Image description

সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পর সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বাংলাদেশের শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্স প্রবাহ নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি খারাপ হওয়ায় ঢাকা থেকে রিয়াদসহ বিভিন্ন গন্তব্যের বহু ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। ফলে হাজার হাজার নতুন ও পুরনো কর্মী আটকা পড়েছেন।

সংশ্লিষ্টরা শঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, সৌদি আরব বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় জনশক্তি রপ্তানির গন্তব্যগুলোর একটি। একইসঙ্গে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়েরও অন্যতম প্রধান উৎস। দেশটিতে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি দীর্ঘায়িত হলে নতুন কর্মী পাঠানো, বিদ্যমান কর্মীদের কর্মসংস্থান এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ- সব ক্ষেত্রেই চাপে পড়বে বাংলাদেশ। এ ছাড়া ইতিমধ্যেই ঢাকা থেকে ৮২টির বেশি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এর ফলে প্রবাসী কর্মীরা সময়মতো কর্মস্থলে ফিরতে না পেরে ঢাকায় আটকে পড়ে চরম দুর্ভোগ ও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। এর প্রভাবে বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান অর্থাৎ শ্রমবাজার সংকুচিত ও রেমিট্যান্স প্রবাহে নেতিবাচক ফলাফল পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অভিবাসন খাত বিশেষজ্ঞরা জানান, সাম্প্রতিক সৌদিতে হামলায় বিমানবন্দরে বাংলাদেশি কর্মী নিহত ও আহত হওয়ার পর প্রবাসী কর্মী ও নতুন গমনেচ্ছুদের মধ্যে মারাত্মক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। একইসঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক অচলাবস্থার আশঙ্কায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন বা রেমিট্যান্স প্রবাহেও বড় ধরনের ক্ষতি হবে বলে মনে করা হচ্ছে। আঞ্চলিক অস্থিরতা বাড়তে থাকায় মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত প্রায় ৬০ লাখ বাংলাদেশি প্রবাসী অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

রেমিট্যান্সে সৌদির বড় অবদান
বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি শ্রমিক থাকেন সৌদি আরব। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সৌদি আরব থেকে দেশে এসেছে প্রায় ৫৮৪ কোটি ৯১ লাখ ডলার রেমিট্যান্স। আগের অর্থবছর ২০২৪-২৫-এ এই অঙ্ক ছিল ৪২৬ কোটি ৪৪ লাখ ডলার। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে সৌদি থেকে রেমিট্যান্স বেড়েছে প্রায় ৩৭ শতাংশ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সব দেশ মিলিয়ে বাংলাদেশের প্রবাস আয় ছিল প্রায় ৩ হাজার ৫৫৯ কোটি ডলার। সেই হিসাবে মোট রেমিট্যান্সের উল্লেখযোগ্য অংশ এসেছে সৌদি আরব থেকে।

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসেও রেমিট্যান্স প্রবাহে শক্তিশালী ছিল সৌদি আরব। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে দেশটি থেকে এসেছে প্রায় ১৬৫ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩৪ শতাংশ বেশি। মোট প্রবাস আয়ের প্রায় ১৯.২ শতাংশ এসেছে সৌদি আরব থেকে। ফলে দেশটির শ্রমবাজার বা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে তার প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে রেমিট্যান্স আহরণে তৃতীয় অবস্থানে থাকা সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এসেছে ৭৭ কোটি ৭৬ লাখ ডলার।

সৌদি প্রবাসী শহীদুল জানান, সৌদিতে একটি রেস্তরাঁ চালান তিনি। ভালোই আয় হচ্ছিল। কিন্তু যুদ্ধের সরাসরি প্রভাব পড়েছে সৌদিতে। হামলার পর দীর্ঘদিন ধরে তার রেস্তরাঁটি বন্ধ রাখতে হয়। পর্যটকশূন্য। ফলে তার আয়-রোজগারে বড় টান পড়েছে। দেশে পরিবারকে টাকাও পাঠাতে পারছেন না তিনি।

জনশক্তি রপ্তানিতেও শীর্ষে সৌদি
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে রেকর্ড ৭ লাখ ৫৫ হাজার ১৯৪ জন কর্মী সৌদি আরবে গেছেন। একই বছরে বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য বাংলাদেশ ছেড়েছেন ১১ লাখের বেশি মানুষ, তাদের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি গেছেন সৌদি আরবে। দেশটিতে বর্তমানে প্রায় ৩৫ লাখ বাংলাদেশি বসবাস ও কাজ করছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া কাতারে ৪২ হাজার ৫১৬ জন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২০ হাজার ৬৬১ জন এবং কুয়েতে ২০ হাজার ২৫৪ জন কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে গেছেন। একই সময়ে জর্ডানে ১০ হাজার ১০ জন এবং ইরাকে ২ হাজার ৮৭৮ জন বাংলাদেশি কর্মী গেছেন।

