গায়ে ‘এসআরবি’ লেখা কালো জ্যাকেট, সঙ্গে ভুয়া পরিচয়পত্র ও হ্যান্ডকাফ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয় দিয়ে ব্যবসায়ীকে তুলে নেয়া, পরে পরিবারের কাছে লাখ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি। চট্টগ্রামের বাঁশখালীর ব্যবসায়ী মোহাম্মদ এহছান ওরফে হাসানকে অপহরণের ঘটনায় সামনে এসেছে এমনই এক চক্রের নাম।
বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম ব্যবসায়ীকে উদ্ধার পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন। তিনি বলেন, ১৭ অক্টোবর রাতে বাঁশখালীর পুঁইছড়ির প্রেমবাজারে নিজের হার্ডওয়্যারের দোকান থেকে হাসানকে তুলে নেয়া হয়। কালো পোশাকের ওপর ‘এসআরবি’ লেখা জ্যাকেট পরা কয়েকজন ব্যক্তি নিজেদের বাহিনীর সদস্য পরিচয় দিয়ে তার নামে মামলা থাকার কথা জানান। এরপর হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।
কয়েক ঘণ্টা পর তার পরিবারের কাছে ফোন করে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। টাকা না দিলে হত্যার হুমকিও দেয়া হয়। পুলিশের দাবি, অপহরণের পর হাসানকে একাধিক স্থানে নেয়া হয় এবং শেষ পর্যন্ত টেকনাফের লেদা এলাকার ২৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আটকে রাখা হয়েছিল। সেখানে তাকে মারধর করে পরিবারের কাছ থেকে টাকা আদায়ের জন্য চাপ দেয়া হয়।
পুলিশ সুপার জানান, ক্যাম্পের ভেতরে সরাসরি অভিযান চালানোর ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে কৌশলে তাঁকে বাইরে আনার উদ্যোগ নেয়া হয়। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মাধ্যমে ক্যাম্পে থাকা সহযোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে হাসানকে ক্যাম্পের বাইরে নিয়ে আসতে বলা হয়। পরে প্রায় পাঁচদিন পর বুধবার ভোর চারটার দিকে সেখান থেকেই তাকে উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় চাকরিচ্যুত সাবেক র্যাব সদস্য সুমন মুন্সীসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন- মিজানুর রহমান, জয়নাল উদ্দিন, দেলোয়ার হোসেন, আব্বাস উদ্দিন এবং ছলিম ওরফে সেলিম।
অপহরণে ‘এসআরবি’ লেখা জ্যাকেট ব্যবহারের উদ্দেশ্য সম্পর্কে পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয় দিয়ে ভুক্তভোগীকে ভয় দেখানো এবং তাকে সহজে নিয়ন্ত্রণে নেয়া। পুলিশের অভিযানে ‘এসআরবি’ লেখা পাঁচটি কালো জ্যাকেট, দু’টি ভুয়া পরিচয়পত্র ও একটি হ্যান্ডকাফ জব্দ করা হয়েছে। পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, প্রাথমিক তদন্তে একটি পরিকল্পিত চক্রের তথ্য পাওয়া গেছে। চক্রটির সদস্যরা সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের চলাফেরা ও অবস্থান সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে সুমন মুন্সীকে জানাতেন বলে পুলিশের ধারণা। এরপর ভুয়া পরিচয়ে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হতো বলে দাবি পুলিশের।
পুলিশ জানায়, সুমন মুন্সী আগে র্যাব-এ কর্মরত ছিলেন। ২০২১ সালে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে তাকে চাকরি থেকে অপসারণ করা হয়। তার বিরুদ্ধে ছিনতাই, দস্যুতা ও অস্ত্র আইনে ১৩টি মামলা রয়েছে। পরে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের নিয়ে তিনি একটি চক্র গড়ে তোলেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে। জয়নাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে তিনটি, ছলিম ওরফে সেলিমের বিরুদ্ধে দু’টি এবং আব্বাস উদ্দিনের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি মামলা রয়েছে। পুলিশের দাবি- ভুয়া ‘এসআরবি’ পরিচয় ব্যবহার করে অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের পরিকল্পনা করতেন সুমন। চক্রের সদস্যরা সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের আর্থিক অবস্থা ও চলাফেরার তথ্য সংগ্রহ করে তাকে জানাতেন। বাঁশখালীর আব্বাস উদ্দিন স্থানীয়ভাবে তথ্য সংগ্রহ ও সমন্বয় করতেন।
আর ছলিম ওরফে সেলিম টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্প-২৬ এর বাসিন্দা হওয়ায় ক্যাম্পের ভেতরে যোগাযোগ ও সমন্বয়ে সহায়তা করতেন বলে ধারণা করছে পুলিশ। সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে কেউ কাউকে নিয়ে যেতে চাইলে আগে তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। সন্দেহজনক পরিস্থিতিতে আশপাশের লোকজনের সহায়তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট থানায় যোগাযোগের পরামর্শ দেন তিনি। হাসানকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করাকে অভিযানের বড় সাফল্য বলেও উল্লেখ করেন পুলিশ সুপার।