Image description

সৌদিতে শিরশ্ছেদের আগের দিন সুইটির সঙ্গে শেষবারের মতো কথা হয় তার পিতার। তবে বিচার বা মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে কিছু জানায়নি সুইটি। সুইটি আক্তারের বাড়ি টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলায়। মো. ফজল মিয়া ও জহুরা বেগমের মেয়ে সুইটি। পাঁচ বোনের মধ্যে সবার ছোট ছিলেন তিনি। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় বিয়ে হয় সুইটি আক্তারের। সেই সংসার টেকেনি। স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ার পর একমাত্র সন্তানকে নিয়ে চলে আসেন বাবার বাড়িতে।

এরপর পরিবারের চাপে আরেকজনকে বিয়ে করেন। কিন্তু স্বামী সৌদি আরবে যাওয়ার পর যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। কী করবেন কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলেন না। মেয়ের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে এবং বাবার সংসারের অভাব দূর করতে তিন বছর আগে সৌদি আরবে যান সুইটি আক্তার। সেখানে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ করতেন। কিন্তু সৌদি আরবে যাওয়ার মাত্র ছয় মাসের মাথায় তিনি গ্রেপ্তার হন।

তখন সুইটি আক্তার পরিবারকে জানিয়েছিলেন, সৌদি আরবে তার সঙ্গে কাজ করা অন্য নারীরা অবৈধভাবে একটি গাড়ি কিনেছেন। এ ঘটনায় তাদের সঙ্গে তাকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কারাগারে থাকলেও মা-বাবার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল তার। কোনো কারণে ফোন দিতে না পারলেও দুশ্চিন্তা করতে নিষেধ করেছিলেন। সর্বশেষ ১৩ই অক্টোবর সন্ধ্যায় বাবার সঙ্গে তার কথা হয়। এর দুইদিন পর সুইটি আক্তারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার খবর পান মা-বাবা।

মঙ্গলবার সুইটি আক্তারের বাড়ি গিয়ে দেখা যায়, উঠানে কয়েকজন জড়ো হয়ে কথা বলছেন। তাদের কেউ সুইটির স্বজন, কেউবা প্রতিবেশী। সুইটির মা-বাবা তখন ঘরের বারান্দায় বসে ছিলেন।

মেয়ের কথা জিজ্ঞাসা করতেই কান্না শুরু করেন মা জহুরা বেগম। কোনোরকমে নিজেকে সামলে বললেন, ‘আমি কেমনে বাঁচুম রে, আমার সুইটিরে আইনা দ্যাও রে।’ কান্নার কারণে কথা বলতে পারছিলেন না জহুরা বেগম। একপর্যায়ে বললেন, ‘মা তুই কতো দুঃখ পাইয়া গেছস, কেউর কাছে কইলি না। আমার কাছেও কইলি না...আমার মাইয়ার লাশ আইনা দাও। আমি ওরে দেহুম।’

কথা হয় সুইটি আক্তারের বাবা মো. ফজল মিয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘একটি এজেন্সির মাধ্যমে ২০২৩ সালের মার্চে সৌদি আরবে যায় মেয়ে। সেখানে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ করতো। সৌদিতে যাওয়ার পর প্রায় ছয় মাস মেয়ের সঙ্গে তাদের নিয়মিত কথা হতো। এরপর হঠাৎ একদিন মেয়ে ফোন করে জেলে বন্দি থাকার কথা জানায়। ওর (সুইটি) কয়েকজন বান্ধবী অবৈধভাবে নাকি একটি গাড়ি কিনেছিল, সে কারণে অন্যদের সঙ্গে মেয়েকেও গ্রেপ্তার করেছে। কারাগারে থাকা অবস্থায় কোনো কোনো সময় এক সপ্তাহ আবার কোনো সময় এক মাস পর কথা হতো। এভাবে এক বছর চলার পর হঠাৎ যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। স্বজনেরা মনে করেন, সুইটি আক্তার সৌদি আরবে কারও না কারও ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে, সেটি পরিবারের কেউ বিশ্বাস করেন না।

ফজল মিয়া বলেন, দীর্ঘ এক বছর পর সুইটি আবার ফোনে যোগাযোগ করে। তখনো জেলে থাকার কথা বলেছিল। ফোন না দিলেও দুশ্চিন্তা করতে নিষেধ করেছিল। এভাবে প্রায় চার মাস চলে। এরপর আর কোনো যোগাযোগ ছিল না। সর্বশেষ মঙ্গলবার মাগরিবের নামাজের পর সুইটির সঙ্গে কথা হয়। তবে বিচার বা মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে কিছু জানায়নি।

স্বজনেরা মনে করেন, সুইটি আক্তার সৌদি আরবে কারও না কারও ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে, সেটি পরিবারের কেউ বিশ্বাস করেন না।

সুইটির মা-বাবার সঙ্গে কথা বলার সময় সেখানে ছিলেন তার চাচাতো বোন সালমা আক্তার। বয়সে তিনি সুইটির বড়। তিনি বলেন, স্বামীর সংসারে থাকার সৌভাগ্য হয়নি সুইটির। দ্বিতীয় বিয়ের পর ধারদেনা করে জামাতাকে সৌদি আরবে পাঠানো হয়। কিন্তু সেখানে গিয়ে তিনি যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। পরে ভাগ্য বদলাতে মেয়েকে এক বোনের কাছে রেখে সৌদি আরবে যান সুইটি। তার মেয়ে (৯) স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে।