রিয়াদ হাসান ও শাহনাজের (উভয়েরই ছদ্মনাম) পাঁচ বছরের প্রেমের পরিণতিতে ২০১৭ সালের জুনে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়। পুরান ঢাকায় সংসার শুরু করেন তাঁরা।
এখন রিয়াদ থাকেন পুরান ঢাকাতেই। শাহনাজ মেয়েকে নিয়ে থাকেন মিরপুরে বাবার বাড়িতে। রিয়াদ কোনো খোরপোশ দেন না।
শাহনাজের ভাষ্য, সন্তানের কথা ভেবে অনেক চেষ্টা করেও সংসার টেকাতে পারেননি। রিয়াদ বিয়ে করেছেন বলেও জানান। তবে তিনি কী করবেন, এখনো ঠিক করেননি। আপাতত মেয়েকে নিয়ে ভাবছেন।
রাজধানীর খিলগাঁওয়ের বাসিন্দা আরিফ-নাজমার ৯ বছরের দাম্পত্যজীবনের পরিণতিও একই। তাঁরা দুজনই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন, দুজনই এত ব্যস্ত যে সংসারের দৈনন্দিন কাজ, সাড়ে চার বছরের সন্তানকে সময় দেওয়া—এসব হয়ে উঠছিল না। বিভিন্ন বিষয়ে মতবিরোধ থেকে তা ক্রমে জটিল আকার ধারণ করে। পরে ঘটে যায় বিচ্ছেদ।
শুধু এই দুই দম্পতি নন, রাজধানীতে একই ছাদের নিচে থেকেও পরস্পর দূরে সরে যাচ্ছেন এমন হাজারো দম্পতি। নগরের সংসার ভাঙার পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক
বাস্তবতা। পরিসংখ্যান বলছে, রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় প্রতিদিন গড়ে ভাঙছে ৪৪টি সংসার। অর্থাৎ ঘণ্টায় প্রায় দুটি করে বিচ্ছেদ ঘটছে। বিচ্ছেদের এই চিত্রে নারীদের পক্ষ থেকে আবেদনের সংখ্যাও অনেক বেশি। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায় সাত হাজার ৫১৪টি এবং জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকায় দুই হাজার ৮৫১টি তালাক কার্যকর হয়েছে।
শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, পারস্পরিক আস্থার সংকট, সন্দেহ-সংশয়, মাদকের নেশা—এসব ক্ষতিকর বিষয় প্রতিনিয়ত নগরের দাম্পত্যজীবনে ফাটল ধরাচ্ছে। আর্থিক টানাপড়েনও অনেক দাম্পত্যসংকটের বড় কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। যার পরিণতি একটি সংসারের কয়েকটি জীবনকে ফেলে দিচ্ছে ঘোর অনিশ্চয়তার মধ্যে। বিবাহবিচ্ছেদে সবচেয়ে সংকটে পড়ে নির্দোষ সন্তানরা। কে দেখবে, কার কাছে থাকবে, কে দেবে সুন্দর ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা—এই টানাপড়েনে অনেক শিশু-কিশোরের জীবন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।
দক্ষিণ সিটিতে তালাক বেশি : দক্ষিণ সিটির চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসের (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) ও উত্তর সিটি করপোরেশনের ছয় মাসে গড় হিসাব করলে দক্ষিণে তালাকের সংখ্যা বেশি। ৯ মাসের (সাত হাজার ৫১৪ তালাক) তথ্য মতে, প্রতিদিন ভাঙছে প্রায় ২৮টি সংসার। অন্যদিকে উত্তর সিটি করপোরেশনের ছয় মাসে পাওয়া (দুই হাজার ৮৫১ তালাক) তথ্য মতে, প্রতিদিন ভাঙছে ১৬টি সংসার। এ হিসাবে উত্তরের তুলনায় দক্ষিণে প্রায় ৭৫ শতাংশ বেশি তালাক কার্যকর হয়েছে।
দক্ষিণ সিটির গত কয়েক বছরের তথ্যেও বিচ্ছেদের প্রবণতা স্পষ্ট। ২০২৩ সালে সেখানে তালাকের কার্যকর হয় সাত হাজার ৫৩০টি, ২০২৪ সালে সাত হাজার ৬৯৫টি, ২০২৫ সালে আট হাজার ১৭৪টি এবং চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে সাত হাজার ৭১৪টি।
