চট্টগ্রামে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরকে ঘিরে জে এম সেন হলের পূজামণ্ডপ এলাকায় নিরাপত্তা-ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। এর মধ্যেই ইসকনের (ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর কৃষ্ণ কনশাসনেস) একটি অংশ কারাবন্দি চিন্ময়কৃষ্ণ দাসের মুক্তির দাবিতে প্ল্যাকার্ড হাতে বিক্ষোভের পরিকল্পনা করছে বলে গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে।
গোয়েন্দা সূত্রের একাধিক কর্মকর্তার বরাতে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী পূজামণ্ডপের সামনের সারিতে অবস্থান নিয়ে চিন্ময়কৃষ্ণ দাসের মুক্তির দাবিতে প্রতিবাদ জানানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এজন্য শত শত অনুসারীকে জড়ো করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে তথ্য পেয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তবে বিক্ষোভের চূড়ান্ত প্রস্তুতি, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ও কর্মসূচির বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) চট্টগ্রামের রহমতগঞ্জের জে এম সেন হলের দুর্গাপূজামণ্ডপ পরিদর্শন এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। তার সফরকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নিরাপত্তা প্রস্তুতি নিয়েছে।
গোয়েন্দা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চিন্ময়কৃষ্ণ দাসের মুক্তির দাবিকে সামনে রেখে প্রতিবাদ জানানোর পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে প্রধানমন্ত্রীর সফরস্থলে রাজনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত পরিস্থিতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংগঠনের দায়িত্বশীল কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
চিন্ময়কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারী, যিনি চন্দন কুমার ধর নামেও পরিচিত, বাংলাদেশ সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র ছিলেন। তিনি একসময় চট্টগ্রামে ইসকনের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। ২০২৪ সালের ২৫ অক্টোবর চট্টগ্রামের নিউমার্কেট এলাকায় সনাতনী সম্প্রদায়ের একটি সমাবেশকে কেন্দ্র করে জাতীয় পতাকা অবমাননার অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, সমাবেশ চলাকালে স্বাধীনতা স্তম্ভে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার ওপরে গেরুয়া রঙের একটি পতাকা স্থাপন করা হয়েছিল।
এ ঘটনায় চট্টগ্রাম নগরের কোতোয়ালি থানায় ওই বছর ৩১ অক্টোবর রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করেন তৎকালীন বিএনপির চাঁন্দগাঁও মোহরা ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক ফিরোজ খান। মামলায় চিন্ময়কৃষ্ণ দাসসহ ১৯ জনকে আসামি করা হয়। পরে ২৫ নভেম্বর ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ।
ছয় মামলায় আসামি, জামিন চারটিতে
চিন্ময়কৃষ্ণ দাসের বিরুদ্ধে মোট ছয়টি ফৌজদারি মামলার কথা জানিয়েছেন তার আইনজীবী। মামলাগুলোর মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রদ্রোহ, আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফ হত্যা, ভাঙচুর, হামলা এবং সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগ-সংক্রান্ত মামলা।
২০২৪ সালের ২৬ নভেম্বর চট্টগ্রাম আদালতে চিন্ময়কৃষ্ণ দাসের জামিন আবেদন নাকচ হওয়ার পর তার অনুসারীদের বিক্ষোভ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ওই দিন আদালত এলাকার কাছাকাছি আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। পরে তার বাবা জামাল উদ্দিন হত্যা মামলা করেন। তদন্তের একপর্যায়ে ওই মামলাতেও চিন্ময়কৃষ্ণ দাশকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
২০২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি চট্টগ্রামের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল সাইফুল ইসলাম আলিফ হত্যা মামলায় চিন্ময়কৃষ্ণ দাসসহ ৩৯ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন। ছয়টি মামলার মধ্যে চারটিতে তিনি হাইকোর্ট থেকে জামিন পেয়েছেন। তবে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় তার জামিনের আদেশ স্থগিত রয়েছে। অন্যদিকে, আইনজীবী আলিফ হত্যা মামলার বিচার চলমান থাকায় তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পাননি।
অর্থাৎ, চারটি মামলায় জামিন পাওয়ার বিষয়টি তার সার্বিক মুক্তি নিশ্চিত করেনি। রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার জামিন-সংক্রান্ত জটিলতা ও হত্যা মামলার বিচারপ্রক্রিয়া তার কারাবাসের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চট্টগ্রাম সফরকে কেন্দ্র করে জে এম সেন হল ও আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। ২০ অক্টোবর সন্ধ্যায় তার পূজামণ্ডপ পরিদর্শনের কথা রয়েছে। এর আগে সফরস্থল পরিদর্শন করেছেন সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা।চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর সফর ও দুর্গাপূজা উপলক্ষে সমন্বিত নিরাপত্তা-ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।