Image description

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে উচ্চ আদালতের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্তের জন্য কমিটি গঠন, প্রতিকার এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। দেশে আলিয়া ধারার মাদ্রাসার জন্য রয়েছে শিক্ষা বোর্ড ও সংশ্লিষ্ট সরকারি দফতরের তদারকির কাঠামো। অন্যদিকে, কওমি মাদ্রাসাগুলো পরিচালিত হয় নিজস্ব শিক্ষা বোর্ড ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে। কিন্তু দুই ধারার মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীদের যৌন নির্যাতনের অভিযোগ, শিক্ষক গ্রেফতার এবং কোনো কোনো ঘটনায় শিশুর মৃত্যুর খবর সামনে এলেও প্রতিরোধব্যবস্থা কতটা কার্যকর ও দায়বদ্ধতা কীভাবে নিশ্চিত হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সম্প্রতি গাজীপুরের টঙ্গী ও গাছায় দুটি কওমি মাদ্রাসায় শিশু শিক্ষার্থীদের যৌন নিপীড়নের অভিযোগে মামলা ও গ্রেফতারের ঘটনা ঘটেছে। চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে আট বছর বয়সী এক শিক্ষার্থীকে একাধিকবার বলাৎকারের অভিযোগে প্রধান শিক্ষককে গ্রেফতার করা হয়। কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে কওমি মাদ্রাসার এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। আলিয়া ধারার দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষকের বিরুদ্ধেও ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা ও গ্রেফতারের ঘটনা ঘটেছে।

এসব ঘটনায় শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, অভিযোগ জানানোর সুযোগ ও প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

নির্যাতনের অভিযোগ, কোথাও শিশুর মৃত্যু

গত ২০ অক্টোবর গাজীপুরের টঙ্গীর মধ্য আউচপাড়ায় ‘ক্বারীউল কুরআন ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসা’র উপাধ্যক্ষ মোসলেউদ্দিনের বিরুদ্ধে সাত বছর বয়সী এক শিক্ষার্থীকে যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠে। শিশুটির পরিবারের অভিযোগ, শিক্ষক তাকে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে চুমু দেন এবং বিষয়টি কাউকে জানালে মারধরের ভয় দেখান। শিশুটির বাবার করা মামলায় অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়। আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার প্রাগপুর ইউনিয়নের পাকুড়িয়া গ্রামের কওমি ধারার দারুল আবরার মাদ্রাসার শিক্ষক সাঈদ হোসেন ওরফে নান্নুর বিরুদ্ধে ৯ বছর বয়সী তৃতীয় শ্রেণির এক ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ ওঠে। শিশুটির মা ২০ অক্টোবর মামলা করেন। পুলিশ শিক্ষককে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠায়।

গাজীপুরের গাছা থানার কলমেশ্বর এলাকার দারুল হেদায়া কওমি মাদ্রাসায় আট বছর বয়সী এক আবাসিক শিক্ষার্থীকে একাধিকবার যৌন নিপীড়নের অভিযোগে শিক্ষক অলিউল্লাহ ইসলাম ও মাদ্রাসার পরিচালক মোহাম্মদ মিজানকে গ্রেফতার করে পুলিশ। গত ২৩ অক্টোবর তাদের কারাগারে পাঠানো হয়। মামলার এজাহার অনুযায়ী, শিশুটির পরিবার অভিযোগ জানানোর পরও অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগও রয়েছে। মামলায় তিনজনকে আসামি করা হয়েছে, তাদের মধ্যে দুজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে আট বছর বয়সী এক মাদ্রাসাছাত্রকে একাধিকবার বলাৎকারের অভিযোগে প্রধান শিক্ষক মুহাম্মদ রমিজ উদ্দীনকে গত ৩ আগস্ট গ্রেফতার করে র‌্যাব। আনোয়ারার কর্ণফুলী টানেল-সংলগ্ন চায়না রোডের বৈরাগ এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। শিশুটি বাঁশখালীর বৈলছড়ি ইউনিয়নের পশ্চিম চেচুরিয়া ঘোনাপাড়ার দারুসসুন্নাহ খাইরিয়া মাদ্রাসার নাজেরা বিভাগের শিক্ষার্থী। এজাহার অনুযায়ী, ভর্তি হওয়ার পর থেকে শিক্ষক বিভিন্ন সময়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে তাকে ওয়াশরুমে নিয়ে নির্যাতন করতেন। এরপর ২৩ জুলাই মাদ্রাসা ছুটির পর এতিমখানার হেফজ বিভাগের দ্বিতীয় তলার একটি শ্রেণিকক্ষে নির্যাতনের অভিযোগ করা হয়। শিশুটির বাবা ২৯ জুলাই নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন।

