চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) অবরুদ্ধ উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে উদ্ধার করে ক্যাম্পাসের বাইরে নিয়ে গেছে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ। মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা ও পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলমের উপস্থিতিতে তাকে প্রশাসনিক ভবন থেকে বের করে আনা হয়। পরে পুলিশি নিরাপত্তায় এম্বুলেন্সে করে ক্যাম্পাস ছাড়েন তিনি।
তবে উপাচার্যকে ক্যাম্পাস ছাড়তে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা একটি শর্ত দেন। প্রশাসনিক ভবন থেকে তাকে বের করে আনার পর এক শিক্ষার্থী মাইকে ঘোষণা দেন, উপাচার্যকে ক্যাম্পাস থেকে বের হতে দেয়া হচ্ছে এই শর্তে যে, তিনি আর চুয়েট ক্যাম্পাসে ফিরবেন না। এ সময় জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার উপস্থিত ছিলেন। উপাচার্যকে এম্বুলেন্সে তোলার সময় শিক্ষার্থীরা তাকে লক্ষ্য করে ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দেন।
এর আগে মঙ্গলবার বিকাল ৫টা ২০ মিনিটের দিকে উপাচার্যকে উদ্ধার করতে চুয়েট ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার। জেলা প্রশাসক বলেন, ‘একজন সম্মানিত শিক্ষক আমাদের কাছে নিরাপত্তা চেয়েছেন, চিকিৎসার জন্য বলেছেন। তাকে আমরা নিয়ে যেতে এসেছি। তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হবে।’ তবে উপাচার্যকে কোন হাসপাতালে নেয়া হয়েছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্যে সোমবার সকালে প্রশাসনিক ভবনের মূল ফটকের তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম। তার ক্যাম্পাসে প্রবেশের পর নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, উপাচার্য বহিরাগত ব্যক্তিদের নিয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন। এর প্রতিবাদে তারা পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন জোরদার করেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পদত্যাগ না করলে তাকে অবরুদ্ধ রাখার ঘোষণা দেন আন্দোলনকারীরা। এরপর থেকে নিজ কার্যালয়ে অবরুদ্ধ ছিলেন উপাচার্য।
এর আগে নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম অবরুদ্ধ অবস্থায় মঙ্গলবার দুপুরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় বুকে ব্যথা অনুভব করার কথা জানান। তিনি চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে এবং প্রয়োজনে হাসপাতালে যেতে চান বলেও উল্লেখ করেন। এর আগে সোমবার দুপুর ১২টার পর উপাচার্য ও তার সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের ভবনের ভেতরে রেখে মূল ফটকে তালা দেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। একইসঙ্গে ভবনের বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়। এরপর থেকে তারা ভবনটির ভেতরে অবস্থান করছেন।
দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎবিহীন ভবনে অবস্থান করায় উপাচার্যসহ ভেতরে থাকা ব্যক্তিরা গরম, ঘুমের অভাব ও শারীরিক অস্বস্তিতে ভুগতে থাকেন। পরিস্থিতি বিবেচনায় মঙ্গলবার সকালে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্র থেকে এম্বুলেন্স ও চিকিৎসক নিয়ে আসেন। পরে আন্দোলনকারীরা সাংবাদিকদেরও ভবনের ভেতরে প্রবেশের সুযোগ দেন। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দাবি, উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে পদত্যাগ করতে হবে। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত অবরোধ প্রত্যাহার করা হবে না বলে জানিয়েছেন তারা।
পুরকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী ইজাজ মাহমুদ খান বলেন, উপাচার্যকে ভবন ছেড়ে যাওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময় দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি চলে না যাওয়ায় শিক্ষার্থীরা অবরোধ অব্যাহত রেখেছেন। তবে ভবনের ভেতরে থাকা ব্যক্তিদের জন্য সকালে খাবার পৌঁছে দেয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সংহতি জানিয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ও রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) শিক্ষার্থীরাও যৌথ বিবৃতি দিয়েছেন।
চুয়েটে উপাচার্য নিয়োগকে কেন্দ্র করে গত ২১শে সেপ্টেম্বর থেকে অচলাবস্থার সূত্রপাত। ওই দিন অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে সরিয়ে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে চুয়েটের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। এরপর থেকেই সাবেক উপাচার্যকে পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন শিক্ষার্থীরা।
২২শে সেপ্টেম্বর থেকে শিক্ষার্থীরা ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি পালন করছেন। একই দাবিতে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও কর্মবিরতি ও অসহযোগ কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ থাকায় বিশ্ববিদ্যালয় জুড়ে অচলাবস্থা বিরাজ করছে। দীর্ঘ সময় ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে না পারার পর সোমবার উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম প্রশাসনিক ভবন-২ এর তালা ভেঙে নিজের কার্যালয়ে প্রবেশ করেন। তার ক্যাম্পাসে আসার খবর ছড়িয়ে পড়লে শিক্ষার্থীরা কার্যালয়ের সামনে জড়ো হন। একপর্যায়ে তাকে ভবন ছেড়ে যাওয়ার সময়সীমা বেঁধে দেন তারা। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তিনি বের না হওয়ায় ভবনের ফটকে পুনরায় তালা ঝুলিয়ে অবরোধ শুরু করেন আন্দোলনকারীরা।