েছিল। এর মধ্যে ছিল একশটিরও বেশি চাইনিজ রাইফেল, ৩০টি এসএমজি, তিনটি লাইট মেশিন গান বা এলএমজি, দুইশটির বেশি চাইনিজ ৭.৬২ মিমি পিস্তল, প্রায় চল্লিশটি ৯ মিমি পিস্তল এবং প্রায় চল্লিশটি ১২-বোর শটগান। এর মধ্যে ৪ হাজার ৪৬০টি অস্ত্র ইতিমধ্যে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হক টাইমসকে বলেন, লুট হওয়া এসব অস্ত্র বর্তমানে সন্ত্রাসীদের হাতে রয়েছে, যা দেশের স্বাভাবিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখার ক্ষেত্রে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।