কওমি মাদ্রাসায় যৌন নির্যাতনের অভিযোগের পাশাপাশি আগের কিছু ঘটনাও নিরাপত্তা ও জবাবদিহির প্রশ্ন সামনে এনেছে। ২০১৯ সালের জুনে যশোরের শার্শায় ১২ বছর বয়সী মাদ্রাসাছাত্র শাহ পরাণকে যৌন নির্যাতনের চেষ্টা ও হত্যার অভিযোগে শিক্ষক হাফিজুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছিল, নির্যাতনের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর শিশুটিকে হত্যা করা হয়। ওই শিক্ষককে খুলনার দিঘলিয়ার একটি কওমি মাদ্রাসা থেকে গ্রেফতার করা হয়েছিল।

২০২২ সালের মার্চে চট্টগ্রামের বোয়ালখালীতে কওমি মাদ্রাসার আট বছর বয়সী শিক্ষার্থী ইফতেখার মালেকুল মাশফিকের গলাকাটা মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় তিন শিক্ষককে গ্রেফতার করা হয়। ঘটনাটি মাদ্রাসার নিরাপত্তা ও তদারকি নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

পাবনা সদর উপজেলার ভাঁড়ারা ইউনিয়নের দড়ি ভাউডাঙ্গা এলাকার নুরে মদিনা মহিলা কওমি মাদ্রাসার এক ছাত্রীর ওপর যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ ওঠে শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মো. আবু ইউসুফের বিরুদ্ধে। গত ২২ অক্টোবরের ঘটনার পর স্থানীয় লোকজন তাকে আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেন। পরদিন বিক্ষুব্ধ লোকজন মাদ্রাসাটিতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেন।

আলিয়া ধারার মাদ্রাসার ক্ষেত্রেও শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে যৌন অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় একটি দাখিল মাদ্রাসার গণিতশিক্ষক আবুল বাশারের বিরুদ্ধে ষষ্ঠ শ্রেণির এক ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। চিকিৎসা পরীক্ষায় ছাত্রীটি তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা বলে জানা যায়। পরে শিক্ষককে গ্রেফতার করা হয় এবং ছাত্রীর বাবা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন। ছাত্রী অভিযোগ করে, বিষয়টি কাউকে জানালে তাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছিল।

শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার পরিসংখ্যান

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত দেশে ১১৮ শিশু ধর্ষণের শিকার এবং ৪৬ শিশু ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে।

ফ্রান্সভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন জাস্টিসমেকার্স বাংলাদেশ ইন ফ্রান্সের (জেএমবিএফ) পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ছেলেশিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার ১৩১টি ঘটনায় ১৭১ জন ভুক্তভোগীর তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৭২টি ঘটনা মাদ্রাসায় ঘটেছে, যেখানে ১০৯ জন ছেলেশিশু ভুক্তভোগী হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে। ৬৫টি ঘটনায় ৮১ জন মাদ্রাসাশিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে।

জেএমবিএফের তথ্যে মাদ্রাসার ধরন আলাদা করে কওমি ও আলিয়া প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দেওয়া হয়নি। আসকের পরিসংখ্যানও দেশব্যাপী শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার চিত্র তুলে ধরে, মাদ্রাসাভিত্তিক নয়।

মাদ্রাসায় ধর্ষণের আলাদা পরিসংখ্যান নেই

বাংলাদেশে মানবাধিকার সংস্থাগুলো সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের ভিত্তিতে ধর্ষণের ঘটনার হিসাব রাখলেও প্রতিষ্ঠান বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক আলাদা পরিসংখ্যান সংরক্ষণ করে না। ফলে মাদ্রাসায় ধর্ষণের ঘটনা কতটি ঘটছে, তার মাস বা বছরভিত্তিক নির্দিষ্ট হিসাব নেই।

বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই—এই সাত মাসে দেশে নারী ও শিশু ধর্ষণের ৬৪১টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে নারী ধর্ষণের ঘটনা ৪০০টি এবং শিশু ধর্ষণের ঘটনা ২৪১টি।

আসকের সিনিয়র কো-অর্ডিনেটর আবু আহমেদ ফয়জুল কবির বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক আলাদা হিসাব রাখি না। ফলে মাদ্রাসার আলাদা কোনো হিসাব নেই। তবে আমাদের পর্যবেক্ষণ বলছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির ঘটনা মাদ্রাসাতেও আছে। তবে অন্য মাধ্যমের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যে এসব ঘটনা ঘটে না, তা নয়। আর মাদ্রাসায় ছেলে শিক্ষার্থীদের ধর্ষণ বা বলাৎকারের মতো ঘটনাও আমরা দেখতে পাচ্ছি।’

আদালতের নির্দেশনা কী?

