Image description

প্রকৃতির ক্ষতি না করে স্থানীয় উপকরণ ব্যবহারের মাধ্যমে পাহাড় ও বন এলাকায় পর্যটকদের জন্য পরিবেশবান্ধব আবাসন নির্মাণে এক দশক ধরে উৎসাহিত করা হচ্ছে। এ সুযোগে কক্সবাজারে অসংখ্য ইকো রিসোর্ট গড়ে উঠেছে। কিন্তু ইকো রিসোর্ট নামধারী এসব স্থাপনার বেশির ভাগই অনুমোদনহীন। নেই অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত পানির উৎস ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। অনুমোদনহীন এ রকম শত শত  রিসোর্টই পর্যটকদের জন্য মৃত্যুকূপে পরিণত হয়েছে। কক্সবাজারের উখিয়ার টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের প্রাণহানির পর বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনুমোদনহীন এসব রিসোর্টের কারণে লাখো পর্যটক এখন ঝুঁকিতে।

ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ এসইউপি জানান, টুপটুপ রিসোর্টের তিন তলা কাঠের স্থাপনা ছিল। নিচতলায় রেস্তোরাঁ, অন্য দুই তলায় আবাসন। রিসোর্টটি তৈরিতে ব্যবহৃত উপকরণ অতি দাহ্য। রিসোর্টটি সংস্থাটির অনুমতি ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছিল। রিসোর্টটিকে ঝুঁকিপূর্ণ উল্লেখ করে গত জুনে সতর্ক করে নোটিস দেওয়া হলেও তাঁরা কার্যক্রম চালু রাখেন। জাতিসংঘের পর্যটনবিষয়ক সংস্থার (ইউএন ট্যুরিজম) তথ্য বলছে, পরিবেশ-প্রতিবেশ রক্ষা, জীববৈচিত্র্যের সুরক্ষা, পাহাড়-বনাঞ্চল-হাওড়সহ পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকার বাস্তুতন্ত্র ঠিক রেখে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে পর্যটনে সম্পৃক্ত করে পর্যটকদের ভ্রমণের পরিবেশ তৈরি করতে বিশ্বব্যাপী ইকো ট্যুরিজম ধারণার প্রচলন শুরু হয়। 

সেই ধারণা থেকে ইট, বালু, রড, সিমেন্টের বদলে ছন, কাঠ, বাঁশের মতো স্থানীয় উপকরণ ব্যবহার করে ইকো রিসোর্ট গড়া তোলা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, বাংলাদেশেও গত এক দশকে অসংখ্য ইকো রিসোর্ট গড়ে উঠেছে। সাম্প্রতিককালে কক্সবাজারেও বেশ কিছু ইকো রিসোর্ট গড়ে উঠেছে; যার বেশির ভাগেরই জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিসসহ যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেই। ঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করলেও রিসোর্ট মালিকরা তোয়াক্কা করেন না। মূলত এসব রিসোর্টেই দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির মতো ঘটনা ঘটছে। স্থাপত্য ও নির্মাণ শিল্পবিষয়ক অনলাইন পোর্টাল আর্ক বাংলা ডটকমের প্রতিষ্ঠাতা স্থপতি মুহাইমিন শাহরিয়ার এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘ইকো রিসোর্ট নির্মাণে যে দক্ষতা, সতর্কতা ও স্থাপত্য প্রযুক্তি প্রয়োগের প্রয়োজন সেসবের অনেক কিছুই আমলে না নিয়ে অপরিকল্পিতভাবে স্থাপনাগুলো নির্মিত হচ্ছে। 

