Image description
কিশোর গ্যাং-এর বড় ভাইয়েরা আড়ালে

কিশোর গ্যাং দমনে সাঁড়াশি অভিযান চালাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গত দেড় মাসে সারা দেশে দেড় হাজারেরও বেশি কিশোর গ্যাং সদস্য গ্রেফতার হলেও পাড়া-মহল্লায় তাদের দৌরাত্ম্য এতটুকুও কমেনি। উলটো ধারণক্ষমতার দ্বিগুণের বেশি বন্দির চাপে হিমশিম খাচ্ছে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রগুলো। সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেকারত্ব, মাদকের অবাধ বিস্তার এবং স্থানীয় রাজনৈতিক ‘বড় ভাইদের’ আশ্রয়-প্রশ্রয় বন্ধ না করে শুধু পুলিশি ধরপাকড় দিয়ে এই সংকট মোকাবিলা করা প্রায় অসম্ভব। কিশোর অপরাধীদের সুপথে ফেরাতে সামাজিক কাঠামোর সংস্কারের পাশাপাশি পরিবারের নজরদারি ও সচেতনতা সবচেয়ে বেশি জরুরি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে যেসব জায়গায় হাত দেওয়া দরকার, সেখানে কেউ হাত দিচ্ছেন না। রাজনৈতিকভাবে পরিচিত কতিপয় ব্যক্তির আশ্রয়-প্রশ্রয়ে এলাকায় গ্যাং গড়ে ওঠে। পেছনের এই বড় ভাই বা শেল্টারদাতাদের আইনের আওতায় আনা হয় না। তিনি আরও বলেন, এসব কিশোরের বড় অংশই প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত পরিবার থেকে আসে। বেকারত্ব, শিক্ষার অভাব ও মাদকের ভয়াবহ বিস্তারের মতো সামাজিক সংকট জিইয়ে রেখে শুধু বলপ্রয়োগ করে কিশোর গ্যাং দমন অসম্ভব।

সূত্র জানায়, গত সেপ্টেম্বর থেকে ১০ অক্টোবর পর্যন্ত সারা দেশে দেড় হাজারেরও বেশি কিশোর গ্যাং সদস্য গ্রেফতার হয়েছে। এতে কিশোর সংশোধনাগার বা শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রগুলোতে ধারণক্ষমতার চেয়ে বন্দির সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি ছাড়িয়েছে। গাজীপুরের টঙ্গীতে অবস্থিত দেশের প্রধান শিশু উন্নয়নকেন্দ্রে ৩০০ জনের ধারণক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে সেখানে ৬৯৩ জন বন্দি রয়েছে। যশোরের পুলেরহাট শিশু উন্নয়নকেন্দ্রেও ১৫০ জনের জায়গায় বন্দি আছে ৩০৩ জন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাশ্চাত্যের গ্যাং কালচারের সঙ্গে দেশের কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তর ফারাক রয়েছে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরাঞ্চলে নানা ধরনের কিশোর গ্রুপ গড়ে উঠছে মূলত দারিদ্র্য, বেকারত্ব এবং মাদকের প্রভাবে। এছাড়া মিছিল-মিটিংসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে ব্যবহারের ফলে কিশোর গ্যাংয়ের লাগামহীন দৌরাত্ম্য ক্রমশ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর বস্তিকেন্দ্রিক এলাকাগুলোতে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য সবচেয়ে বেশি। মোহাম্মদপুর, উত্তরা, টঙ্গী, মিরপুর ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় পুলিশের খাতায় দেড় শতাধিক কিশোর অপরাধী গ্রুপের নাম রয়েছে, যাদের সদস্যসংখ্যা প্রায় আড়াই হাজার। দিন দিন এ সংখ্যা আরও বাড়ছে। এদের অনেকেই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগবঞ্চিত বা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন। এর পাশাপাশি ফেসবুক ও টিকটকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহারও কিশোরদের গ্যাং সংস্কৃতিতে জড়াচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুলিশি অভিযানে কিশোর অপরাধীদের আটক কিংবা গ্রেফতার করা হলেও সেভাবে সুফল মিলছে না। প্রচলিত কারাগারের বাইরে শিশু-কিশোরদের বিশেষ আটককেন্দ্র বা সংশোধনাগারে যথাযথ কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও নেই। ফলে সংশোধনাগার থেকে ফিরে এলেও কাঙ্ক্ষিত মানোন্নয়ন ঘটে না; বরং তাদের কেউ কেউ পরবর্তীতে চুরি কিংবা ডাকাতির মতো আরও বড় অপরাধে জড়ায়। কেউবা পেশাদার অপরাধী হয়ে ওঠে।

যে পথে সমাধান : কিশোর গ্যাং সমস্যা সমাধানের মূল চাবিকাঠি পরিবারের হাতে বলে মনে করছেন সমাজবিজ্ঞানীরা। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে-সে বিষয়ে পরিবারকেই সবার আগে তদারকি করতে হবে।

ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের বিচার-সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলে প্রথমে কিশোরদের মনোজগৎকে ভালোভাবে বুঝতে হবে। উঠতি বয়সিরা তাদের বয়ঃসন্ধিকালে স্বাভাবিকভাবেই আবেগপ্রবণ থাকে। ফলে তারা পারিপার্শ্বিক পরিবেশে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা কিংবা মহল্লার বড় ভাইদের মতো তারাও ক্ষমতা প্রদর্শন করতে চায়। এর সুযোগ নেন কতিপয় রাজনৈতিক নেতা কিংবা অপরাধীচক্র। এভাবে নিজের অজান্তেই কিশোরদের অনেকে পাড়া-মহল্লাভিত্তিক বিভিন্ন গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। এছাড়া হুজুগ ও হাতাশা থেকেও অনেকে নানা ধরনের অপরাধীচক্রে যোগ দেয়। বেকারত্বের কারণেও কেউ কেউ মাদক সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত হয়। ফলে শুধু পুলিশি ভয় দেখিয়ে এদের সুপথে ফেরানো বেশ কঠিন।

তিনি আরও বলেন, বিদ্যমান আইনে ১৮ বছরের নিচে সবাই শিশু হওয়ায়, ১৬-১৭ বছর বয়সিরা অস্ত্র বা মাদকের মতো গুরুতর অপরাধে জড়ালেও তাদের শিশু হিসাবে দ্রুত জামিন দিতে হয়।

পুলিশের সাবেক আইজিপি মুহাম্মদ নুরুল হুদা বলেন, কিশোর গ্যাং বিশ্বের সব দেশেই কমবেশি আছে। তবে এটি প্রতিরোধে শুধু পুলিশের ওপর নির্ভর করলে চলবে না, পুলিশের পাশাপাশি সমন্বিত সামাজিক উদ্যোগও নিতে হবে।