Image description

প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। বিশেষ করে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের বৈদেশিক কর্মসংস্থান তুলনামূলক এগিয়ে। কিন্তু আঞ্চলিক সংঘাত, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ নীতির কারণে সংকুচিত হয়ে আসছে এসব শ্রমবাজার। চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে বিদেশে কর্মী যাওয়া কমেছে প্রায় ৩৩ শতাংশ। সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার সৌদি আরবেও কর্মী গমন কমছে দিন দিন। অন্যদিকে, মালয়েশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাজার দীর্ঘদিন সীমিত থাকায় বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগও সংকুচিত হয়ে আসছে। এমন পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিনের শ্রমবাজার নির্ভরতা, দক্ষ কর্মী তৈরিতে সীমাবদ্ধতা এবং নতুন বাজার অনুসন্ধানে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি সংকট আরও বাড়াচ্ছে। অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিকল্প শ্রমবাজার তৈরি, চাহিদাভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়ন ও কার্যকর অভিবাসন কূটনীতিতে জোর না দিলে কর্মসংস্থান, প্রবাসী আয় ও কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকিতে পড়তে পারে বাংলাদেশ।

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২৯শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিদেশে গিয়েছিলেন ৮ লাখ ৩৮ হাজার ৮৯৪ জন বাংলাদেশি। চলতি বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৬৩ হাজার ৬৯৩-এ। অর্থাৎ কমেছে ২ লাখ ৭৫ হাজার ২০১ জন।

সৌদি আরবে সংঘাত, আটকা কর্মীরা: সৌদি আরবে হামলা ও বিমান চলাচলে সীমাবদ্ধতার কারণে কর্মীদের যাতায়াতে ভোগান্তি বাড়ছে। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, ছুটিতে দেশে এসে আটকা পড়েছেন অন্তত ২০ হাজার প্রবাসী। তাদের অনেকেই কর্মস্থলে ফিরতে না পেরে চাকরির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। বড় শ্রমবাজার সৌদি আরবে কর্মী গমনও কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। ২০২৫ সালের প্রথম ৯ মাসে দেশটিতে গিয়েছিলেন ৫ লাখ ৬৮ হাজার ৮৩ জন। চলতি বছরের একই সময়ে গেছেন ৩ লাখ ৭ হাজার ৮৮৭ জন, যা ৪৫ দশমিক ৮ শতাংশ কম। ২০২৫ সালে মোট ১১ লাখ ৩২ হাজার ৩৬০ জন বাংলাদেশি বিদেশে যান। তাদের মধ্যে ৭ লাখ ৫৫ হাজার ১৯৪ জনই সৌদি আরবে। চলতি বছরের ২১শে অক্টোবর পর্যন্ত বিএমইটি থেকে বহির্গমন ছাড়পত্র নিয়েছেন ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭১৮ জন।

সম্প্রতি হুতিদের হামলায় সৌদি আরবে শ্রমবাজারে টালমাটাল অবস্থায় পড়েছে বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষরা। যারা সৌদি আরবে অবস্থান করছেন, তাদের প্রতি মুহূর্ত আতঙ্কে কাটছে। এদিকে, যারা দেশে এসেছেন ছুটিতে তাদের যাওয়া নিয়ে পড়তে হচ্ছে বাড়তি বিড়ম্বনায়।
সৌদি আরবের রিয়াদ ও দাম্মামগামী ফ্লাইট বন্ধ থাকায় বিকল্প রুটে দেশে ফিরছেন প্রবাসীরা। এতে টিকিটের বাড়তি দাম গুনতে হচ্ছে। পাশাপাশি এক শহর থেকে অন্য শহরে যাতায়াতেও ব্যয় হচ্ছে বিপুল অর্থ।

