Image description

গণহত্যাকারী দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার দ্রুত সম্পন্ন করার দাবি দেশজুড়ে তীব্রতর হলেও তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা সংশয়। একদিকে দল ও ব্যক্তির বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্ত চলমান থাকার কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে তদন্তের মন্থর গতি, আলামত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা এবং জামিনে মুক্ত হওয়া নেতাদের বিভিন্ন হুমকির ঘটনা সামগ্রিক বিচার প্রক্রিয়া ঘিরে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের জন এফ কেনেডি বিমানবন্দরে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে হেনস্তা চেষ্টার ঘটনার পর জুলাই গণঅভ্যুত্থানে গণহত্যায় অভিযুক্ত আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক দল হিসেবে দ্রুত ও কঠোর বিচারের আওতায় আনার দাবি আরো তীব্র হয়ে উঠেছে।

কাতার এয়ারওয়েজের ফ্লাইটে গত সোমবার দোহা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছান শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বিমানবন্দরের ৮ নম্বর টার্মিনাল দিয়ে হুইলচেয়ারে করে বের হওয়ার সময় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রবাসী কয়েকজন নেতা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি করেন। পরে নিরাপত্তারক্ষী ও সহযোগীদের তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপে ড. ইউনূসকে দ্রুত ও নিরাপদে বিমানবন্দরের ভেতরের দিকে সরিয়ে নেওয়া হয়।

জন এফ কেনেডি বিমানবন্দরে আওয়ামী লীগ কর্মীদের অপকর্মে ক্ষোভ প্রকাশ করেন রাজনীতিবিদরা। বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও সংসদ সদস্য নাহিদ ইসলাম তার ভেরিফায়েড ফেসবুকে লেখেন, ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে হেনস্তার চেষ্টা আবারও আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসনির্ভর রাজনীতির নির্মম, সহিংস ও অমানবিক চরিত্রকে উন্মোচিত করেছে।’ দেশে-বিদেশে সক্রিয় এই সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ককে সম্পূর্ণভাবে প্রতিহত করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘অবিলম্বে গণহত্যাকারী দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার শুরু করতে হবে।’

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ভেরিফায়েড পেজেও জোরালো অবস্থান ব্যক্ত করে লেখা হয়েছে, ‘সন্ত্রাসী সংগঠন আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোনো রিকনসিলিয়েশনের (সমঝোতা বা পুনর্মিলন) নয়।’

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ-উর রহমানও আওয়ামী লীগের সঙ্গে রিকনসিলিয়েশনের কোনো সম্ভাবনা ব্যক্তিগতভাবে দেখেন না বলে জানিয়েছেন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সেলিম রেজা নিউটন আমার দেশকে বলেন, ‘ফ্যাসিস্ট পার্টি হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার করতে হবে। পার্টি হিসেবে তারা তাদের জাত চিনিয়ে চলেছে। তাদের পাওনা চুকিয়ে দিতে হবে। বিচারের পরে আর এই নামে বাংলাদেশে পার্টি থাকা চলবে না। যারা অপরাধী নন, তারা চাইলে নতুন নামে আওয়ামী লীগ গড়ে তুলুন।’

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সদস্য সচিব ও গণবিপ্লবী উদ্যোগের আহ্বায়ক আরিফ সোহেল আমার দেশকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের বিচার মূলত দুটি আসপেক্টে দেখতে হবে। প্রথমত, ব্যক্তি হিসেবে আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের বিচার, যারা ছাত্রজনতাকে হত্যার উদ্দেশ্যে আক্রমণসহ বিভিন্ন অপরাধ করেছেন। দ্বিতীয়ত, দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার, যারা সুপরিকল্পিত ও সুসংগঠিতভাবে জনগণের বিরুদ্ধে গণহত্যার মতো অপরাধ করেছে।

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ব্যক্তি হিসেবে কিছু বিচার হলেও অনেক নেতাকর্মী দ্রুত জামিন পেয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী ছাত্রজনতাকে নানাভাবে হুমকি দিচ্ছেন এবং ক্ষতি করার চেষ্টা করছেন।

অন্যদিকে, দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে কেবল নির্বাহী আদেশে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যার কোনো স্পষ্ট আইনগত ভিত্তি বা বিচার বিভাগের জাস্টিফিকেশন নেই। ফলে যেকোনো সময় আরেকটি নির্বাহী আদেশে তা পাল্টে ফেলা সম্ভব।

