Image description

স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে জোরালো প্রস্তুতি নিয়ে এগোচ্ছে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। আসন্ন নির্বাচনে দলীয় প্রার্থিতায় অপেক্ষাকৃত তরুণ, নতুন, ক্লিন ইমেজ ও দক্ষ মুখগুলোকে প্রাধান্য দিচ্ছেন নীতিনির্ধারকরা। ইতোমধ্যে বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দলের প্রার্থী বাছাই প্রসঙ্গে সংশ্লিষ্টদের উদ্দেশে বলেছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য ও ভালো মানুষ বাছাই করে প্রার্থী দিতে হবে। জনগণের ভোটে যাতে বিএনপির প্রার্থীরা নির্বাচিত হতে পারেন, সেদিকে লক্ষ্য রেখেই প্রার্থী বাছাই করতে হবে।

বিএনপির দলীয় সূত্র জানায়, প্রার্থী নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় এবার তৃণমূলের মতামতকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সেইসঙ্গে বিভিন্ন জরিপের মাধ্যমে প্রার্থী বাছাই করা হচ্ছে। তৃণমূলের প্রত্যক্ষ সমর্থন এবং এলাকায় সাধারণ মানুষের কাছে পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি—এ দুটিকেই মনোনয়নের প্রধান মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করছে বিএনপির হাইকমান্ড। তবে প্রার্থী বাছাইয়ের কোনো পদ-পদবি দেখা হবে না, বরং জনপ্রিয়তাই হবে মূল মানদণ্ড।

বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা বলেছেন, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা (ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন) প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের সরাসরি যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে এবং তৃণমূল পর্যায়ে উন্নয়নমূলক কাজ ত্বরান্বিত করতে স্থানীয় নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এমন প্রেক্ষাপটে সরকার নিশ্চিত করতে চায় যেন স্থানীয় নির্বাচনে সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ থাকে এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সরাসরি জনগণের কল্যাণে কাজ করতে পারেন।

সর্বশেষ গত মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এই সরকার অতীতের ফ্যাসিস্ট সরকারের মতো কোনো হস্তক্ষেপ করবে না। তাই নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে যে প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা আছে, জনগণের ভোটে জয়ী হবেন এমন প্রার্থীকে বেছে নিতে হবে। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমও বলেছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সরকার কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করবে না। জনগণ তাদের পছন্দের প্রার্থীকে অবাধে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করতে পারবেন। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। দলের সুনাম ও শৃঙ্খলা রক্ষায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রয়োজনে কঠোর অবস্থান নেবেন বলেও জানান তিনি।

দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা বলছেন, কেবল এলাকায় যিনি জনমুখী, দক্ষ, গ্রহণযোগ্য এবং সৎ—তাকেই সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে পছন্দ করা হবে। প্রার্থী নির্ধারণে তৃণমূলের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল নেতাদের মতামত ও সুপারিশ চূড়ান্ত বিবেচনার ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। চূড়ান্তভাবে দল থেকে যাকে প্রতীক বা মনোনয়ন দেওয়া হবে, ব্যক্তিপছন্দ ভুলে তার পক্ষেই দলের সকল স্তরের নেতাকর্মীকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে।

তারা জানান, এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নতুন ও তরুণ প্রজন্মকে বেশি সংখ্যায় যুক্ত করার পেছনে বিএনপির একাধিক কৌশলগত লক্ষ্য কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা তথা স্থানীয় সরকার পর্যায়ে নতুন নেতৃত্ব তৈরি করে ভবিষ্যতের জন্য যোগ্য রাজনৈতিক নেতৃত্ব গড়ে তোলা; পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি তথা বিতর্কিতদের দূরে রেখে তরুণ ও উদীয়মান এবং ত্যাগী নেতাদের সুযোগ দিয়ে জনবান্ধব ও দুর্নীতিমুক্ত ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা এবং ভোটারদের আকর্ষণ তথা দেশের তরুণ ভোটারদের মানসিকতা ও আধুনিক চিন্তাভাবনাকে নির্বাচনে সঠিকভাবে প্রতিফলিত করা।

জানতে চাইলে বিএনপির কুমিল্লা বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যক্ষ সেলিম ভুঁইয়া গতকাল কালবেলাকে বলেন, এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে অত্যন্ত অবাধ ও স্বচ্ছ। বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য হলো সুষ্ঠু নির্বাচন করা। জনগণের ভোটাধিকার প্রয়োগ নিশ্চিত করা। এ বিষয়ে প্রশাসনকে আমরা সর্বাত্মক সহযোগিতা করব। দলীয় প্রার্থী বাছাই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা কিন্তু প্রার্থী বাছাই বা মনোনয়নের কথা বলছি না। বরং স্থানীয় নেতাকর্মীদের মতামতের ভিত্তিতে একক প্রার্থীকে সমর্থন দেব। আমাদের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও সে বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন। সুতরাং স্থানীয় মতামতের ভিত্তিতে প্রার্থী সমর্থন করা হবে। তা না হলে জেলা বা বিভাগীয় পর্যায়ে নির্ধারণ করা হবে। প্রয়োজন হলে সেটি কেন্দ্রেও যেতে পারে।

সেলিম ভুঁইয়া জানান, ইতোমধ্যে তিনি তার বিভাগের কয়েকটি উপজেলার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এবং ইউনিয়নের শীর্ষ ৫ নেতাদের ডেকে কথা বলেছেন। নিজেদের মধ্যে কোনো সমস্যা থাকলে সেগুলো সমাধানের নির্দেশ দিয়েছেন। তা ছাড়া একাধিক জরিপের মাধ্যমেও সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ১৮ জুলাই দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় জেলার তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে দলের চেয়ারম্যানের গুলশান কার্যালয়ে বৈঠক করেন তারেক রহমান। এরপর ২৫ জুলাই রংপুর মহানগর, রংপুর, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট জেলার নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন বিএনপি চেয়ারম্যান। এভাবে পর্যায়ক্রমে তিনি রাজশাহী ও বরিশাল বিভাগীয় নেতাদের নিয়ে গুলশানে বৈঠক করেন। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তিনি চট্টগ্রামের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এসব বৈঠকে মূলত স্থানীয় সরকার নির্বাচনে একক প্রার্থী চূড়ান্ত করার বিষয়ে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মতামত ও মূল্যায়ন জানতে চান তারেক রহমান। দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, তৃণমূলের যোগ্য ও জনপ্রিয় নেতাদের ভোটের মাঠে নিয়ে আসতে জেলা-উপজেলার শীর্ষ নেতাদের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। শিগগিরই অন্য বিভাগের নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক করবেন বিএনপি চেয়ারম্যান।

বিএনপির সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো অনুযায়ী, প্রথমে উপজেলা বিএনপি সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম জেলা কমিটির কাছে সুপারিশ করবে। প্রার্থী বাছাই ঠিক আছে কি না, তা খতিয়ে দেখবে জেলা কমিটি। সেই সুপারিশ যাচাই-বাছাই করে বিভাগীয় টিমের কাছে পাঠাবে। কোনো পর্যায়ে অনিয়ম বা অসংগতি দেখা দিলে তা বিভাগীয় টিম পরবর্তী পর্যায়ে পর্যালোচনা করবে। আবার বিভাগীয় পর্যায়েও সমাধান না হলে বিষয়টি কেন্দ্রীয় বিএনপির দায়িত্বশীল নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ করে তারা তা সমাধান করবেন। অর্থাৎ, প্রার্থী বাছাইয়ের পুরো প্রক্রিয়াটি স্থানীয়ভাবে তৃণমূল পর্যায়ে ধাপে ধাপে পর্যালোচনার মধ্য দিয়েই সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। এর মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে অনিয়ম বা ভুলের ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি নির্বাচনের চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রতিটি এলাকায় দলীয় প্রার্থী নিশ্চিত করতে চায় দলটি।

