Image description

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও দখলদার ইসরাইলের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধে বিশ্বব্যাপী বেড়েছে জ্বালানি তেলের দাম। ভেঙে পড়েছে সরবরাহ শৃঙ্খল। অশান্ত হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি বোঝাই জাহাজ চলাচলেও অনিশ্চয়তা। এর ফলশ্রƒতিতে বিশ্বব্যাপী বেড়েছে জ্বালানি তেলের দাম। উচ্চ মূল্যস্ফীতির আঁচ লেগেছে সারাবিশ্বে। খরচে কাটছাঁট করছেন তারা। ফলে হোঁচট খেয়েছে দেশের সবচেয়ে বড় রফতানি বাজার তৈরি পোশাক শিল্প। অন্যান্য শিল্পেও এর প্রভাব পড়েছে। ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া, কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়া, শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলন, জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের দরবৃদ্ধি, রফতানি পণ্যে প্রত্যাশিত দাম না পাওয়া ও দেশের বাজারে ভোক্তাদের চাহিদা কমে যাওয়ায় বিক্রিও কমেছে। ফলে উৎপাদন কমিয়েছে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো। এর জেরে চলতি বছরেই বন্ধ হয়েছে অন্তত ৫০টির বেশি কারখানা, কোথাও কর্মী ছাঁটাই করে কমানো হচ্ছে খরচ। তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ ও খাত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ করে এসব তথ্য জানা গেছে।

সবশেষ কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘটনা ঘটেছে গাজীপুর মহানগরীর কোনাবাড়ীর এলাকায় কেয়া গ্রুপের চারটি পোশাক কারখানায়। ছাঁটাইয়ের আওতায় আসা প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- কেয়া গ্রুপের নিট কম্পোজিট ডিভিশন, স্পিনিং ডিভিশন, কটন ডিভিশন ও কেয়া ইয়ার্ন মিলস লিমিটেড। সেপ্টেম্বর মাসে প্রথম দফায় এসব কারখানা থেকে ছয় শতাধিক শ্রমিক-কর্মচারীকে ছাঁটাই করা হয়েছিল। গত সোমবার আরও ৭৩৯ জন শ্রমিক ও কর্মচারীকে ছাঁটাই করা হয়েছে। দুই দফা মিলিয়ে ছাঁটাই হওয়া কর্মীর সংখ্যা এক হাজার ৩০০ ছাড়িয়ে গেল।

কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও চেয়ারম্যানের স্বাক্ষর করা নোটিসে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে চলমান ব্যাংকিং জটিলতা ও সময়মতো গ্যাস বিল পরিশোধ করতে না পারায় গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে কারখানার স্বাভাবিক উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়া প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত জনবল থাকায় উৎপাদন ও প্রশাসনিক ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে বিভিন্ন বিভাগ ও সেকশনের কিছু পদ বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে।

শিল্প পুলিশ, বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ’র তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের আগষ্ট থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত দেশের সাতটি প্রধান শিল্পাঞ্চলে ৪৫৭টি শিল্প ইউনিট স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যে ১০৮টি বিজিএমইএ সদস্য কারখানা, ৩৫টি বিকেএমইএ সদস্য কারখানা, ৮টি বিটিএমএ সদস্য কারখানা ও ১৯টি বেপজা-সংশ্লিষ্ট কারখানা। বাকি ২৮৭টি ছিল পোশাক খাতের বাইরে অন্যান্য শিল্প। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসের তথ্য বলছে, অন্তত ৮০টি কারখানায় প্রায় ১৯ হাজার ১৮৮ শ্রমিক চাকরিচ্যুত বা ছাঁটাই হয়েছেন। এর মধ্যে ২৭টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। সবমিলিয়ে বছরের প্রথম নয় মাসে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের সংখ্যা ৩০ হাজার ছাড়াবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। অন্যদিকে অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে, যার কোন সঠিক পরিসংখ্যান নেই।