তাই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের একজন ছাত্র হিসেবে এই পরিস্থিতিকে অত্যন্ত আশঙ্কাজনক ও লজ্জাজনক মনে করি এবং অবিলম্বে অপরাধী নেতাকর্মীদের বিচার জোরদার করা, আমলাতন্ত্রের সঙ্গে তাদের যোগাযোগের বিষয়টি কঠোরভাবে পরিচালনা করা এবং আদালতের রায়ের মাধ্যমে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার শুরু করার দাবি জানাই।’

তদন্তের বর্তমান পরিস্থিতি

গণহত্যার দায়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বিচার প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম আমার দেশকে বলেন, ‘আগস্টের গণহত্যাকারী দল হিসেবে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন মানবতাবিরোধী অপরাধের কার্যক্রমগুলোর তদন্ত চলছে। দেশব্যাপী বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় এ সব কর্মকাণ্ড সংঘটিত হওয়ায় তদন্তে সময় লাগছে।’

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ট্রাইব্যুনালের কয়েকটি সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগের দ্বারা সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধগুলোর তদন্ত তেমন আগাচ্ছে না। তাদের অনেক অপরাধ বিভিন্নভাবে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। অনেক আলামত বিভিন্নভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

 

আইনি প্রক্রিয়া ও কাঠামোগত উদ্যোগ

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীনে রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে গণহত্যার দায় ও অপরাধ সংগঠনের অভিযোগের আইনি প্রক্রিয়া সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ই শুরু হয়। ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণহত্যা এবং আন্দোলন দমনে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তদন্ত করছে।

প্রসিকিউশন থেকে জানানো হয়েছে, ব্যক্তি পর্যায়ের পাশাপাশি রাজনৈতিক দল হিসেবেও আওয়ামী লীগকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে তদন্ত প্রতিবেদন ও প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযোগপত্র প্রস্তুতের কাজ চলছে। জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে দলগতভাবে অপরাধ ও সহিংসতায় জড়িত থাকার প্রমাণ চূড়ান্ত হলে ট্রাইব্যুনালের পাশাপাশি সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯-এর আওতায় সংগঠনটিকে বিচারিক প্রক্রিয়ায় শাস্তি দেওয়ার আইনি পথও উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।

২০২৫ সালের ১০ মে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের বিশেষ সভায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধের যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। পরে সংবাদ ব্রিফিংয়ে তৎকালীন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল জানান, ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনে সংশোধন এনে ট্রাইব্যুনালকে যেকোনো রাজনৈতিক দল, তার অঙ্গসংগঠন বা সমর্থক গোষ্ঠীকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত করা, তাদের কার্যকলাপ স্থগিত করা, নিবন্ধন বাতিল করা কিংবা সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার মতো শাস্তিমূলক আদেশ দেওয়ার এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে।

ট্রাইব্যুনালে আওয়ামী লীগ ও এর নেতাদের বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা, জুলাই আন্দোলনের নেতাকর্মীদের নিরাপত্তা এবং সাক্ষীদের সুরক্ষার স্বার্থে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীনে সাইবার স্পেসসহ আওয়ামী লীগ ও এর সকল অঙ্গ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের যাবতীয় রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।

এর আগে ২০২৪ সালের অক্টোবরে দলটির ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ আখ্যা দিয়ে নিষিদ্ধ করা হয়। সরকারি সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায় নির্বাচন কমিশনও রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করে।

বিচারিক কার্যক্রম ও প্রধান রায়সমূহ

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে এবং ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যান। জাতিসংঘের তথ্যমতে, জুলাই-আগস্ট আন্দোলন চলাকালে প্রায় ১,৪০০ বিক্ষোভকারী নিহত হন।

গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে আইসিটি পুনর্গঠিত হয়ে পূর্ণাঙ্গ বিচারকাজ শুরু করে। ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানে গণহত্যার মাস্টারমাইন্ড ও উসকানিদাতা হিসেবে ভারতে পলাতক হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। একই মামলায় সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন রাজসাক্ষী হওয়ায় তাকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

পরবর্তীতে চলতি বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তিন সদস্যের বেঞ্চ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ দলটির সাবেক সাত মন্ত্রী ও শীর্ষ নেতাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেয়।