চলতি বছরে সংঘাতের কারণে কর্মী যাওয়া থমকে গেছে। চলতি বছরের ১লা মার্চ থেকে ১০ই অক্টোবর পর্যন্ত সৌদি আরবে মোট জনশক্তি রপ্তানি হয়েছে ২ লাখ ১ হাজার ৩৬১ জন। অথচ আগের বছরের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ৪ লাখ ৫০ হাজার ৯০৭ জন। অর্থাৎ, এককভাবে সৌদিতে কর্মী পাঠানোর হার কমেছে প্রায় ৫৫ শতাংশ।
চলতি বছরের ১০ই অক্টোবর পর্যন্ত বিশ্ব জুড়ে বাংলাদেশ থেকে মোট ৫ লাখ ৭৮ হাজার ৫৯৭ জন কর্মী বিদেশে গিয়েছেন, যা আগের বছরের একই সময়ের (৮ লাখ ৫১ হাজার ৯৫ জন) তুলনায় ৩২ শতাংশ কম।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক জানান, সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর পরই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। যুদ্ধের মধ্যেও মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ কর্মী গেছেন। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান শ্রমবাজারে যুদ্ধের কারণে সংকট সৃষ্টি হওয়ায় সরকার বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান শুরু করেছে।

খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, বিপুলসংখ্যক কর্মীর কর্মসংস্থান ও আয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি, পরিবারগুলোর জীবনযাত্রা, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং আবাসন ব্যয় জড়িয়ে আছে। বিদেশে যাওয়ার জন্য অনেক কর্মী জমি বিক্রি করেন, ঋণ নেন কিংবা পরিবারের সঞ্চয় ব্যয় করেন। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে তাদের আর্থিক চাপ আরও বাড়তে পারে। আর যারা ইতিমধ্যে সৌদিতে কাজ করছেন, তাদের নিরাপত্তা ও নিয়মিত আয় নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানান, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই আমরা একটি জটিল বৈশ্বিক পরিস্থিতির মধ্যদিয়ে যাচ্ছি। এ পরিস্থিতিতেও প্রবাসী কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা কাজ করছি। একইসঙ্গে নতুন করে কর্মী পাঠানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। আশা করছি, অল্প কিছুদিনের মধ্যেই বিদেশে কর্মী পাঠানোর সংখ্যা বাড়বে।

এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক সংঘাতের প্রভাবে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে তাৎক্ষণিক ধাক্কা লাগতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। তিনি জানান, সংঘাতের কারণে প্রবাসীদের চাকরি হারানো ও দেশে ফিরে আসার পরিস্থিতি তৈরি হলে এর প্রভাব রেমিট্যান্সে পড়তে পারে। শামা ওবায়েদ বলেন, চলমান সংঘাত তাদের কর্মসংস্থান ও দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহের জন্য উদ্বেগ তৈরি করেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার নতুন আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার খুঁজছে।

ব্র্যাকের মাইগ্রেশন ও ইয়ুথ প্ল্যাটফরমের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে কর্মসংস্থান মধ্যপ্রাচ্য এবং মূলত সৌদিনির্ভর। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই কর্মী পাঠানো কমছে। কর্মীরা যেমন যেতে পারছেন না, যারা দেশটিতে আছেন, তারাও হতাহত হচ্ছেন। এ ছাড়া বিদেশি বিনিয়োগের একটা নিরাপদ জায়গা ছিল মধ্যপ্রাচ্য। এখন সেটিও হুমকির মধ্যে পড়েছে। এ কারণে কর্মীর চাহিদা কমে যাবে। বড় রকমের বিপদের মধ্যে পড়তে পারে বাংলাদেশ। বেকারদের কর্মসংস্থান কমবে এবং প্রবাসী আয় কমতে থাকবে। তাই সরকারের উচিত, দেশের অর্থনীতির অন্যতম নির্ভরতার দেশ সৌদির সঙ্গে দ্রুত আলোচনা করা। ঝুঁকি কমাতে একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা জরুরি।