২০০৯ সালের ১৪ মে হাইকোর্ট বিভাগ কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে নির্দেশনামূলক রায় দেন। এতে সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে অভিযোগ কমিটি গঠনসহ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। কমিটির প্রধান নারী হওয়া এবং প্রতিষ্ঠানের বাইরের অন্তত দুজন সদস্য রাখার বিধানও রয়েছে। পৃথক আইন প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত নির্দেশনাগুলো অনুসরণের কথা বলা হয়।

কমিটির দায়িত্ব শুধু অভিযোগ গ্রহণ নয়। অভিযোগ যাচাই, তদন্ত ও প্রয়োজনীয় সুপারিশ করাও এর কাজ। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হয়। কমিটি গঠনের পাশাপাশি তা কার্যকর রাখা, নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে।

সম্প্রতিক কিছু ঘটনা সামনে আসায় মাদ্রাসাগুলোতে এসব নির্দেশনা কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

আলিয়া ও কওমি মাদ্রাসায় তদারকির পার্থক্য

বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড ২০১৯ সালের ৩০ এপ্রিল অধিভুক্ত মাদ্রাসায় যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠনের নির্দেশনা দেয়। এর আগে ১৬ এপ্রিল মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদফতর কমিটি গঠন ও তদারকি জোরদারে নোটিশ দেয়।

আলিয়া ধারার মাদ্রাসাগুলো শিক্ষা বোর্ড ও সংশ্লিষ্ট সরকারি দফতরের তদারকি কাঠামোর আওতাভুক্ত। অন্যদিকে, কওমি মাদ্রাসার ছয়টি শিক্ষা বোর্ডকে নিয়ে গঠিত আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামিআতিল কওমিয়া বাংলাদেশ দাওরায়ে হাদিস (তাকমিল) সনদের স্বীকৃতি ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম সমন্বয় করে। তবে এ দায়িত্বের সঙ্গে প্রতিটি মাদ্রাসার দৈনন্দিন তদারকি বা যৌন নির্যাতনের অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব এক নয়।

তাই কওমি মাদ্রাসায় শিশু সুরক্ষা, অভিযোগ তদন্ত ও বোর্ডের তদারকির ব্যবস্থা স্পষ্ট করা প্রয়োজন। দুই ধারার মাদ্রাসায় একই প্রশাসনিক ব্যবস্থা রয়েছে বলে ধরে নেওয়া যাবে না। তবে কোনো প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ব্যবস্থাপনা থাকলেও অপরাধের অভিযোগ উঠলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

‘অভিযোগ আমলে না নিলে প্রতিষ্ঠানপ্রধানেরও জবাবদিহি জরুরি’

মানবাধিকার সংগঠন রাইজ ফর রাইটস ফাউন্ডেশনের যুগ্ম সম্পাদক ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জাহিদ হাসান ফাহাদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘টঙ্গীর এই ঘটনায় অভিযোগের সত্যতা আইন অনুযায়ী বিচারেই নির্ধারিত হবে। তবে এখানে একটি বিষয় আলাদা গুরুত্বের দাবি রাখে। অভিযোগ করা হয়েছে, বিষয়টি জানানোর পরও মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ কোনও ব্যবস্থা নেয়নি। এই অভিযোগ সত্য হলে ধরে নেওয়া যেতে পারে, প্রতিষ্ঠানটিতে হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটিও কার্যকর নেই।’

তিনি বলেন, ‘এখানে ছোট শিশুরা পড়ে, যা অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। অভিযোগ আমলে না নেওয়া বা নির্দেশনা না মানার প্রমাণ মিললে শুধু অভিযুক্ত ব্যক্তি নন, প্রতিষ্ঠান ও তার প্রধানকেও আইনের আওতায় আনা জরুরি।’

জাহিদ হাসান ফাহাদ আরও বলেন, ‘২০০৯ সালে হাইকোর্টের রায়ে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। দীর্ঘ সময় পরও অনেক প্রতিষ্ঠানে কমিটি গঠন হয়নি বা কার্যকর নয় বলে তিনি মনে করেন। নির্দেশনা বাস্তবায়নে তদারকির ঘাটতি থাকলে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত।’

