বর্ষা বিদায় নিতেই প্রতি মাসে বাড়ছে বায়ুদূষণ। আগস্টে ঢাকার প্রতি ঘনমিটার বাতাসে ক্ষতিকর ক্ষুদ্র বস্তুকণা (পিএম ২.৫) ছিল ২৮.৪ মাইক্রোগ্রাম। সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪০.১ মাইক্রোগ্রামে। অক্টোবরের প্রথম ২৩ দিনের গড় ৭৪.২ মাইক্রোগ্রাম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মানদণ্ড অনুযায়ী, প্রতি ঘনমিটার বাতাসে পিএম ২.৫-এর মাত্রা পাঁচ মাইক্রোগ্রামের মধ্যে থাকলে তাকে স্বাস্থ্যকর বলা যায়। অর্থাৎ, অক্টোবরে ঢাকার বাতাসে এ দূষণ কণার মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিত সীমার প্রায় ১৫ গুণ। ঢাকার বাইরের বিভিন্ন এলাকাতেও দূষণ বাড়ছে। ফলে সর্দি-কাশি, হাঁপানিসহ শ্বাসতন্ত্রের নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন মানুষ।
আন্তর্জাতিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা আইকিউএয়ারের তথ্যানুযায়ী, বায়ুমান সূচকে ঢাকার অবস্থান আগস্টে ছিল ৮৭, সেপ্টেম্বরে ১১২ ও অক্টোবরে হয়েছে ১৬৪। সূচকে ৫০ পর্যন্ত বায়ুমান ভালো, ৫১-১০০ সহনীয়, ১০১-১৫০ সংবেদনশীল জনগোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর, ১৫১-২০০ অস্বাস্থ্যকর, ২০১-৩০০ খুব অস্বাস্থ্যকর এবং ৩০০-এর বেশি হলে দুর্যোগপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়। ঢাকার পাশাপাশি দেশের উত্তর-পূর্ব, দক্ষিণ-পূর্ব, মধ্যাঞ্চল ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায়ও দূষণ বাড়ছে। বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) কারিগরি সহযোগিতায় গুগল ম্যাপে দেশের বিভিন্ন এলাকার তাৎক্ষণিক বায়ুমানের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এসব তথ্য অনুযায়ী, বাগেরহাট, পিরোজপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী ও বরিশাল অঞ্চলে তুলনামূলক ভালো বাতাস মিলছে। অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, কিশোরগঞ্জ, চট্টগ্রাম, ঢাকা ও মুন্সিগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় দূষণের মাত্রা বেশি। গতকাল বেলা সাড়ে ৩টায় বায়ুমান সূচকে ঢাকার স্কোর ছিল ১৭৬। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর ও কিশোরগঞ্জের ভৈরবে ছিল ২০২। এ ছাড়া নরসিংদী সদরে ২০১ এবং মুন্সিগঞ্জের সিরাজদীখান ও নারায়ণগঞ্জে ২০০। চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ চ্যানেলে স্কোর ছিল ১৮০, কক্সবাজারে ১৬৮ ও মহেশখালীতে ১৮৭। ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, ঝিনাইদহ ও চট্টগ্রাম উপকূলের বাতাসও ছিল অস্বাস্থ্যকর। অর্থাৎ, ঢাকার বাইরের অনেক এলাকার বাতাসও এখন বিপজ্জনক মাত্রায় দূষিত।
আন্তর্জাতিক গবেষণা অনুযায়ী, বিশ্বে বছরে বায়ুদূষণে প্রায় ৮১ লাখ মানুষের অকালমৃত্যু হয়। আইকিউএয়ারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বায়ুদূষণে ঢাকা ছিল বিশ্বের ৩২তম দূষিত শহর। আর দূষিত দেশের তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল বাংলাদেশ।
স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও ক্যাপসের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আগে ঢাকার বাইরের বায়ুমান জানার সুযোগ ছিল না। এখন সেই সুযোগ তৈরি হওয়ায় এসব এলাকার দূষণও সামনে আসছে। অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে বৃষ্টি বন্ধ হওয়ায় ধূলিকণা, যানবাহন ও কলকারখানার দূষিত উপাদান বাতাসে ভেসে থাকছে। এ সময় ইটভাটা চালু হওয়া, বর্জ্য পোড়ানো, অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণকাজ, সড়কের ধুলাবালি, যানবাহন ও শিল্পকারখানার ধোঁয়ায় দূষণ বাড়ে। চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জ অঞ্চলে স্টিল রি-রোলিং মিল দূষণের অন্যতম উৎস। নভেম্বরের পর উত্তরের বাতাস দেশে প্রবেশ করলে আন্তসীমান্ত দূষণও বাড়বে। আন্তসীমান্ত দূষণ পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব না হলেও আইন প্রয়োগের মাধ্যমে স্থানীয় দূষণ কমানো সম্ভব।
দূষণের প্রভাবে শিশু ও বৃদ্ধদের মধ্যে শ্বাসতন্ত্রের রোগ বাড়ছে। সোমবার জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের বহির্বিভাগে দেখা যায়, চিকিৎসা নিতে রোগীদের দীর্ঘ সারি। নুসরাত নামের এক নারী জানান, তাঁর দেড় বছর বয়সি শিশু ১৪-১৫ দিন ধরে সর্দি-কাশিতে ভুগছে। ওষুধে সাময়িক উপশম হলেও পরে কাশি বেড়েছে। এখন কাশির সঙ্গে রক্ত আসছে, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে এবং বুকে সাই সাই শব্দ হচ্ছে। হাসপাতালের চিকিৎসকদের ভাষ্য, প্রতি বছর বর্ষার পর রোগীর চাপ বাড়তে শুরু করে। শীতকালে তা সামলাতে হিমশিম খেতে হয়। ঢাকার বাইরের রোগীরাও চিকিৎসা নিতে আসেন। হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে রোগীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২৮ হাজার। ২০২২ সালে তা বেড়ে হয় ১ লাখ ৬২ হাজার, ২০২৩ সালে ১ লাখ ৭৫ হাজার, ২০২৪ সালে ১ লাখ ৯২ হাজার এবং ২০২৫ সালে ১ লাখ ৯৫ হাজার।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, বায়ুদূষণে সংক্রামক ও অসংক্রামক-দুই ধরনের রোগই বাড়ছে। হাঁচি-কাশি, সর্দি, শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, অ্যালার্জি, নিউমোনিয়া, যক্ষ্মা ও ফুসফুসের ক্যানসারের মতো রোগের ঝুঁকি বাড়ে। ক্ষুদ্র বস্তুকণা শ্বাসতন্ত্রের মাধ্যমে রক্তে মিশে লিভার, কিডনিসহ বিভিন্ন অঙ্গের ক্ষতি করতে পারে। এতে কিডনি ও লিভার বিকল হওয়া এবং বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে। তিনি আরও বলেন, বায়ুদূষণে মানুষের কর্মঘণ্টা নষ্ট, চিকিৎসা ব্যয় বাড়ছে এবং জীবনমান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গড় আয়ু বাড়লেও মানুষ সেই বাড়তি আয়ুর কতটা সুস্থভাবে ভোগ করতে পারছে, তা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। দূষণ নিয়ন্ত্রণে উচ্চ আদালতের একাধিক নির্দেশনা থাকলেও তা বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।