Image description

ডেনমার্কের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স করছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অরুণ বিশ্বাস। তিনি বলেন, এখানে ‘ওপেন বুক এক্সাম হয়। বুক বলা হলেও আধুনিক সব কম্পিউটারে প্রশ্ন দেয়া হয়। এরপর কম্পিউটারেই লিখে সাবমিট করতে হয়। কম্পিউটারে পেইড এআইসহ সব ধরনের ব্যবস্থা থাকে। এখানে এআই কীভাবে ব্যবহার করতে হয় তা শেখানো হয়, উদ্বুদ্ধ করা হয়। তিনি আরও বলেন, পরীক্ষা শেষে মার্কিংয়ের কাজেও এআই’র সহযোগিতা নেন শিক্ষকরা। ক্লাসেও এআই ব্যবহার করেন।

মালয়েশিয়ায় অধ্যয়নরত আরেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী সাজিদ আরাফাতও পরীক্ষার বিষয়ে একই তথ্য দেন। তিনি আরও বলেন, এআইকে পড়াশোনা ও সমস্যা সমাধানের সহায়ক হিসেবেও ব্যবহার করা হয়। তারা এভাবেও মূল্যায়ন করেন, এআই ব্যবহার করি আর বই- আমি কতোটা তথ্য দিতে পারছি। নতুন টার্ম লিখছি কিনা। পাশাপাশি নিজের মতামতকে কতোটা উপস্থাপন করছি। ক্লাসে অনেক সময় শিক্ষকরা সরাসরি বলেন- সার্চ অন চ্যাটজিপিটি।

কিন্তু ভিন্ন চিত্র বাংলাদেশে। শিক্ষার্থীরা এআই ব্যবহার করেন গোপনীয়তার সঙ্গে। এমনভাবে ব্যবহার করেন যাতে দেখে না বোঝা যায়। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী পাভেল চৌধুরী বলেন, অ্যাসাইনমেন্টের জন্য এআই ব্যবহার করি। তবে সরাসরি এআইয়ের লেখা জমা দেই না। উত্তরটা নিজের মতো করে লিখি, ভাষা পরিবর্তন করি, কোথাও কোথাও নিজের তথ্য ও বিশ্লেষণ যোগ করি। কারণ, শিক্ষক বুঝতে পারলে সমস্যা হতে পারে। এআই ব্যবহার করাটাকে শিক্ষকরা কীভাবে দেখবেন, সেটা নিয়ে এক ধরনের ভয় কাজ করে।

ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী রিফাত ইসলাম বলেন, এআই আমাদের অনেক সময় বাঁচায়। কোনো বিষয় বুঝতে সমস্যা হলে, প্রেজেন্টেশনের ধারণা পেতে কিংবা অ্যাসাইনমেন্টের কাঠামো তৈরি করতে এআই ব্যবহার করি। কিন্তু ক্লাসে বা শিক্ষকের সামনে এটা নিয়ে খুব একটা কথা বলি না। কারণ, এআই ব্যবহার করেছি জানলে শিক্ষক ভাবতে পারেন, কাজটা নিজে করিনি। তাই এআইয়ের উত্তর যাচাই করে নিজের মতো করে সাজিয়ে নিই। বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন কাজে এআই ব্যবহার করা যাবে, আর কোনটা অনৈতিক- এ বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা থাকলে আমাদের জন্য সুবিধা হতো।

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা চলাকালে দুই শিক্ষার্থী এআই ব্যবহার করে নকলের চেষ্টা করেন। তারা পরীক্ষার হলে এআই দিয়ে উত্তর খুঁজছিলেন। দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক তাদের ফোন পরীক্ষা করে জেমিনিতে প্রশ্নের উত্তর খোঁজার প্রমাণ পান, লেখাতেও তা পান। গত জুনে ঘটে যাওয়া এসব ঘটনায় শাস্তি দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সংশ্লিষ্ট পরীক্ষা বাতিল এবং পরবর্তী পরীক্ষায় অংশগ্রহণে নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্ত হয়। পরীক্ষায় নকল অপরাধ, তবে এআই ব্যবহারে কোনটা অপরাধ কোনটা না তা স্পষ্টকরণটা জরুরি।