পরিস্থিতি ও প্রমাণের ভিত্তিতে আদালত অবমাননার অভিযোগ উত্থাপনের সুযোগও থাকতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

‘কমিটিকে সক্রিয় করতে হবে’

মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদফতরের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) মুহাম্মদ মোজাম্মেল হোসেন খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মাদ্রাসাগুলোতে যৌন নির্যাতন প্রতিরোধে আমরা নিয়মিত নির্দেশনা দিই। সংশ্লিষ্ট নির্দেশনা প্রচার করা এবং নির্ধারিত সময়ে অভিভাবকদের সঙ্গে সভা করে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করতে বলা হয়। মাঠপর্যায়ে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাদের মাধ্যমে এসব কার্যক্রম তদারকি করা হয়। তবে অধিদফতরের নিজস্ব মাঠপর্যায়ের সরাসরি তদারকির ব্যবস্থা নেই।’

তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা অনেক ঘটছে। মনিটরিং আরও জোরদার করা প্রয়োজন। আমরা এ বিষয়ে কাজ করবো এবং নির্দেশনা বাস্তবায়নে আরও জোর দেবো।’

মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদফতর জানায়, মাঠপর্যায়ে আলিয়া ধারার মাদ্রাসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মনিটরিং করেন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের কর্মকর্তারা। মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদফতরের আলাদাভাবে কোনও কর্মকর্তা নেই।

বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের সহসভাপতি ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা বাহাউদ্দীন যাকারিয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কওমি মাদ্রাসাগুলো নিজস্ব কারিকুলাম ও ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয়। প্রতিটি মাদ্রাসার নিজস্ব কমিটি রয়েছে এবং শিক্ষকরা সেই কমিটির কাছে দায়বদ্ধ। কওমি মাদ্রাসার ক্ষেত্রে হাইকোর্টের নির্দেশনা কতটুকু প্রযোজ্য, তা আমার দেখা নেই। তবে দু-একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলেও মাদ্রাসা বোর্ড ও কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে সচেতন এবং বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখছে। এ ধরনের অন্যায় কাজে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়। তবে এসব ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়গুলো প্রচার পায় না।’

সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়ার আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শাহজালাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদকবিরোধী ও যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি রয়েছে। আমার মনে হয়, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও এ ধরনের কমিটি থাকা দরকার। এসব কমিটিকে সক্রিয় করতে হবে। পাশাপাশি নিয়মিত মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কমিটিগুলো কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারে।’

অভিযোগ জানাতে ভয়, প্রতিকার পেতে অনিশ্চয়তা

অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীরা ভয়, লজ্জা বা সামাজিক চাপের কারণে নির্যাতনের অভিযোগ জানাতে পারে না। আবাসিক মাদ্রাসায় পরিবার থেকে দূরে থাকায় এ সমস্যা আরও বাড়ে। গাজীপুরের গাছার ঘটনায় পরিবার অভিযোগ করেছে, শিক্ষককে জানানোর পরও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনেও একই ধরনের অভিযোগ এসেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তে নির্ধারিত হবে।

অভিযোগের পর অভিযুক্ত শিক্ষককে শুধু প্রতিষ্ঠান থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।

প্রতিরোধে কী করা প্রয়োজন?

সংশ্লিষ্টরা জানান, মাদ্রাসায় যৌন নির্যাতন প্রতিরোধে অভিযোগ কমিটি গঠন করে সদস্য ও যোগাযোগের তথ্য শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের জানাতে হবে। শিক্ষার্থীদের নিরাপদে অভিযোগ জানানোর সুযোগ এবং বিকল্প যোগাযোগের ব্যবস্থা রাখতে হবে।

অভিযোগ পেলে নিরপেক্ষ তদন্ত, গোপনীয়তা রক্ষা ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। আবাসিক মাদ্রাসায় নিয়মিত পরিদর্শন, অভিযোগের নথি সংরক্ষণ এবং ভুক্তভোগীকে ভয় দেখানো বা অভিযুক্তকে রক্ষার চেষ্টার বিরুদ্ধে জবাবদিহি জরুরি। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদেরও শিশু সুরক্ষায় সচেতন করতে হবে।

