জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে চালের বাজারে। তবে পরিবহণ ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে খুচরা দামের ফারাক আকাশ-পাতাল। কারণ তেলের দাম বাড়ার পর ৫০ কেজি চালের বস্তা ঢাকায় আনতে বাড়তি খরচ হচ্ছে মাত্র ১০ টাকা। অথচ খুচরা পর্যায়ে ওই বস্তার দাম ১৫০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। অর্থাৎ পরিবহণ ব্যয়ের ১৫ গুণ বাড়তি অর্থ গুনতে হচ্ছে ক্রেতাকে। আর এই টাকা ২৫ দিন ধরে ভোক্তার পকেট থেকে নিয়ে যাচ্ছে অসাধু চক্র। ফলে বাজারে চাল কিনতে এসে পিষ্ট হচ্ছেন ভোক্তা। বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের যেসব সংস্থা এ বিষয়ে তদারকি করবে, তারাও এক প্রকার নিশ্চুপ ভূমিকা পালন করছে। বাড়তি দামের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বাজারে।
প্রসঙ্গত, গত ২০ সেপ্টেম্বর ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়, যা কার্যকর করা হয় ২১ সেপ্টেম্বর থেকে। এর আগে গত ১৯ এপ্রিল ও ১ জুন তেলের দাম বাড়ানো হয়। কিন্তু প্রতিবারই জ্বালানি তেলের দাম যে হারে বেড়েছে, তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি বাড়ে বাজারদর। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই শুক্রবার ছুটির দিনে সপ্তাহের বাজার করেছেন সব শ্রেণিপেশার মানুষ।
রাজধানীর মালিবাগ কাঁচাবাজার, নয়াবাজার, জিনজিরা বাজারসহ একাধিক খুচরা বাজারে প্রতিকেজি বিআর-২৮ জাতের চাল বিক্রি হচ্ছে ৬৫ টাকায়, যা এক মাস আগেও ৬২ টাকা ছিল। এক্ষেত্রে কেজিতে ৩ টাকা বেড়েছে। এতে ৫০ কেজির বস্তায় বেড়েছে ১৫০ টাকা। প্রতিকেজি পাইজাম চাল বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা, যা আগে ৫৭ টাকা ছিল। প্রতিকেজি মিনিকেট বিক্রি হচ্ছে ৮৫ টাকা, যা তেলের দাম বাড়ার আগে ৮২ টাকা ছিল। এই চালের ক্ষেত্রেও খুচরা পর্যায়ে বস্তায় ১৫০ টাকা বাড়ানো হয়েছে।
মালিবাগ কাঁচাবাজারের খুচরা চাল ব্যবসায়ী দিদার হোসেন যুগান্তরকে বলেন, সরকার জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। এতে সব ধরনের পরিবহণ ব্যয় বেড়েছে। পাইকাররা সব ধরনের চালের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। যে কারণে আমাদের বেশি দামে চাল আনতে হচ্ছে। বিক্রিও করতে হচ্ছে বাড়তি দামেই।
তবে কাওরান বাজারের আল্লাহর দান রাইস এজেন্সির মালিক ও পাইকারি আড়তদার সিদ্দিকুর রহমান বলেন, তেলের দাম বাড়ার পর বগুড়া থেকে একটি ট্রাক কাওরান বাজারে আনতে ১৬ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে, যা আগে ১৪ হাজার টাকা ছিল। প্রতি ট্রাকে ৩০০ বস্তা (এক বস্তায় ৫০ কেজি) চাল আনা যায়। ট্রাকপ্রতি ২ হাজার টাকা বাড়ায় ৫০ কেজির বস্তায় দাম বেড়েছে ১০ টাকা। সেই হিসাবে প্রতিকেজি চালে পরিবহণ ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব পড়ে মাত্র ২০ পয়সা। কিন্তু খুচরা বাজারে প্রতিকেজি চালের দাম বাড়ানো হয়েছে ৩ টাকা। এতে ৫০ কেজির বস্তায় ক্রেতাকে অতিরিক্ত গুনতে হচ্ছে ১৫০ টাকা। পরিবহণ ব্যয় বাদ দিলে বাড়তি দামের সঙ্গে ১৪০ টাকার ব্যবধান তৈরি হচ্ছে। কিন্তু সেখানে কোনো অভিযান নেই। কোনো সংস্থা তাদের কিছু বলছে না।
উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. এম কে মুজেরী যুগান্তরকে বলেন, এমনিতে পণ্যের উচ্চমূল্যের কারণে সাধারণ মানুষের জীবন বিধ্বস্ত। অনেকের আয় নেই। বেকারত্ব বাড়ছে। আবার আয় বাড়ছে না বেশির ভাগ মানুষের। এ অবস্থায় নতুন করে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধাক্কা লেগেছে। বাজারে যে হারে দাম বাড়ার কথা তার চেয়েও বেশি দামে ক্রেতার পণ্য কিনতে হচ্ছে। সরকারের একাধিক সংস্থা বাজার তদারকি করলেও তাদের কাছে কোনো গবেষণাও নেই। তাই ভোক্তারা সরকারের বাজার মনিটরিংয়ে কোনো সুফল পাচ্ছে না। তিনি বলেন, এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব শুধু বাজারে অভিযান চালানো বা জরিমানা করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। পরিবহণ ব্যয় বৃদ্ধির প্রকৃত প্রভাব, পাইকারি ও খুচরা দামের ব্যবধান এবং মূল্যবৃদ্ধির যৌক্তিকতা যাচাই করতে হবে। অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়ানোর প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি বাজারে নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করা জরুরি।
একাধিক সবজির কেজি ১০০ টাকার ওপরে : বাজার ঘুরে দেখা যায়, প্রতিকেজি ঝিঙা, লাউ, কচুরমুখি ও পটোল বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকায়। বেগুন ও কাঁকরোলের কেজি ১০০ টাকা। শীতের আগাম জাতের মুলা ও ঢ্যাঁড়শের দামও কেজিপ্রতি ৮০-১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আগাম শিম কিনতে ক্রেতাদের গুনতে হচ্ছে কেজিতে ১৬০ টাকা। আর প্রতিকেজি টমেটো বিক্রি হচ্ছে ১৮০-২০০ টাকায়। তবে কিছুটা কমেছে কাঁচামরিচের দাম, কেজি বিক্রি হচ্ছে মানভেদে ১২০-১৪০ টাকায়। লাউ প্রতিপিস ৪০-৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
মাছ-মাংসের দামও চড়া : খুচরা বাজারে প্রতিকেজি সোনালি মুরগি বিক্রি হচ্ছে ৩৩০ টাকা। ব্রয়লার মুরগি ১৮০-১৯০ টাকা কেজি, যা গত সপ্তাহে সর্বোচ্চ ১৮০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। প্রতিকেজি গরুর মাংস ৮২০-৮৫০ টাকা। খুচরা বাজারে প্রতিকেজি তেলাপিয়া ২৫০-২৬০, পাঙাশ ২২০-২৩০, রুই-কাতলা ৩৮০-৪২০ এবং চিংড়ি ১০০০-১৩০০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। প্রতিকেজি পাবদা ৩৫০-৪০০ টাকা, বড় আকারের রুই ৪৫০-৫০০ ও ট্যাংরা ৭০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির যুগান্তরকে বলেন, পণ্যের বাড়তি দাম খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে মৌসুমি কারণে ডিম ও শাকসবজির দামে সাময়িক ওঠানামা হলেও দেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার সার্বিকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে। পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা সচল, জোগান পর্যাপ্ত এবং আমদানি ও দেশীয় উৎপাদন স্বাভাবিক রয়েছে। ফলে বাজারে বড় ধরনের সরবরাহ সংকটের কোনো আশঙ্কা দেখছি না।