২০২৫ সালে ইনস্টিটিউট অব ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ার্সের (আইইইই) আন্তর্জাতিক সম্মেলনে উপস্থাপিত এক গবেষণায় বাংলাদেশের ৩১টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ হাজার ৩৭০ শিক্ষার্থীর এআই ব্যবহারের চিত্র বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, ৪৬.৩ শতাংশ শিক্ষার্থী প্রতিদিন এবং ৪৭.১ শতাংশ সপ্তাহে অন্তত একবার এআই ব্যবহার করেন। মাসে অন্তত একবার ব্যবহার করেন ৫.৭ শতাংশ; কখনো ব্যবহার করেননি মাত্র ০.৯ শতাংশ। জটিল একাডেমিক সমস্যা সমাধান ও অ্যাসাইনমেন্ট তৈরিতে এআইয়ের সহায়তা নেন ৮৯ শতাংশ, দলগত পড়াশোনায় ব্যবহার করেন ৭১.২ শতাংশ। আবার ৮৯.৪ শতাংশ মনে করেন, এআই তাদের নিজস্ব গতিতে শিখতে সহায়তা করে। তবে ৮০.১ শতাংশ শিক্ষার্থী সৃজনশীলতা ও সমালোচনামূলক চিন্তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন। ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে ৫৭.৯ শতাংশ সরাসরি এবং ২৯.৮ শতাংশ কিছুটা উদ্বেগ জানিয়েছেন।

২০২৫ সালে প্রকাশিত ‘এফ-১০০০’র এক গবেষণায় বাংলাদেশের আটটি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৪০ শিক্ষার্থী ও ৪০২ শিক্ষকের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, শিক্ষার্থীরা জটিল বিষয় বোঝা, অ্যাসাইনমেন্ট, গবেষণার ধারণা ও উপস্থাপনা তৈরিতে এবং শিক্ষকরা পাঠ পরিকল্পনা, শিক্ষাসামগ্রী ও গবেষণায় এআই ব্যবহার করছেন। তবে নির্ভুলতা, নৈতিকতা ও অতিরিক্ত নির্ভরতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত গবেষণায় ১ হাজার ২৫৩ প্রাথমিক শিক্ষকের মধ্যে ৭৭.৫৫ শতাংশ পরীক্ষার প্রশ্ন, ৭৬.৯৭ শতাংশ পাঠ পরিকল্পনা এবং ৭৬.৮৯ শতাংশ শিক্ষাসামগ্রী তৈরিতে এআই ব্যবহারে আগ্রহী বলে জানান।

আন্তর্জাতিক চিত্রেও শিক্ষার্থীদের এআই ব্যবহারের ব্যাপকতা স্পষ্ট। যুক্তরাজ্যের উচ্চশিক্ষা বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান হায়ার এডুকেশন পলিসি ইনস্টিটিউটের (হেপি) ২০২৫ সালের জরিপে ৯২ শতাংশ স্নাতক শিক্ষার্থী এআই ব্যবহারের কথা জানান। এর ৮৮ শতাংশ ব্যবহার করেন মূল্যায়ন বা অ্যাসাইনমেন্টে। ২০২৬ সালের জরিপে এ হার বেড়ে দাঁড়ায় যথাক্রমে ৯৫ ও ৯৪ শতাংশে। ডিজিটাল এডুকেশন কাউন্সিলের ২০২৪ সালের আন্তর্জাতিক জরিপে ১৬ দেশের ৩ হাজার ৮৩৯ শিক্ষার্থীর ৮৬ শতাংশ পড়াশোনায় এআই ব্যবহারের কথা জানান। তাদের ৫৪ শতাংশ সপ্তাহে অন্তত একবার এবং ২৪ শতাংশ প্রতিদিন এআই ব্যবহার করেন।

ওইসিডি’র ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে সিঙ্গাপুর ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রায় ৭৫ শতাংশ শিক্ষকের এআই ব্যবহারের তথ্য উঠে আসে। এআই ব্যবহারকারী শিক্ষকদের ৬৮ শতাংশ বিষয় সম্পর্কে জানতে বা সারসংক্ষেপ তৈরি করতে এবং ৬৪ শতাংশ পাঠ পরিকল্পনা ও শ্রেণিকক্ষের কার্যক্রমে প্রযুক্তিটি ব্যবহার করেন। ওইসিডি’র ডিজিটাল এডুকেশন আউটলুক ২০২৬-এ উদ্ধৃত জার্মানির জরিপে ২৩ হাজারের বেশি উচ্চ শিক্ষার্থীর ৯৪ শতাংশ এআই ব্যবহারের কথা জানান; ৬৫ শতাংশ ব্যবহার করেন দৈনিক বা সাপ্তাহিক ভিত্তিতে। ফ্রান্সে উচ্চ শিক্ষার্থীদের মধ্যে এআই ব্যবহারের হার ২০২৩ সালের ৫৫ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালে ৮২ শতাংশে পৌঁছায়।