জানা যায়, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সুষ্ঠু ও সমন্বিতভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনায় এরই মধ্যে চার সদস্যবিশিষ্ট একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা হলেন—বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, স্থায়ী কমিটির সদস্য মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ ও বিশেষ সম্পাদক বেলায়েত হোসেন মৃধা। আগামী দিনে এ কমিটির আকার আরও বাড়তে পারে।

আরও জানা গেছে, অতিসম্প্রতি গুলশানে দলের চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে বসে কমিটির সদস্যরা মহানগর, জেলা, উপজেলা ও পৌরসভার শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে অনলাইনে ‘জুম মিটিং’ করে নানা দিকনির্দেশনা ও পরামর্শ দিয়েছেন এবং স্থানীয় পর্যায়ে বিএনপির প্রকৃত অবস্থানের খোঁজখবর নিয়েছেন। এর আগে গত সেপ্টেম্বরে চট্টগ্রাম, বরিশাল, খুলনা, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে নানা নির্দেশনা পৌঁছে দিয়েছেন। একই সঙ্গে তৃণমূলের নেতাদের মতামতও নিচ্ছেন তারা। শিগগিরই বাকি বিভাগের নেতাদের সঙ্গেও জুম মিটিং শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

দলীয় সূত্র বলছে, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত চারটি বিভাগের জেলা-উপজেলা ও পৌরসভার নেতাদের জুম মিটিংয়ে এ বিষয়ে আগাম নির্দেশনা দেওয়া হয়। প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাদের সম্ভাব্য সব বিষয় মাথায় রেখেই সিদ্ধান্ত নিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি জেলা ও উপজেলার দায়িত্বশীল নেতাদের সমন্বয়ে মাঠপর্যায়ে জরিপ চালিয়ে প্রার্থী দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। প্রার্থী বাছাই করে জেলার নেতাদের কাছে তালিকা জমা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যদি কোনো কারণে সমস্যা দেখা দেয়, তা হলে বিভাগীয় টিম বা কেন্দ্রীয় বিএনপিকে জানাতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ বিরোধ কমিয়ে আনার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয় জুম মিটিংয়ে।

বিএনপি মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান কালবেলাকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে ইতোমধ্যে একাধিক নির্দেশনা দিয়েছেন। এ বিষয়ে তিনি দলের সিনিয়র চার সদস্যকে দায়িত্ব দিয়েছেন। আমি যতটুকু জানি, তারা এরই মধ্যে রংপুর, রাজশাহী, বরিশালসহ কয়েকটি বিভাগের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। দলীয়ভাবে প্রার্থীদের সমর্থন দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।

জাতীয়তাবাদী মৎস্যজীবী দলের সাবেক সদস্য সচিব মো. আব্দুর রহিম কালবেলাকে বলেন, বহু বছর পর স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এবং বিশেষ করে তরুণদের মাঝে উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে। ক্ষমতাসীন দল হিসেবে বিএনপির জন্য রাজপথের পাশাপাশি স্থানীয় প্রতিনিধি নির্বাচনে তরুণদের প্রাধান্য দেওয়াটা হবে অত্যন্ত যৌক্তিক। এতে দলের ভেতরে যেমন নতুন প্রাণসঞ্চার হবে, তেমনি সাধারণ ভোটারদের মাঝেও নতুন আশা জাগাবে। এখন দেখার বিষয়, তৃণমূলের রিকমেন্ডেশন ও তরুণদের নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের সার্বিক প্রক্রিয়ায় চূড়ান্তভাবে কতটুকু প্রভাব ফেলতে পারে।

তবে তৃণমূলের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কেন্দ্রের পক্ষ থেকে এমন নির্দেশনা ও আহ্বান জানানো হলেও শেষ পর্যন্ত স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা কতটুকু একমত হতে পারবেন, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপি চেয়ারম্যানের কঠোর বার্তা সত্ত্বেও ১৯০ জন বিদ্রোহী প্রার্থী দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন এবং পরবর্তীতে বহিষ্কৃত হন। ফলে আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনেও সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে কি না, তা নিয়ে দলের নীতিনির্ধারকদের নতুন করে ভাবতে হচ্ছে।