কওমি ও আলিয়া—উভয় ধারার মাদ্রাসায় শিক্ষা বোর্ড, সংশ্লিষ্ট সরকারি দফতর ও কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব ও সমন্বয় স্পষ্ট করতে হবে। শুধু নির্দেশনা বা কমিটি গঠন নয়, নিরাপদ অভিযোগব্যবস্থা, কার্যকর তদারকি, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

কওমি মাদ্রাসায় হচ্ছে ‘শিক্ষার্থী সুরক্ষা কমিটি’, হটলাইন চালুর নির্দেশ

শনিবার (২৪ অক্টোবর) রাতে সংবাদমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ-এর পক্ষে একটি বিবৃতি পাঠিয়েছেন সংগঠনের যুগ্মমহাসচিব মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী। বিবৃতিতে জানানো হয়, শিক্ষার্থী নিপীড়ন ও অনৈতিক আচরণ রোধে দেশের ছয়টি কওমি মাদরাসা বোর্ড এবং এর আওতাভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ‘শিক্ষার্থী সুরক্ষা কমিটি’ গঠন বা সচল করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া, শিক্ষার্থী নিপীড়ন বা অনৈতিক আচরণের অভিযোগ সর্বোচ্চ সাত দিনের মধ্যে তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। মাদরাসা বোর্ডগুলোকে শক্তিশালী মনিটরিং সেল ও অভিযোগ জানানোর জন্য হটলাইন চালুর নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

সংগঠনটির আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী ও মহাসচিব আল্লামা সাজেদুর রহমান বিবৃতিতে বলেন, গত ১৯ সেপ্টেম্বর আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামিআতিল কওমিয়া বাংলাদেশ এ নির্দেশনা জারি করেছে। বিবৃতিতে হেফাজতের নেতারা বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেকোনো অনৈতিক আচরণ বা শিশু নিপীড়ন যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়াও সমর্থনযোগ্য নয়। যেকোনো ঘটনায় প্রশাসনিক ব্যবস্থায় সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করা দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে জরুরি।

শিশু যৌন নির্যাতন একটি পুরোনো সামাজিক সমস্যা উল্লেখ করে তারা আরও বলেন, ‘এটি শুধু কোনো একটি কমিউনিটিকেন্দ্রিক সমস্যা নয়। স্কুল, মাদরাসা এমনকি অন্যান্য পরিসরেও সমস্যাটি কমবেশি বিদ্যমান। কোনো মাদরাসায় শিক্ষার্থী সুরক্ষা কমিটি না থাকলে, কমিটি নিষ্ক্রিয় থাকলে অথবা কোনো অভিযোগের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হলে ওই প্রতিষ্ঠানের অধিভুক্তি স্থগিত বা বাতিল করা হতে পারে।’

হেফাজতের নেতারা বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের নিরাপত্তা ও মানসিক স্বস্তিকে সব সময় অগ্রাধিকার দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে স্কুল ও মাদরাসা কর্তৃপক্ষকে কঠোর নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে এবং সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।

বিবৃতিতে সব স্কুল ও মাদরাসাকে নিজ নিজ কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়। অন্যথায়, যেকোনো নৈতিক পদস্খলনের দায়ে দোষী ব্যক্তিকে প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনগত; উভয় ধরনের শাস্তি ভোগ করতে হবে বলে সতর্ক করেন হেফাজতের নেতারা। এ ক্ষেত্রে কোনো শিথিলতা বা আপস চলবে না বলেও উল্লেখ করা হয়।

তারা বলেন, আজকের শিশু শিক্ষার্থীরা আগামীর ভবিষ্যৎ। তাদের শৈশব ও কৈশোরে সুশিক্ষা এবং নিরাপদে বেড়ে ওঠার দায়িত্ব পালনে কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না।

অত্যন্ত দুঃখজনক ও লজ্জাষ্কর: ধর্মমন্ত্রী

শনিবার (২৪ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতির ত্রি-বার্ষিক কাউন্সিল অধিবেশন শেষে এ বিষয়ে কথা বলেন ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন (কায়কোবাদ)। তিনি বলেন, ‘দেশে লক্ষ্য করেছি, এ ধরনের ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক ও লজ্জাষ্কর। ভবিষ্যতে এই জিনিসটা ঘটবে না বলে আমি বিশ্বাস করি। আমরা সেই ব্যাপারে যা করা প্রয়োজন, তাই করবো ইনশাআল্লাহুল আজিজ।’

মাদ্রাসার মতো পবিত্র স্থানে যেন এ ধরনের গর্হিত কাজ না ঘটে, সে বিষয়ে ইমামদের সচেতনতামূলক বক্তব্য দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।