এসব রিসোর্টে বৈদ্যুতিক তারগুলো উন্মুক্তভাবেই কাঠ, বাঁশ ছনের মতো অগ্নিসংবেদনশীল সামগ্রীর সঙ্গে ক্লিপিং করা হচ্ছে। এতে মুহূর্তেই আগুন ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা থাকে। এ ছাড়া এসব রিসোর্টে অগ্নিশনাক্তকরণ ও সুরক্ষাব্যবস্থাও দুর্বল।’ তিনি বলেন, ‘যেকোনো ইকো রিসোর্ট, বিশেষ করে পার্বত্য অঞ্চলের ইকো রিসোর্টে আগুন থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করতে টেকসই প্রযুক্তি ও পরিবেশবান্ধব নকশার সমন্বয়ের প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে প্রথমেই নজর দিতে হবে নির্মাণসামগ্রীর বিষয়ে। আগুন প্রতিরোধের জন্য বিশেষভাবে প্রক্রিয়াজাত কাঠ বা বাঁশ এসব রিসোর্ট নির্মাণে ব্যবহার করা উচিত। কাঠ, বাঁশ, বেড়ার দেয়ালগুলোর মধ্যে নিরোধক বা ইনসুলেশন ব্যবহার করলে শব্দ ও আগুন দুটোরই নিয়ন্ত্রিত পরিবহন নিশ্চিত করা যাবে। 

মাটি দিয়ে তৈরি দেয়াল ব্যবহার করলেও পরিবেশবান্ধব বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি অগ্নিনিরোধী পরিবেশ দেওয়া সম্ভব।’ কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী বলেন, ‘তিন মাসব্যাপী বিচ কার্নিভালের আগ মুহূর্তে এ ধরনের ঘটনা পর্যটন শিল্পের জন্য শুভলক্ষণ নয়।’ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করে পর্যটন শিল্পকে এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বেশির ভাগ ইকো রিসোর্টে বর্জ্য ও পানি ব্যবস্থাপনাও ঠিক থাকে না। বাস্তুসংস্থান ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায়ও উদ্যোগ নেওয়া হয় না। বরং উল্টো পাহাড় ও গাছ কেটে এসব অনুমোদনহীন রিসোর্ট নির্মাণ করা হয়। ফলে এসব রিসোর্ট স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রে বিপর্যয় ডেকে আনছে। 

এ ছাড়া রিসোর্ট নির্মাণে যে ধরনের স্থাপত্য প্রযুক্তি প্রয়োজন সেগুলো না মানায় এবং ব্যবহৃত উপকরণের মান নিয়ন্ত্রণের বালাই না থাকায় নামেই কেবল এসব রিসোর্টকে ‘ইকো’ বলা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ, ইনানী ও সেন্ট মার্টিন এলাকায় ইকো-ট্যুরিজমের নামে প্রচুর রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁ গড়ে উঠেছে সম্পূর্ণ কাঠ, বাঁশ ও ছনের মতো দ্রুত দাহ্য পদার্থ দিয়ে। ফায়ার সার্ভিসের বিধি না মেনে এগুলো গড়ে ওঠায় নিরাপত্তাঝুঁকি ছিল। বিষয়টি নিয়ে ফায়ার সার্ভিস নোটিস দিলেও তাঁরা কর্ণপাত করেননি বলে অভিযোগ উঠেছে।

কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মোহাম্মদ মোরশেদ জানান, অধিকাংশ হোটেল-রিসোর্টে মানসম্মত বৈদ্যুতিক ওয়্যারিংয়ের অভাব রয়েছে। শহরের মূল কেন্দ্র থেকে দূরবর্তী পর্যটন স্পটগুলোয় তাৎক্ষণিক ফায়ার সার্ভিসের সেবা পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। কাঠ ও বাঁশের রিসোর্টগুলোয় নিজস্ব আধুনিক অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম কিংবা জরুরি বহির্গমন পথ নিশ্চিত করা জরুরি। তিন মাস আগেই ঝুঁকিপূর্ণ চিহ্নিত করে এ ধরনের রিসোর্টকে সতর্কবার্তা ও নোটিস দিয়েছিল ফায়ার সার্ভিস। এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং ফায়ার সার্ভিসকে কক্সবাজারের সব হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টের সার্বিক নিরাপত্তা এবং অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা জরুরি ভিত্তিতে পরিদর্শন ও তদন্ত করার জোরালো দাবি জানানো হচ্ছে; যাতে ভবিষ্যতে পর্যটকদের এমন জীবনহানির মুখে পড়তে না হয়।