স্কুল পর্যায়ে এআই ব্যবহারের ইতিবাচক দিক তুলে ধরে ২০২৫ সালে ‘রিসার্চ অ্যান্ড প্র্যাকটিস ইন টেকনোলজি এনহ্যান্সড লার্নিং’ সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণা পর্যালোচনায় বলা হয়, এআই শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় আগ্রহ ও অংশগ্রহণ বাড়াতে পারে। শিক্ষার্থীদের শেখার আত্মবিশ্বাস বাড়ে। যেসব শিক্ষার্থী তুলনামূলক কম অ্যাকটিভ তাদের অ্যাকটিভনেস বাড়িয়ে দেয় এআই।
এআই ব্যবহারের ঝুঁকিও রয়েছে। চীনের ২৭ হাজার স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীর ওপর ২০২৬ সালের জুনে প্রকাশিত ‘প্রিপ্রিন্ট’ গবেষণায় দেখা যায়, এআই ব্যবহারে বাড়ির কাজের নম্বর ১৮ শতাংশ বাড়লেও পরীক্ষায় ব্যবহারকারীরা অন্যদের তুলনায় ২০ শতাংশ কম নম্বর পেয়েছেন। গবেষকদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দ্রুত উত্তর নিয়ে কাজ শেষ করলে শেখার গভীরতা কমতে পারে। বিপরীতে, বিষয় বোঝা ও কঠিন সমস্যা সমাধানে এআই ব্যবহার করলে নেতিবাচক প্রভাব তুলনামূলক কম হতে পারে। এ ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্কুল পর্যায়ে এআই ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা আনা হয়েছে।

‘রিসার্চ অ্যান্ড প্র্যাকটিস ইন টেকনোলজি এনহ্যান্সড লার্নিং’ প্রকাশিত গবেষণাটিতে আরও বলা হয়, এআইয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, উদ্বেগ, মানসিক চাপ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা নিয়ে ঝুঁকির বিষয় উঠে এসেছে। অন্যদিকে, ২০২৫ সালে ‘কম্পিউটার্স অ্যান্ড এডুকেশন’ সাময়িকীতে প্রকাশিত ইংল্যান্ডের ১৪-১৫ বছর বয়সী ৪০৫ শিক্ষার্থীর ওপর পরিচালিত একটি নিয়ন্ত্রিত গবেষণায় দেখা যায়, শুধু ভাষাভিত্তিক এআই ব্যবহারের তুলনায় নোট নেয়ার পদ্ধতি পাঠ্যাংশ বোঝা ও মনে রাখার ক্ষেত্রে ভালো ফল দিতে পারে। গবেষণাটি ইঙ্গিত করে, এআই দ্রুত তথ্য বুঝতে সহায়তা করলেও এর ওপর নির্ভর করে নিজে চিন্তা করা ও অনুশীলন কমিয়ে দিলে দীর্ঘমেয়াদি শেখা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ফাহমিদা আক্তার ক্যালকুলেটর আবিষ্কারের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, সে সময় ধরে নেয়া হয়েছিল ক্যালকুলেটর ব্যবহার করলে শিক্ষার্থীদের বিকাশ নষ্ট হবে। কিন্তু পরবর্তীতে এটা ভুল প্রমাণ হয়। এভাবে নতুন প্রযুক্তিকে গ্রহণের সময় কিছু নেতিবাচক দিক থাকেই। এগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে শিক্ষার্থীরা আরও বেশি লাভবান হবে। শিশুদের বিকাশের মুহূর্তে এআই’কে যুক্ত করতে পারলে প্যারালালি তারা এটাকে সঙ্গ করেই চিন্তা করতে শিখবে। তবে এটার ব্যবহার যেহেতু ডিভাইস নির্ভর সেহেতু স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণ এবং এআই ব্যবহারের নামে পড়াশোনাই করছে কিনা তা খেয়াল রাখাটা জরুরি।

বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ বলেন, সমতাভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার রূপান্তরমূলক ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ লক্ষ্যেই উচ্চশিক্ষায় এআই ব্যবহারের জন্য একটি সুদূরপ্রসারী জাতীয় নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে। যা শিক্ষা, গবেষণা ও প্রশাসনে প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ও নৈতিক ব্যবহার নিশ্চিত করবে। কোন ধরনের কাজ বা গবেষণায় এআই ব্যবহার করা যাবে, কোথায় যাবে না এবং ঠিক কতোটুকু ব্যবহার করা যাবে তা নীতিমালায় স্পষ্ট উল্লেখ থাকবে।