অন্যদিকে উত্তর সিটি করপোরেশনে ২০২৩ সালে আবেদন পড়ে পাঁচ হাজার ৪১৪টি, এর মধ্যে কার্যকর হয় পাঁচ হাজার ২৩০টি। ২০২৪ সালে পাঁচ হাজার ৪৫৯টি আবেদন পড়ে, তালাক কার্যকর হয় পাঁচ হাজার ৩০৫টি। ২০২৫ সালে আবেদন জমা পড়ে পাঁচ হাজার ৮৪৭টি, তালাক কার্যকর হয় পাঁচ হাজার ৩২৬টি। সর্বশেষ চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে তিন হাজার ১৫৯টি আবেদন জমা পড়ে, এর মধ্যে দুই হাজার ৮৫১টি তালাক কার্যকর হয়। এই হিসাব বলছে, সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো—বিচ্ছেদের নোটিশ যাওয়ার পর পুনর্মিলনের ঘটনা খুবই কম। আবেদনের পর ৫.৮৭ শতাংশ আপস হয়েছে।
তালাকে নারীরা দ্বিগুণ : ঢাকার দুই সিটির তথ্য বলছে, বিচ্ছেদের সিদ্ধান্তে নারীরা এখন স্পষ্টভাবে এগিয়ে। দক্ষিণ সিটির ২০২৩ থেকে ২০২৬ সালের তথ্যেও একই চিত্র দেখা যায়। সেখানে মোট ২৩ হাজার ৩৯৯টি তালাক কার্যকর হয়। এর মধ্যে নারী কর্তৃক তালাক দেওয়া হয় ১৬ হাজার ৮৪৮টি, পুরুষ কর্তৃক তালাক দেওয়া হয় ছয় হাজার ৫৫১টি।
অন্যদিকে উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ২০২৩ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ১৯ হাজার ৮৬৭টি তালাকের আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে পুরুষের আবেদন জমা পড়েছে সাত হাজার ৪১৭টি এবং নারীর আবেদন জমা পড়ে ১২ হাজার ৪৫০টি। দুই সিটির মোট ৪৩ হাজার ২৬৬টি তালাকের মধ্যে পুরুষের ১৩ হাজার ৯৬৮টি এবং নারীর ২৯ হাজার ২৯৮টি। হিসাব অনুযায়ী, পুরুষের তুলনায় নারীর পক্ষ থেকে তালাকের সংখ্যা প্রায় ১০৯.৬ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ নারীর পক্ষ থেকে প্রায় ২.১ গুণ বেশি তালাক দেওয়া হয়েছে।
তালাকের নোটিশেও অনিয়ম : দুই সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, কিছু তালাকের নোটিশে স্বামী বা স্ত্রীর পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা দেওয়া হয় না। ফলে নোটিশ পাঠানোর পর তা ফেরত আসে। আবার কেউ কেউ নোটিশ গ্রহণ না করলেও আইনি প্রক্রিয়া চলতে থাকে। মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী তালাকের নোটিশের পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পুনর্মিলনের সুযোগ থাকে। কিন্তু নোটিশ যথাযথভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে না পৌঁছালে সেই সুযোগও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
‘মনের অমিল’-দুই শব্দের আড়ালে যত কারণ : তালাকের নোটিশে সবচেয়ে বেশি যে কারণটি দেখা যায়, সেটি হলো মনের অমিল। কিন্তু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই দুই শব্দের আড়ালে রয়েছে নানা ধরনের দাম্পত্য সংকট। প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অন্তত ১২টি কারণে বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটছে। এর মধ্যে রয়েছে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, যৌতুকের চাপ, ভরণপোষণ না দেওয়া, স্বামী বা স্ত্রীর বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, মাদকাসক্তি, সন্দেহপ্রবণতা, অর্থনৈতিক চাপ, প্রবাসী স্বামীর সঙ্গে দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতা, পারিবারিক হস্তক্ষেপ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অতিরিক্ত আসক্তি, একে অন্যকে সময় না দেওয়া, যোগাযোগের ঘাটতি এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের অভাব ও ‘বিকল্প জীবনের’ আকাঙ্ক্ষা বিচ্ছেদের কারণ হচ্ছে। এসব বিষয় নারী ও পুরুষ উভয় পক্ষ থেকে সংসার ভাঙনের পেছনে কাজ করছে।