সৌদি আরবের জেদ্দা থেকে ঢাকায় আসা প্রবাসী সুবল দাস বলেন, দীর্ঘ ১৫ মাস পর দেশে ফেরা। চিরচেনা পরিবেশে ফিরে স্বস্তি মিললেও মন জুড়ে জমে আছে আক্ষেপ। দু’দিন আগেও দেশে আসার টিকিটের দাম ছিল ১ হাজার ৯০০ থেকে ২ হাজার রিয়াল। কিন্তু একদিনের ব্যবধানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬০০ রিয়ালে। মাত্র একদিনের ব্যবধানে বাড়তি ৬০০ থেকে ৭০০ রিয়াল খরচ করে দেশে ফিরতে হচ্ছে।

একই ফ্লাইটে সৌদি আরবের রিয়াদ থেকে দেশে ফিরেছেন ফরিদপুরের আতিয়ার মণ্ডল। গত ১৪ই অক্টোবর রিয়াদ থেকে দেশে ফেরার টিকিট কাটেন তিনি। কিন্তু রিয়াদগামী ফ্লাইট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কিছুদিন অপেক্ষা করেন। পরে বাধ্য হয়ে জেদ্দা থেকে নতুন করে টিকিট কাটতে হয় তাকে। রিয়াদ থেকে বাসে মক্কা, সেখান থেকে আবার বাসে জেদ্দায় পৌঁছান। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে শেষ পর্যন্ত দেশে ফিরতে পারলেও বাড়তি খরচের চাপ নিয়ে ফিরেছেন তিনি।
রিয়াদে থাকা আরেক প্রবাসী নাজমুল ইসলাম বলেন, প্রতি মুহূর্ত মিসাইল আতঙ্ক নিয়ে কাজে যাই। নিজেও শান্তিতে নেই। পরিবারও চিন্তা করেন। যারা দেশে গেছেন তাদেরও ফেরা নিয়ে নানা দুশ্চিন্তা কাজ করছে। সকল সৌদি প্রবাসীদের মধ্যে চাপা আতঙ্ক।

রেমিট্যান্সে অনিশ্চয়তা: চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ২ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার, যা গত ১১ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। তবে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় তা ৩ শতাংশ বেশি। আগস্টে এসেছিল ২ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ১লা জুলাই থেকে ৩০শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রেমিট্যান্স এসেছে ৮ হাজার ৫৯১ মিলিয়ন ডলার, আগের অর্থবছরের একই সময়ে যা ছিল ৭ হাজার ৫৮৬ মিলিয়ন ডলার।

ঘুরে ফিরে কয়েকটি দেশের ওপরই নির্ভরতা: প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ২০৩টি দেশে কর্মী পাঠানো হয়েছে। এ সময়ে বিদেশে যাওয়া ১ কোটি ১০ লাখের বেশি কর্মীর প্রায় ৭৯ শতাংশ গেছেন মাত্র পাঁচটি দেশে; ৯৪ শতাংশের গন্তব্য ছিল ১০টি দেশ। অন্যদিকে, ৯৮টি দেশে দেড় দশকে ১০০ জন করেও কর্মী পাঠানো যায়নি।

মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও ওমানের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাজারে কর্মী যাওয়ার সুযোগ বন্ধ ও অনেক সীমিত হয়েছে। মালয়েশিয়ায় ২০২৪ সালের জুনে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগে শ্রমবাজার বন্ধ হয়। ওমানেও ২০২৪ সাল থেকে কর্মী যাওয়ার সুযোগ কার্যত বন্ধ। আমিরাতে ২০২৩ সালে প্রায় এক লাখ কর্মী গেলেও ২০২৫ সালে গেছেন মাত্র ১৩ হাজার ৭৫০ জন।

