Image description

দেশে কর্মসংস্থান বাড়ছে, নাকি বাড়ছে চাকরি হারানো মানুষের সংখ্যা। এর নির্ভরযোগ্য উত্তর মিলছে না হালনাগাদ পরিসংখ্যানে। শ্রমবাজারের প্রকৃত অবস্থা জানতে নিয়মিত যে শ্রমশক্তি জরিপ প্রয়োজন, সেটিই এখন অনিশ্চয়তায়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ প্রকাশিত শ্রমশক্তি জরিপ হয়েছে ২০২৪ সালের। এরপর নতুন তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশে অগ্রগতি না হওয়ায় বেকারত্বের বর্তমান চিত্র সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাচ্ছে না।

আজ জাতীয় পরিসংখ্যান দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘নির্ভরযোগ্য ও সহজলভ্য পরিসংখ্যান টেকসই উন্নয়ন ও পরিকল্পনার ভিত্তি’। তবে দেশে শ্রমশক্তি জরিপের ধারাবাহিকতা না থাকায় বেকারত্বের বর্তমান চিত্র সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাচ্ছে না। নতুন তথ্য প্রকাশ না হওয়ায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বেকারত্ব কমাতে সরকারের উদ্যোগের অগ্রগতি মূল্যায়নেও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। বিশেষ করে, দেশের অর্থনীতি যখন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং শিল্পকারখানায় কর্মসংস্থান ধরে রাখার চ্যালেঞ্জের মুখে, তখন শ্রমবাজারের হালনাগাদ তথ্যের প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়েছে। কোন খাতে চাকরির সুযোগ বাড়ছে, কোথায় কর্মী ছাঁটাই হচ্ছে, শিক্ষিত তরুণদের কতজন কর্মহীন থাকছেন এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে নিয়মিত জরিপের বিকল্প নেই।

কিন্তু জরিপে দীর্ঘ বিরতি থাকায় নীতিনির্ধারণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই তথ্যভান্ডারেই ঘাটতি তৈরি হয়েছে। বিবিএস সূত্রে জানা গেছে, শ্রমশক্তি জরিপ পরিচালনার প্রকল্পে অর্থের সংকট দেখা দেওয়ায় তা বন্ধ হয়ে যায়। নতুন করে জরিপ শুরু করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রকল্প প্রস্তুত ও অনুমোদনের প্রক্রিয়াও দীর্ঘায়িত হচ্ছে। ফলে চলতি বছরেও নতুন তথ্য সংগ্রহ শুরু না হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে পরপর দুই বছরের শ্রমবাজারের তথ্যের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। এ বিষয়ে বিবিএসের ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড লেবার উইংয়ের পরিচালক এইচ এম ফিরোজ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, নতুনভাবে শ্রমশক্তি জরিপের প্রকল্প পাস না হওয়ায় জরিপ করা হয়নি। প্রকল্প পাস হলেই নতুন করে দেশের কর্মসংস্থান ও বেকারের সংখ্যা নিয়ে জরিপ শুরু হবে। এদিকে বিবিএসের ২০২৪ সালের শ্রমশক্তি জরিপের চূড়ান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৭ লাখ। এর মধ্যে উচ্চশিক্ষিত বেকারই ছিল ৯ লাখ।

কর্মসংস্থানের লক্ষ্য মূল্যায়নেও বাধা : শ্রমবাজারের হালনাগাদ তথ্য না থাকার বিষয়টি সরকারের কর্মসংস্থান পরিকল্পনার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনি অঙ্গীকার ছিল, সরকারের প্রথম ১৮ মাসে এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। কিন্তু এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের অগ্রগতি পরিমাপ করতে হলে শুরুতে দেশে কর্মসংস্থান ও বেকারত্বের অবস্থা কী ছিল, তার নির্ভরযোগ্য হিসাব প্রয়োজন। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কতটি নতুন চাকরি তৈরি হয়েছে এবং কতজন চাকরি হারিয়েছেন, তারও হিসাব রাখতে হবে। সিপিডির একটি উপস্থাপনায় বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ২৪৫ থেকে ৩৫৩টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। এতে অন্তত এক লাখ শ্রমিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে তৈরি পোশাক খাতে ২০ হাজার শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছেন। তবে বিচ্ছিন্নভাবে কারখানা বন্ধ বা ছাঁটাইয়ের তথ্য দিয়ে দেশের মোট কর্মসংস্থানের পরিবর্তন নির্ধারণ করা যায় না।

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বেকারত্বের প্রকৃত চিত্র জানতে নিয়মিত শ্রমশক্তি জরিপ পরিচালনা করা অত্যন্ত জরুরি। হালনাগাদ তথ্য না থাকলে শ্রমবাজারে কী ধরনের পরিবর্তন হচ্ছে, কোন খাতে কর্মসংস্থান বাড়ছে বা কমছে, তা নির্ভরযোগ্যভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। তিনি আরও বলেন, সরকার এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, তার অগ্রগতি পরিমাপের জন্যও নির্ভরযোগ্য তথ্যভান্ডার প্রয়োজন। শুধু কতজনের কর্মসংস্থান হয়েছে, তা জানলেই হবে না। কতজন কর্মসংস্থান হারিয়েছেন, নতুন কর্মসংস্থানের মান কেমন এবং শিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থানের পরিস্থিতি কী-সেসব বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হবে। তাই নিয়মিত শ্রমশক্তি জরিপ পরিচালনা এবং সময়মতো এর ফল প্রকাশের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

শিক্ষিত বেকারত্বের চাপ : দেশে শিক্ষিত বেকারত্বের পরিস্থিতিও শ্রমবাজারের তথ্যের গুরুত্ব তুলে ধরে। ২০২৪ সালের শ্রমশক্তি জরিপে বেকার হিসেবে গণনা করা ২৬ লাখ ২৪ হাজার। যার মধ্যে প্রায় ৯ লাখ ছিলেন স্নাতক ডিগ্রিধারী। শিক্ষাগত যোগ্যতার ভিত্তিতে স্নাতকদের বেকারত্বের হার ছিল সর্বোচ্চ। দীর্ঘ সময় ধরে চাকরি না পাওয়ায় তাঁদের কর্মজীবনের শুরুতেই পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

জরিপের তথ্য অনুযায়ী, চাকরি খুঁজতে থাকা স্নাতকদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে দীর্ঘ সময় বেকার থাকতে হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাঁদের প্রতি তিনজনের একজন দুই বছর পর্যন্ত কর্মহীন ছিলেন। দীর্ঘদিন কাজ না পেলে শুধু আয় থেকে বঞ্চিত হওয়াই নয়, কর্মক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা অর্জন, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যতে ভালো বেতনের চাকরি পাওয়ার সুযোগও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হলে কোন ধরনের দক্ষতার চাহিদা রয়েছে, কোন খাতে নতুন চাকরি তৈরি হচ্ছে এবং শিক্ষিত চাকরিপ্রার্থীদের কতজন দীর্ঘদিন কর্মহীন থাকছেন, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। শ্রমশক্তি জরিপের ধারাবাহিকতা না থাকলে এসব বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের কাছে সময়োপযোগী তথ্য থাকবে না।