সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলার দীর্ঘ তদন্তেও রহস্যের জট খোলেনি। হত্যাকাণ্ডের ১৪ বছর পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে সাবেক র্যাব কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান ও অভিনেত্রী রোকেয়া প্রাচীর নাম। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্তে পাওয়া ডিজিটাল তথ্য, এক সাবেক র্যাব সদস্যের বক্তব্য এবং রোকেয়া প্রাচীর বাসা থেকে দুটি ডিস্ক নিয়ে আসার দাবি ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন প্রশ্ন। জিয়াউল, রোকেয়া প্রাচীর নামসহ হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য বিভিন্ন সূত্রের তথ্য তুলে ধরে হাইকোর্টে তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদন উপস্থাপন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) নেতৃত্বাধীন উচ্চ পর্যায়ের টাস্কফোর্স। গতকাল বিচারপতি শিকদার মাহমুদুর রাজী ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে এ প্রতিবেদন উপস্থাপন করে রাষ্ট্রপক্ষ। রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আরশাদুর রউফ, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল নূর মুহাম্মদ আজমী উপস্থিত ছিলেন। বাদীপক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির এবং রিটকারী পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ উপস্থিত ছিলেন। শুনানি শেষে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ছয় মাস সময় বাড়িয়ে আগামী বছরের ২৯ এপ্রিল পরবর্তী শুনানির জন্য দিন ধার্য করেন হাইকোর্ট। সাগর-রুনি হত্যা মামলার তদন্তে নতুন মোড় আসতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। শুনানি শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্তে পাওয়া প্রায় ৩০০ সিডিতে থাকা তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা শেষে পিবিআইয়ের কাছে হস্তান্তর করা হবে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডে কারা জড়িত, তা খতিয়ে দেখা হবে। এজন্য তদন্তে আরও সময় প্রয়োজন। মামলার অগ্রগতি প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা হয়েছে। আদালত পরবর্তী শুনানির জন্য ২০২৭ সালের ২৯ এপ্রিল দিন ধার্য করেছেন। তদন্তের স্বার্থে প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য ইন-ক্যামেরা শুনতে পারেন আদালত। তিনি বলেন, প্রকৃত ঘটনা উদ্?ঘাটনে সরকার কাউকে আড়াল করতে চায় না।
আর সময়ক্ষেপণ না করে তদন্তের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি চান বাদীপক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘১২ বছরেও মামলার প্রকৃত আসামি শনাক্ত না হওয়া বিচারপ্রার্থী পরিবারের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক। আমরা আশা করছি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রমাণ সংগ্রহ করে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করা হবে এবং রাষ্ট্রপক্ষ আর সময় চাইবে না।’ সাগর-রুনির ছেলে মেঘের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তির আহ্বান জানান তিনি।
যা আছে অগ্রগতি প্রতিবেদনে : টাস্কফোর্স-প্রধান পিবিআইয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আজিজুল হক শিপন স্বাক্ষরিত অগ্রগতি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘ তদন্তেও হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য এবং কারা এতে জড়িত, তা সুনির্দিষ্ট করা যায়নি। ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া অজ্ঞাত দুই পুরুষের ডিএনএ শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। উদ্ধার হয়নি মামলার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত দুটি ল্যাপটপ ও মোবাইল ফোন। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্তে পাওয়া ডিজিটাল তথ্য ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যের সূত্র ধরে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য নতুন দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অগ্রগতি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা জানান, জিয়াউল আহসানের বরিশালের বাসায় অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল আলামত জব্দ করা হয়েছে। এসবের মধ্যে জিওলোকেশন-সংক্রান্ত তথ্য, এসএমএস এবং কল ডিটেইল রেকর্ডের (সিডিআর) মুদ্রিত কপি ছিল। এ-সংক্রান্ত বিষয়ে জিয়াউল আহসানের একজন অর্ডারলি বা সেনাসদস্যকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। প্রাথমিক তদন্তে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জিয়াউল আহসান এবং একজন গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বের সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে তথ্য পাওয়ার কথা প্রসিকিউটরের বক্তব্যের বরাতে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম ও প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহার সঙ্গে আলোচনাকালে তাঁরা সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জিয়াউল আহসান ও রোকেয়া প্রাচীর সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে পাওয়া তথ্য যাচাইবাছাইয়ের কথা জানান। তদন্ত শেষ হলে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত পিবিআইয়ের কাছে হস্তান্তর করা হবে বলেও তাঁরা জানান। এজন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটর বরাবর গত ১৩ অক্টোবর চিঠি পাঠিয়ে সংশ্লিষ্ট ডিজিটাল আলামত ও তথ্য-উপাত্ত চেয়েছে পিবিআই। তবে তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রস্তুতের সময় পর্যন্ত সেসব তথ্য পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা। ফলে ডিজিটাল আলামতগুলোর সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের সম্পর্ক কী, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঘটনাস্থল থেকে চারজনের ডিএনএ পাওয়া যায়। তাদের মধ্যে দুজন সাগর ও রুনি। বাকি দুই অজ্ঞাত পুরুষের পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। অজ্ঞাত ডিএনএ থেকে সম্ভাব্য মুখচ্ছবি তৈরির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষায়িত পরীক্ষাগারে নমুনা পাঠানো হলেও ডিএনএ অতিমাত্রায় মিশ্রিত থাকায় তা সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরি, ছুরির বাঁট, সাগর-রুনির পরিধেয় বস্ত্রসহ বিভিন্ন আলামত এবং ২৫ জনের ডিএনএ নমুনা বিদেশি পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছিল। তবে সন্দেহভাজনদের ডিএনএর সঙ্গে আলামতের ডিএনএর মিল পাওয়া যায়নি।
যেভাবে আলোচনায় জিয়াউল আহসান : জিয়াউল আহসানের নাম নতুন করে আলোচনায় আসে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের অন্য একটি মামলার তদন্তের সূত্র ধরে। প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহার বক্তব্যের বরাতে প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়, জিয়াউল আহসান-সংক্রান্ত তদন্তে ডিজিটাল ডিভাইস ও বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করতে গিয়ে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য যোগসূত্রের কিছু তথ্য পাওয়া যায়। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে কয়েক সন্দেহভাজনকে শনাক্ত করার কথা প্রসিকিউটর তানভীর জোহা গণমাধ্যমকে জানান। তিনি বলেন, হত্যাকাণ্ডের আগের রাতে র্যাবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক সদস্যকে একটি বড় ঘটনা ঘটতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছিল। পরদিন সকালে তিনি সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের খবর পান বলে দাবি করা হয়েছে।
রোকেয়া প্রাচীর বাসা থেকে দুটি ডিস্ক উদ্ধার : রোকেয়া প্রাচীর নাম সামনে আসার অন্যতম সূত্র হলো তাঁর বাসা থেকে দুটি ডিস্ক নিয়ে আসার দাবি। প্রসিকিউটর তানভীর জোহা এ বিষয়ে সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, ২০১২ সালে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের পর জিয়াউল আহসানের নির্দেশে র্যাবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক সেনাসদস্য রোকেয়া প্রাচীর বাসা থেকে দুটি ডিস্ক নিয়ে এসেছিলেন। পরে সেগুলো জিয়াউল আহসানের কাছে হস্তান্তর করা হয় বলে ওই সদস্যের বক্তব্যের বরাতে দাবি করা হয়েছে।