বিকল্প বাজারেও ঝুঁকি: নতুন গন্তব্যের সন্ধানে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন কর্মীরা। কম্বোডিয়ায় কলসেন্টারে চাকরির প্রলোভনে নিয়ে অনলাইন প্রতারণায় যুক্ত করার অভিযোগ রয়েছে। বিএমইটি’র হিসাবে, ২০২৫ সালে দেশটিতে যাওয়ার জন্য ১২ হাজার ২৬৩ জন ছাড়পত্র নিয়েছেন। একই বছর রাশিয়ায় গেছেন ৪ হাজার ৭২৭ জন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু নতুন বাজার খোলার ঘোষণা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন চাহিদাভিত্তিক প্রশিক্ষণ, ভাষা শিক্ষা, স্বচ্ছ নিয়োগপ্রক্রিয়া, দূতাবাসগুলোর সক্রিয় ভূমিকা এবং কর্মীদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের শ্রমবাজারনির্ভরতা কাটিয়ে ওঠার পরীক্ষা। বিকল্প কর্মসংস্থানের বাস্তবসম্মত প্রস্তুতি কতোটা কার্যকর হয়, তার ওপরই নির্ভর করবে ভবিষ্যতের বিদেশগামী কর্মীদের সুযোগ ও প্রবাসী আয়ের স্থিতিশীলতা।

ভিসা জটিলতায় আমিরাতপ্রবাসীরা: সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের সময় বিক্ষোভে অংশ নেয়ার দায়ে ৫৭ বাংলাদেশির কারাদণ্ডের পর দেশটি বাংলাদেশিদের জন্য সাময়িকভাবে ভিসা দেয়া বন্ধ করে দেয়। সাধারণ কর্মীদের জন্য শ্রমবাজার এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। তবে হাই-প্রফেশনাল ভিসা চালু রয়েছে। সূত্র বলছে, দেশটিতে অন্তত ১০ থেকে ১২ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত। তাদের অনেকে ভিসা জটিলতায় পড়েছেন। চলতি বছরের জুলাই থেকে অনেকের ভিসা বাতিল হচ্ছে। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এভাবে প্রায় ৫ হাজার বাংলাদেশি অবৈধ হয়ে পড়েছেন। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের দাবি, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের হামলার সময় যুদ্ধের ভিডিও সরাসরি সম্প্রচার বা ছড়িয়ে দেয়ার ঘটনায় জড়িতদের এআই প্রযুক্তিতে শনাক্ত করে ভিসা বাতিল করা হচ্ছে।

মালয়েশিয়া-জাপানে নতুন উদ্যোগ: মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগপ্রক্রিয়া শুরুর ঘোষণা দিয়েছে সরকার। অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে কর্মীরা আবেদন করতে পারবেন। তবে কতোজন কর্মী যেতে পারবেন এবং নিয়োগ কতো দ্রুত সম্পন্ন হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
জাপানের সঙ্গে কর্মসংস্থান-সংক্রান্ত চুক্তি অনুযায়ী, আগামী বছরের ১লা এপ্রিল থেকে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ শুরু হওয়ার কথা জানিয়েছেন প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়। চুক্তির মেয়াদ পাঁচ বছর, যা পরে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আরও পাঁচ বছর বাড়বে। তবে কর্মী নিয়োগের সংখ্যা এখনো নিশ্চিত করা হয়নি।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ আলী আল হুমুদির সঙ্গে গত ১৩ই অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহ্দী আমিনের বৈঠকে শ্রমবাজার সম্প্রসারণ, ট্যাক্সিচালক ও ট্রাকচালক নিয়োগ এবং দক্ষ কর্মী পাঠানোর বিষয়ে আলোচনা হয়।

এসব বিষয়ে অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর মানবজমিনকে বলেন, দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের কর্মীদের জন্য বিকল্প শ্রমবাজার খুঁজে বের করা জরুরি। কোন কোন দেশে বাংলাদেশের কর্মীদের চাহিদা রয়েছে এবং সেখানে কী ধরনের কাজের সুযোগ আছে, তা চিহ্নিত করতে হবে। পাশাপাশি, সংশ্লিষ্ট দেশের চাহিদা অনুযায়ী কর্মীদের প্রস্তুত করা, সচেতনতা বাড়ানো, প্রশিক্ষণ দেয়া এবং বিদেশে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। সরকার এ ধরনের উদ্যোগের কথা নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেখ করেছেন। তবে সেগুলোর সবকিছুরই সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবায়ন শুরু হতে দেরি হয়।