নারীরা কেন বেশি বিচ্ছেদের আবেদন করছেন : অপরাধ ও মনো বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীদের শিক্ষা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এর অন্যতম কারণ। আগে অনেক নারী নির্যাতন, অবহেলা বা অসুখী দাম্পত্য জীবন থেকে বেরিয়ে আসতে চাইলেও অর্থনৈতিক ও সামাজিক নির্ভরতার কারণে সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন না। এখন পরিস্থিতি বদলেছে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বাড়ার পাশাপাশি নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতাও বেড়েছে। ফলে দীর্ঘদিনের নির্যাতন বা অসম্মান মেনে নিয়ে সংসার চালিয়ে যাওয়ার প্রবণতা কমছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, নারীর অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধিই তালাকের নেতিবাচক কারণ নয়। বরং কোনো নারী নির্যাতন থেকে মুক্তির জন্য বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিলে সেটিকে সামাজিক পরিবর্তনের অংশ হিসেবেও দেখতে হবে। কারণ অনেক নারী স্বেচ্ছায় নয়, বরং দীর্ঘদিনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, অপমান ও অবহেলার শিকার হয়ে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের প্রভাব : সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যাপক ব্যবহার দাম্পত্য সম্পর্কের ওপরও প্রভাব ফেলছে। ফেসবুক, মেসেঞ্জারসহ বিভিন্ন মাধ্যমে নতুন সম্পর্ক তৈরি, পুরনো সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত হওয়া কিংবা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সন্দেহ তৈরি হওয়ার ঘটনাও এখন বিচ্ছেদের কারণ হয়ে উঠছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক। অনেক ক্ষেত্রে আবেদনে সরাসরি ‘বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক’ লেখা না হলেও ‘মনের অমিল’, ‘মানসিক নির্যাতন’ বা ‘দাম্পত্য কলহ’ হিসেবে কারণ উল্লেখ করা হয়।
মাদকেও ভাঙছে সংসার : দাম্পত্য বিচ্ছেদের নেপথ্যে মাদকাসক্তির বিষয়টিও উঠে আসছে। মাদক সেবনের পর নির্যাতন, পরিবারের প্রতি দায়িত্বহীনতা, অর্থ নষ্ট করা এবং সন্দেহ-অবিশ্বাসের কারণে অনেক দাম্পত্য সম্পর্কে চরম সংকট তৈরি হচ্ছে। তালাকের আবেদনে মাদকাসক্তিকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করার ঘটনাও রয়েছে।
সবচেয়ে বড় ক্ষতি সন্তানের : দাম্পত্য বিচ্ছেদের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে সন্তানদের ওপর। মা-বাবার সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর তাদের মানসিক নিরাপত্তা, পড়াশোনা, সামাজিক সম্পর্ক এবং ভবিষ্যৎ পারিবারিক জীবন সম্পর্কে ধারণায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সন্তান কিংবা সামাজিক চাপের কারণে নির্যাতনমূলক সম্পর্ক টিকিয়ে রাখাও সমাধান নয়। বরং সম্পর্ক ভাঙনের আগেই দাম্পত্য কাউন্সেলিং, পারিবারিক সহায়তা এবং প্রয়োজন হলে আইনগত সহায়তার সুযোগ বাড়ানো জরুরি।
সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, রাজধানীতে বাড়তে থাকা তালাক তাই কেবল সংসার ভাঙার পরিসংখ্যান নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নগরজীবনের চাপ, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, নারীর অধিকার সচেতনতা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, মাদক, পরকীয়া, পারিবারিক মূল্যবোধের পরিবর্তন এবং স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সহনশীলতার সংকট।