Image description

বাংলাদেশ শিশু একাডেমিতে শিশু অধিকার দিবস-২০২৬ ও একাডেমির ৫০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) তিনি বলেন, ‘এখান থেকে ‘‘শিশু’’ নামে একটি ম্যাগাজিন বের হতো। সেই সময়ে আমরা যখন ছোট ছিলাম তাদের মধ্যে কেউ ছড়া লিখত, কবিতা লিখত বা কেউ গল্প লিখত। এরকম কয়েকটি গল্প ও ছড়াও আমিও লিখেছিলাম তখন।’

 

‘শিশু’ পত্রিকার ইতিহাস স্মরণ করে শিশু একাডেমির প্রোগ্রাম অফিসার মো. কামরুজ্জামান স্ট্রিমকে বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ছোটবেলায় এই পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় লিখেছিলেন। ১৯৭৭ সালের সেপ্টেম্বর সংখ্যায় ‘কচি হাতের লেখা’ বিভাগে তাঁর একটি ছোটগল্প প্রকাশিত হয়েছিল। এই পত্রিকায় লিখে পরবর্তী কালে প্রতিষ্ঠিত লেখক হয়েছেন এমন মানুষের সংখ্যাও অনেক, যা একটি মাসিক পত্রিকার ইতিহাসে বিরল।

 

‘শিশু’ পত্রিকার প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭৭ সালের সেপ্টেম্বরে মাসে। তখন পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলেন জোবেদা খানম। প্রচ্ছদ ও অঙ্গসজ্জা করেছিলেম হাশেম খান। তারেক রহমানের গল্পটির জন্য ছবি এঁকেছিলেন সৈয়দ ইকবাল। তখন পত্রিকাটির মূল্য ছিল দুই টাকা।

 

স্ট্রিমের পাঠকদের জন্য গল্পটি পুনর্মুদ্রণ করা হলো

 

সামান্য পেরেক

তারেক রহমান (পিনু)

 

এক গ্রামে একটি লোক বাস করতো। তার নাম রফিক। সে কোন জিনিসকে তুচ্ছ মনে করতো না। যা তার চোখে পড়তো সব গুছিয়ে রাখতো। রাস্তায় একটা কাঁচের টুকরো বা লোহার টুকরো বা অন্য কোনো জিনিস পড়ে থাকতে দেখলে সে যত্নের সঙ্গে তুলে পকেটে রাখতো।

 

একদিন সে এক বন্ধুর বাড়ি বেড়াতে গেলো। তার বন্ধু সেদিন শহর থেকে ফিরেছে। শহরে সে কি করে টাকা রোজগার করেছে সেই গল্প সে রফিককে শোনালো। রফিক বন্ধুর গল্প শুনে মনে করলো, সেও শহরে গিয়ে টাকা রোজগার করবে। রফিক এটা ওটা ফেরী করে, তাতে তার সংসার চলে না।

 

সে একদিন শহরের দিকে রওয়ানা হলো। তার পয়সা নেই বলে কিছু চিড়ামুড়ি বেঁধে নিয়ে হেঁটেই চললো শহরে।

 

যেতে যেতে এক জায়গায় তার পায়ে যেন কি লাগলো। সে নীচু হয়ে দেখলো, দুটো পেরেক পড়ে আছে। অভ্যাস মতো পেরেক দুটোকে যত্নের সঙ্গে তুলে পকেটে রাখলো।

 

সন্ধ্যা বেলায় সে একটা জঙ্গলের ধার দিয়ে যাচ্ছিলো; তখন সে দেখলো তার পেছন দিকে একটা ছেলে সাইকেলে চড়ে ছুটে যাচ্ছে আর পিছনে দুটো লোক আসছে একটা বেবী ট্যাকসি করে।

 

এমন তো কতো লোকই যায়। রফিক ভাবলো। পয়সা থাকলে লোকে কতো রকমের গাড়ী চালায়। রফিকের পয়সা নেই, তাই হেঁটে যাচ্ছে। আরো কিছুদূর যেতে রফিক দেখলো, একটা ঘোড়ার গাড়ী কাত হয়ে পড়ে আছে।

 

রফিক গিয়ে ঘোড়ার গাড়ীর চালককে জিজ্ঞেস করলো—আপনার কি হয়েছে?

কোচোয়ান বললো—গাড়ীর চাকার পেরেক খুলে গেছে।

রফিক তখন পকেট থেকে সেই পেরেক দুটো বের করে বললো—এই দুটো পেরেক আমার কাছে আছে। এতে হবে?