নীট পোশাক মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ’র সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম ইনকিলাবকে বলেন, গত তিন বছরে সাড়ে চারশ’র মতো কারখানা ইতিমধ্যে বন্ধ হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকেও অন্তত ৪৫ থেকে ৫০টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। সরকার একদিকে মজুরি বৃদ্ধি করছে। অন্যদিকে অনেক কারখানা বর্তমান কাঠামোতেই মজুরি দিতে পারছে না। এজন্য কোথাও কারখানা বন্ধ হচ্ছে, আবার কোথাও মজুরি বৃদ্ধির আগেই কর্মী ছাঁটাই চলছে। আমরা শ্রমমন্ত্রীকে জানিয়েছি, মজুরি বৃদ্ধি যেমনই হোক যাতে বাস্তবায়নের জন্য দুটি কারণে সময় দেয়া হয়। প্রথমত, এই মজুরি নিয়ে যাতে ক্রেতার সঙ্গে দরকষাকষি করা যায়। দ্বিতীয়ত, যারা মজুরি সমন্বয় করতে পারবে না, তারা যেন কারখানা চালাবে নাকি বন্ধ করবে সেই সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় ক্রেতারা তাদের কেনাকাটায় কাটছাঁট করছেন। এতে স্বাভাবিকভাবেই কমে গেছে দেশে উৎপাদিত পণ্যের রফতানি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস বলছে, চলতি ২০২৬ সালে বৈশ্বিক গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে চার দশমিক ৭০ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। অন্যদিকে সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়াতে পারে ১০ দশমিক ৯০ শতাংশে।

তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমএই’র সাবেক সভাপতি ও জায়ান্ট গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুক হাসান ইনকিলাবকে বলেন, যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। তৈরি পোশাকের চাহিদাও কমেছে। অর্ডার কমে যাওয়ায় আমাদের খরচও বেড়েছে। এছাড়া দেশে জিনিসপত্রের দাম, কাঁচামালের খরচ, তেল-বিদ্যুতের দাম বেড়েছে। বাজার ধরে রাখতে কমদামে অর্ডার নিতে হচ্ছে। সবমিলিয়ে বাজারে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হচ্ছে।

দ্রব্যমূল্য ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণের বিষয় তুলে ধরে তিনি বলেন, বাসে-ট্রাকে সব জায়গায় দলীয় চাঁদাবাজির কারণে জিনিসপত্রের দাম বাড়ে। দ্রব্যমূল্য ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, শ্রমিক অধ্যুষিত এলাকায় বাড়িভাড়ার বিষয়টা দেখভাল করতে পারলে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির চাহিদা থাকবে না। প্রতিবছরই শ্রমিকদের নয় শতাংশ ইনক্রিমেন্ট হচ্ছে। এরচেয়ে বেশি বাড়াতে গেলে আরও কারখানা বন্ধের সম্ভাবনা তৈরি হবে। সরকারকে এসব বিষয় শক্তহাতে দমন করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্যাকেজ ঋণ না পাওয়া ও এনবিআরের অসহযোগিতার কারণেও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে রফতানি। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিক জুলাই-সেপ্টেম্বরে দেশের মোট রফতানি আয় হয়েছে এক হাজার ৩০৯ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে রফতানি আয় ছিল এক হাজার ২৩১ কোটি ডলার। সে হিসেবে রফতানি প্রবৃদ্ধি ছয় দশমিক ৩৪ শতাংশ। রফতানির গতি স্বাভাবিক থাকলে সাধারণত এই প্রবৃদ্ধি আরও বেশি হওয়ার কথা।

বন্ধ কারখানা চালু করা, কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা করা, সিএমএসএমই খাতের উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। তথ্য অনুযায়ী, ঘোষণা করা ৬০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে এখন পর্যন্ত ১১ হাজার ৯৫৯ কোটি ৮২ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। দুই হাজার ৫৫৮ কোটি ৯৭ লাখ টাকার আবেদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি সংকট, কাঁচামাল আমদানির জটিলতা ও ব্যাংকিং খাতের পরিস্থিতির কারণে ধীরগতি দেখা যাচ্ছে ঋণ বিতরণে।

