Image description

গণ অভ্যুত্থানের আগে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের নামে দখল করা হয়েছিল ১৭ তলাবিশিষ্ট মিরপুর সিটি সেন্টার ভবন। কিন্তু সময় পাল্টেছে। আওয়ামী লীগের দম্ভচূর্ণ পতনের পর তাদের ক্যাডার বাহিনী ও সন্ত্রাসীরা অনেকেই জেলে। কেউ পলাতক, কেউ ফেরারি। এরপরও মিরপুর সিটি সেন্টার ভবন এখনো একই চক্রের কবজায় রয়েছে। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তিল তিল করে গড়ে তোলা ১৭ তলা কমার্শিয়াল ভবনটির নির্মাণ প্রতিষ্ঠান এজি প্রপার্টিজ ডেভেলপমেন্টস লিমিটেড এখনো ঘুরছে প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, এ ভবনের বিপরীতে ব্যাংক থেকে প্রায় দেড় শ কোটি টাকা ঋণ রয়েছে তাদের। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, মিরপুর-১ নম্বরে ৩০ কাঠা জমির ওপর নির্মাণ করা হয় মিরপুর সিটি সেন্টার। তিনটি বেইজমেন্টসহ ১৭ তলা এই কমার্শিয়াল ভবনের মালিক হায়দার আলী খান বহুলুলসহ চারজন। অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে তাদের সঙ্গে চুক্তি করে এজি প্রপার্টিজ লিমিটেড।

রাজউকের অনুমোদন পাওয়ার পর ২০১৩ সালে ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। কাজ শুরুর পর প্রতিষ্ঠানটি জানতে পারে, জমির মালিকরা অস্ট্রেলিয়ান অ্যাসেট ডেভেলপমেন্ট নামে একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেছেন। যা এজি প্রপার্টিজের সঙ্গে চুক্তির সময়ও জানানো হয়নি। অনুসন্ধানে উঠে আসে, মালিকপক্ষ একে একে মোট তিনটি পক্ষের সঙ্গে গোপনে চুক্তি করে। শুধু তাই নয়, জমি নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের মামলা থাকায় এবং আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণে নির্মাণকাজও যথাসময়ে করতে পারেনি ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান। এতে আর্থিকভাবে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয় এজি প্রপার্টিজ। 

প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, ২০২০-২১ সালে করোনা মহামারির মধ্যেও নির্মাণকাজ অব্যাহত রাখা হয়। তিনটি বেইজমেন্টসহ ১৭ তলা ভবনের নির্মাণকাজ এগিয়ে নেয় তারা। ভবনের কাজ দ্রুত শেষ করতে দুটি ব্যাংক থেকে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা ঋণ নেয় তারা। ২০২১ সালে ভবনের নির্মাণকাজ যখন প্রায় ৯৫ শতাংশ শেষ, তখনই এ বাণিজ্যিক ভবন দখল করতে মরিয়া হয়ে ওঠেন হায়দার আলী খান বহুলুল, শওকত আলী খান বিপুলসহ ভবনের চারজন ভূমি মালিক। ওই জায়গায় দখলদারিত্বের জন্য আওয়ামী লীগের একটি কার্যালয় করা হয়। 

অভিযোগ রয়েছে, ওই সময়ে জমির ওই মালিকরা নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের একটি সশস্ত্র গ্রুপ নিয়ে এজি প্রপার্টিজের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও প্রকৌশলীদের মারধর করে ভবন থেকে বের করে দেন। হায়দার আলী খানের ক্ষমতার উৎস হিসেবে সামনে আসে তার শ্বশুর মনির চৌধুরীর নাম। তিনি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মাদারীপুর জেলার সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি ও মাদারীপুর জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান। জানা গেছে, মনির চৌধুরীর আপন চাচাতো ভাই আওয়ামী লীগের সাবেক চিফ হুইপ নূরে আলম লিটন চৌধুরী ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে এজি প্রপার্টিজের আমমোক্তারনামা বাতিল করান। এ ক্ষেত্রে মিরপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সাব-রেজিস্ট্রার নুরুল আমিনেরও যোগসাজশ ছিল।

এখানেই শেষ নয়। ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানটির অভিযোগ, ভবন থেকে বের করে দেওয়ার পর তাদের কাছে ৫ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। পরিস্থিতির কারণে নিরুপায় হয়ে ১ কোটি ২৪ লাখ টাকা পরিশোধও করে এজি প্রপার্টিজ। আমমোক্তারনামা বাতিলের পর ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যে চুক্তি রয়েছে তারও পরোয়া করছেন না ভূমি মালিকরা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ক্ষমতার পালাবদল হলেও এখনো মাফিয়া কায়দায় প্রভাব বিস্তার অব্যাহত রয়েছে। ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জমিদাতাদের এমন কর্মকান্ডকে নজিরবিহীন বলছেন অনেকেই।

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, ভবনে ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের অংশে যাদের ভাড়া দেওয়া হয়েছে তাদের কাছ থেকে জোরপূর্বক ভাড়া আদায়ের চেষ্টা করছে ভূমি মালিকদের অংশ। এমন ঘটনা বেআইনি বলছেন আইনজ্ঞরাও। ব্যাংকের ঋণের টাকায় বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান যেমন চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে তেমনি ভবনটিতে যারা দোকান বা স্পেস কিনেছেন তারাও বিপাকে। ভুক্তভোগীরাসহ ডেভেলপার কর্তৃপক্ষ এ ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী এবং প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।