Image description

বিচার চাইতে আদালতের দ্বারস্থ হলেও মামলাজটে নাকাল হচ্ছে মানুষ। আদালতে বছরের পর বছর ধরে ঝুলে থাকছে লাখ লাখ মামলা। সাক্ষী হাজির করা, শুনানির তারিখ পাওয়া, বারবার আদালতে যাতায়াত-সব মিলিয়ে ন্যায়বিচারের অপেক্ষা অনেকের কাছে হয়ে উঠেছে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল।

একদিকে নতুন মামলার ¯্রােত, অন্যদিকে নিষ্পত্তির ধীরগতি-দুইয়ের চাপে বাড়ছে মামলাজট। বিচারাধীন মামলার সংখ্যা এখন সাড়ে ৪৮ লাখের কাছাকাছি। গত ছয় মাসে বেড়েছে ১ লাখ ১২ হাজারের বেশি। মামলা দ্রুত নিষ্পত্তিতে বিচারক নিয়োগ, নতুন আদালত প্রতিষ্ঠা ও বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির মতো নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও সামগ্রিক মামলাজট কমানো যাচ্ছে না।

সুপ্রিম কোর্টের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত দেশের আদালতগুলোতে মোট বিচারাধীন মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৮ লাখ ৫৫ হাজার ২৪৪টি। এর মধ্যে অধস্তন আদালতে ৪১ লাখ ৪২ হাজার ৭৭টি, হাইকোর্ট বিভাগে ৬ লাখ ৭৪ হাজার ৫১৬টি এবং আপিল বিভাগে ৩৮ হাজার ৬৫১টি মামলা বিচারাধীন। বছরের শুরুতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ছিল ৪৭ লাখ ৪২ হাজার ৭৩১টি। এর মধ্যে অধস্তন আদালতে ৪০ লাখ ৪১ হাজার ৯২৪টি, হাইকোর্ট বিভাগে ৬ লাখ ৫৯ হাজার ২৫৬টি এবং আপিল বিভাগে ৪১ হাজার ৫৫১টি মামলা ছিল। সে হিসাবে ছয় মাসে বিচারাধীন মামলা বেড়েছে ১ লাখ ১২ হাজার ৫১৩টি। আইনজ্ঞদের মতে, যে হারে মামলা দায়ের হচ্ছে, সে হারে নিষ্পত্তি না হওয়ায় মামলাজট বাড়ছে। আদালতের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপের পাশাপাশি বিচারক, এজলাস, সহায়ক জনবল ও অবকাঠামোর ঘাটতিও দ্রুত বিচার নিশ্চিতের পথে বাধা। এর সঙ্গে উচ্চ আদালতের দীর্ঘ অবকাশকালীন ছুটিও মামলা নিষ্পত্তির গতিতে প্রভাব ফেলছে।

অধস্তন আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। ফলে এসব আদালতে নিষ্পত্তির গতি না বাড়লে সামগ্রিক মামলাজট কমানো কঠিন। জমিজমা ও সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ, ফৌজদারি অপরাধ, পারিবারিক বিরোধসহ নানা ধরনের মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকছে। সাক্ষীর অনুপস্থিতি, সমন জারিতে বিলম্ব, বারবার সময় প্রার্থনা এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহে দীর্ঘসূত্রতা বিচারপ্রক্রিয়াকে আরও দীর্ঘ করছে। আইনজীবীদের মতে, শুধু বিচারক নিয়োগ করলেই এ সংকটের সমাধান হবে না। নতুন মামলা দায়েরের প্রবণতা, ভিত্তিহীন মামলা এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা সব ক্ষেত্রেই কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

কাজে আসছে না উদ্যোগ : মামলাজট কমাতে বিচারকের সংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। গত ৭ জুলাই জাতীয় সংসদে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জানান, বিচারাধীন মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি ও বিচার বিভাগের সক্ষমতা বাড়াতে ৫৩৬টি বিচারকের পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। পাশাপাশি ১৫০ জন সিভিল জজ নিয়োগের কার্যক্রম চলছে। আদালতের সহায়ক কর্মচারী নিয়োগের উদ্যোগও অব্যাহত রয়েছে। এ ছাড়া বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বা মধ্যস্থতার মাধ্যমে আদালতের বাইরে বিরোধ মীমাংসার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের আশা, এ পদ্ধতি কার্যকর হলে বিচারপ্রার্থীদের সময় ও অর্থ সাশ্রয়ের পাশাপাশি আদালতের ওপর চাপ কমবে। তবে নতুন মামলা দায়েরের হার এবং নিষ্পত্তির মধ্যে ভারসাম্য না এলে মামলাজট কমানো কঠিন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ আদালত যত মামলা নিষ্পত্তি করছেন, তার চেয়ে বেশি মামলা যুক্ত হলে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা বাড়তেই থাকবে।

মামলাজটের সবচেয়ে বড় চাপ বহন করছেন বিচারপ্রার্থীরা। একটি মামলা চালাতে আইনজীবীর ফি, যাতায়াত, নথিপত্র সংগ্রহসহ নানা খরচ বহন করতে হয়। শুনানির তারিখ পিছিয়ে গেলে বাড়ে ব্যয়। দূরদূরান্ত থেকে আদালতে আসা মানুষের কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, তৈরি হয় আর্থিক চাপ। দীর্ঘদিন মামলা ঝুলে থাকায় সম্পত্তির ব্যবহার, অর্থনৈতিক লেনদেন ও পারিবারিক সম্পর্কও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে। দেওয়ানি মামলায় জমি বা সম্পত্তির বিরোধ নিষ্পত্তির অপেক্ষা চলে বছরের পর বছর। আবার ফৌজদারি মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণ ও বিচার শেষ হতে দেরি হলে বাদী ও আসামি উভয় পক্ষকেই দীর্ঘ অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এতে বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতি মানুষের আস্থাও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।

উচ্চ আদালতের দীর্ঘ অবকাশ কমাতে হবে : এ বিষয়ে জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, উচ্চ আদালতে মামলার চাপ বাড়ার অন্যতম কারণ দীর্ঘ অবকাশকালীন ছুটি। এই দীর্ঘ অবকাশের কারণে বিচারব্যবস্থায় ধীরগতি আসছে, মামলা নিষ্পত্তি হচ্ছে না। তাঁর অভিজ্ঞতা সুখকর নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক থাকার সময়ও ছুটি কমানোর দাবি তুলেছিলেন।

তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় সময় এসেছে এটা পুনর্বিবেচনা করার। এই দীর্ঘ ছুটি বিচারব্যবস্থার গতি আনার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। ন্যায়বিচার প্রাপ্তির ক্ষেত্রেও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। আমি প্রত্যাশা করব, প্রধান বিচারপতি বিষয়টি বিবেচনা করবেন।’

বিচারকস্বল্পতা দূর করতে হবে : মামলাজটের বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এস এম শাহজাহান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমার বলতে দ্বিধা নেই, জেলখানা থেকে আমার মক্কেল আমাকে বলেছে, “আমি খালাস হলে আমার খালাসের কাগজটা কবরে ঝুলিয়ে রাইখেন।”’ তিনি বলেন, ইচ্ছা করলেও অনেক সময় একটি মামলার শুনানি করা যাচ্ছে না। রাষ্ট্রপক্ষের সদিচ্ছা আছে, আদালতের সদিচ্ছা আছে, আইনজীবীরাও মামলা শুনানির জন্য প্রস্তুত। কিন্তু বিচারকস্বল্পতার কারণে শুনানি করা সম্ভব হচ্ছে না। এ সমস্যার দ্রুত সমাধান প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।