প্রায় চার হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান করা গাজীপুরের এক পোশাক কারখানার মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইনকিলাবকে বলেন, বিদ্যুৎ ও তেলের দাম বাড়ায় এমনিতেই খরচ আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। বিভিন্নভাবে প্রতিনিয়তই খরচ বাড়ছে। অন্যদিকে খরচ অনুযায়ী ক্রেতারা দাম দিচ্ছেন না। সরকার প্যাকেজ লোনের ঘোষণা দিলেও তা পাওয়া যাচ্ছে না। ৪৫ লাখ ডলারের ক্রয়াদেশ আসলেও মাত্র রফতানি করতে পেরেছি ১২ লাখ ডলার। কাস্টমস ও ডিপো কর্তৃপক্ষের অসহযোগিতার কারণে বাকি ৩৩ লাখ ডলারের পণ্য বন্দরেই পড়ে আছে। এভাবে চলতে থাকলে আমার কারখানাও বন্ধ করে দিতে হবে।

ব্যবসা-বাণিজ্যে স্লথগতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া ও কর্মসংস্থান হারানোর ফলে দেশের বাজারেও নিত্যপণ্য ও ভোগ্যপণ্যের চাহিদা কমেছে। আবাসন খাত, প্রযুক্তি পণ্য থেকে শুরু করে সব ধরণের খাত পড়েছে মন্দার কবলে। চাহিদা কমার প্রেক্ষাপটে উৎপাদন কমিয়েছে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো। সার্বিকভাবে বিক্রি কমে দাঁড়িয়েছে অর্ধেকে।
স্টিল, সিমেন্ট, খাদ্যদ্রব্য, চা ও ডেইরিসহ নানা খাতে ব্যবসা পরিচালনা করা দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় একটি শিল্পগ্রুপের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইনকিলাবকে বলেন, আমাদের গ্রুপে এখনো কোন ছাঁটাই হয়নি। তবে ব্যবসা-বাণিজ্যের অবস্থা খারাপ। জ্বালানির দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিক্রি গেছে।

আগে ১২ ঘণ্টা ধরে উৎপাদন চলতো, এখন সেটা চলে ছয় ঘণ্টা। এভাবেই চলছে এখন। ব্যবসা-বাণিজ্যে খুব কঠিন সময় যাচ্ছে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, নির্মাণসামগ্রীর আকাশছোঁয়া খরচ ও নতুন বাজেটে অপ্রদর্শিত আয় বিনিয়োগের সুযোগ বাতিলের কারণে বর্তমানে বাংলাদেশের আবাসন খাতে বিনিয়োগ ও বিক্রি কমেছে। শান্তা গ্রুপের প্রধান বিপণন কর্মকর্তা শিহাব আহমেদ ইনকিলাবকে বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্য মোটামুটি। সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে মানুষ সিদ্ধান্তহীনতায় আছে। এখন বিনিয়োগ করবে কি, করবে না। সবকিছু হিসাব নিকাশ করে মানুষ এখন ধীরে সুস্থে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের জেরে দেশের প্রযুক্তি খাতের ব্যবসায়ও পড়েছে ভাটার টান। কম্পিউটার ও ল্যাপটপের সিপিইউ, জিপিইউ এবং মেমরি চিপ, স্মার্টফোন, ট্যাব, রাউটার থেকে শুরু করে সব ধরনের পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী। তাই বিক্রি নেমে এসেছে অর্ধেকে।

স্মার্ট টেকনোলজিসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জহিরুল ইসলাম ইনকিলাবকে বলেন, সারাবিশ্বে সেমিকন্ডাক্টর চিপের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। তাই মেমরির দাম আগের তুলনায় বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজার দাম বাড়ায় এর প্রভাব পড়েছে কম্পিউটারের দামেও। বিক্রি আগের তুলনায় অনেক কমেছে। এই সংকট হয়তো আগামী বছরেও থাকবে। তবে সরকার ব্যবসাবান্ধব করনীতি প্রণয়ন করায় দাম বৃদ্ধির প্রভাব পুরোটা পড়েনি।
দেশে ক্ষুদ্র, মাঝারি ও কুটির শিল্প খাতে প্রতিষ্ঠান ছাড়িয়ে গেছে ৭৮ লাখেরও বেশি। যার মধ্যে ৫৫ লাখের অবস্থান গ্রামাঞ্চলে। আর এসব প্রতিষ্ঠানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত মানুষের সংখ্যা দুই কোটিরও বেশি। এসএমই ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে, জিডিপিতে এসব খাতের অবদান ৩২ শতাংশ। তবে নানা সংকটে অনেক ছোট উদ্যোক্তা তার ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন।

এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নাজিম হাসান সাত্তার ইনকিলাবকে বলেন, গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ের খরচ অনেক বেড়ে গেছে। এ কারণে অনেক ছোট উদ্যোক্তা ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন। বিভিন্ন বাণিজ্য সংগঠন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন। যেমন লালবাগে প্লাস্টিক খাতের অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে বলে জানিয়েছে তাদের অ্যাসোসিয়েশন। এ রকম অনেক সংগঠনের পক্ষ থেকেই বলা হচ্ছে। তবে বন্ধ হয়ে যাওয়া ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সুনির্দিষ্ট কোন তথ্য জানাতে পারেননি তিনি।

ছন্দহীন এমন অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে ভাটা পড়েছে দেশের রাজস্ব আয়েও। ফলে সরকারকে বাধ্য হয়েই নিতে হচ্ছে বাড়তি ঋণ। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে রাজস্ব ঘাটতি ২৯ হাজার কোটি টাকা। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ছিল পাঁচ লাখ তিন হাজার কোটি টাকা। অর্থবছর শেষে ঘাটতি ছিল প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ছয় লাখ চার হাজার কোটি টাকা।

আমদানি কমে যাওয়া, ডলার সংকট ও এলসি খোলায় কড়াকড়ি, বেসরকারি খাতের মন্দা, আবাসন, রড-সিমেন্ট, শপিংমল থেকে শুরু করে খাদ্যপণ্য-সব খাতেই বেচাকেনা ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমেছে। ব্যবসা ভালো না হলে রাজস্ব আদায় কমে। এর প্রভাবে ব্যয় মেটাতে সরকারকে ব্যাংক ঋণের ওপর বেশি ঝুঁকতে হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি এখন চার দশমিক ৪৭ শতাংশ। কোভিডের সময়ও বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি সাত দশমিক পাঁচ শতাংশের ওপরে ছিল।

ব্যাংকে প্রচুর টাকা পড়ে থাকলেও উদ্যোক্তারা ঋণ নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। চলতি বছরের আগষ্টের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোতে অলস বা উদ্বৃত্ত তারল্যের পরিমাণ চার লাখ ৪১ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। উদ্যোক্তারা ঋণ না নেওয়ায় ব্যাংকগুলো অলস টাকা দিয়ে সরকারি গোল্ডেন ট্রেজারি বিল-বন্ডে বিনিয়োগ করছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে নতুন বিনিয়োগে ঝুঁকি নিতে চাইছেন না উদ্যোক্তারা। কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি, গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিশ্চিত সরবরাহ উৎপাদন ব্যাহত করছে। সামগ্রিক উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় নতুন শিল্প স্থাপন বা সম্প্রসারণে ব্যবসায়ীরা নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। যদিও কিছু ক্ষেত্রে সুদের হার কমানো বা নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চলছে। আবার উচ্চ খেলাপি ঋণ ও নিরাপত্তার কারণে ব্যাংকগুলোও নতুন ঋণ বিতরণে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করছে। ফলে ব্যাংকে টাকা অলস পড়ে আছে।

আর সেই অলস টাকা সরকার নিচ্ছে।
সার্বিক বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন ইনকিলাবকে বলেন, সরকারের লক্ষ্য অর্থনীতিতে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র বড় করা। এজন্য ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণে যেতে যে পরিবেশ দরকার তা সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে। বিনিয়োগের উন্নত পরিবেশ তৈরি, গ্যাস-বিদ্যুতের সরবরাহ ঠিক রাখা, ব্যবসাবান্ধব নীতি প্রণয়ন, অনুকূল ব্যাংকিং ও কর ব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো করা সরকারের কাজ। এরপরও কিছুক্ষেত্রে কর্মসংস্থান হবে, কিছুক্ষেত্রে ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে। এগুলো অর্থনীতির চলমান প্রক্রিয়ারই অংশ। তবে আন্তর্জাতিক ইস্যুতে ব্যবসায় লাভ না হলে সেখানে সরকারের কিছু করার থাকে না। এখানে যাদের চাকরি গেছে তারা শ্রম আইনের অধীনে তাদের পাওনাদি পেয়েছে কিনা; এ বিষয়ে সরকারের দায়িত্ব আছে।