কোচোয়ান লাফিয়ে উঠে বললো—খুব হবে।

 

তারা দুজনে মিলে পেরেক দুটো দিয়ে গাড়ী ঠিক করে ফেললো। কোচোয়ান বললো—ভাই, তুমি আমার এত উপকার করলে তোমাকে কি দেবো? এই দুটো টাকা নাও।

 

রফিক বললো—না, না আমি টাকা নেবো না।

কোচোয়ান বললো—তাহলে কি দেবো তোমাকে? আমি শহরে গেলে তোমাকে নিয়ে যেতাম। আমি তো যাচ্ছি উল্টো দিকে।

রফিক বললো—না, আমাকে কিছুই দিতে হবেনা। কোচোয়ানের গাড়ীতে এক ছড়া কলা আর অনেক গুলো পেয়ারা ছিলো, আপত্তি করলেও তাই সে রফিককে দিয়ে দিলো।

 

রফিক আবার এগুতে লাগলো সামনের দিকে। সন্ধ্যা হয়ে আসছে, এমন সময় রফিক জঙ্গলের মধ্যে থেকে বাচ্চার কান্না শুনতে পেলো। সে মনে করলো কোনো বাচ্চা বোধহয় হারিয়ে গেছে।

সে চিৎকার করে বললো—কে কাঁদে ওখানে?

তার গলা শুনে একটা মেয়েলোক, দুটো ছেলে মেয়ে নিয়ে বেরিয়ে এলো।

রফিক জিজ্ঞেস করলো—কি হয়েছে আপনাদের?

মেয়েটি বললো—সকাল বেবী ট্যাকসী করে বাড়ি যাচ্ছিলাম। দুটো লোক বেবী ট্যাকসী থামিয়ে আমাদের নামিয়ে দিলো। আমাদের কাছে যা ছিলো, সব কেড়ে নিলো। আমরা ভয়ে জঙ্গলের মধ্যে পালিয়েছিলাম। সন্ধ্যা হয়ে গেলো, এখন কি করে বাড়ি যাব ভেবে পাচ্ছিনা। ছেলে মেয়ে দুটো ক্ষিদেয় কাঁদছে।

 

রফিক তাদেরকে কলা খেতে দিলো। ছেলেমেয়ে দুটো আর তাদের মা পেট ভরে কলা আর পেয়ারা খেলো।

তাদের বাড়ি বেশী দূরে ছিলোনা। মেয়েটির স্বামী ব্যবসা করে। তাদের বাড়িতে কান্নাকাটি পড়ে গেছে।

হারানো বউ ও ছেলে মেয়ে পেয়ে ব্যবসায়ী খুব খুশী। সে রফিককে দু’তিনটা টাকা দিতে গেলো।

 

রফিক বললো—না আমি টাকা নেবো না।

ব্যবসায়ী জিজ্ঞেস করলো—কিছু নেবে না?

রফিক বললো, না।

তবে তোমার ঠিকানাটা রেখে যাও।

ঠিকানা দিয়ে আবার রফিক চলতে শুরু করলো।

 

কিছু দূর যেতেই দেখে সাইকেল চড়ে যে ছেলেটিকে সে যেতে দেখেছিলো, সে রাস্তার ধারে পড়ে কাতরাচ্ছে।

রফিক তাড়াতাড়ি ছেলেটিকে ধরে তুলে জিজ্ঞেস করলো, কি হয়েছে তোমার? কে মেরেছে?

 

ছেলেটি বললো—দুটো লোক এসে আমার সাইকেল, ঘড়ি, টাকা পয়সা সব কেড়ে নিয়েছে। আমি দিতে চাচ্ছিলাম না বলে আমাকে মেরেছে। আমি শহরের কাছাকাছি থাকি। আমি এখন কি করে বাড়ি যাব?

রফিক তাকে বললো—আমাকে ধরে ধরে চলো, আমি তোমাকে পৌঁছে দেবো।

রফিককে ধরে ধরে ছেলেটি চলতে লাগলো।

সেখান থেকে শহর মাইল খানেক দূরে। রফিক ছেলেটাকে বাড়ি পৌঁছে দিলো।

 

ছেলেটা খুব ধনীর সন্তান। তার আব্বা রফিককে অনেক টাকা দিতে চাইলো, কিন্তু রফিক নিলো না।

ছেলেটার আব্বা বললো—তুমি টাকা রোজগারের জন্য শহরে থেকোনা; তুমি এতো ভালো মানুষ, শহরের লোক তোমাকে ঠকাবে। তুমি গ্রামে যাও সেখানে তুমি কাজ করো।

পরদিন নিজের গ্রামে ফিরে রফিক অবাক।

 

ব্যবসায়ী ভদ্রলোক, ঘোড়ার গাড়ীওয়ালা সবাই তার বাড়িতে বসে। তারা অনেক জিনিস এনেছে, কিন্তু রফিকের বৌ কিছুই নেবে না। তার এক কথা, ‘না সাহেব, আমরা গরীব মানুষ। আমরা এসব দামী জিনিস দিয়ে কি করব?’

তখন সবাই মিলে টাকা দিয়ে রফিককে পাঁচ বিঘা জমি কিনে দিলো।

 

তারা বললো—রফিক, এই জমির দাম তুমি মাসে মাসে শোধ করো।

এই পাঁচ বিঘা জমিতে ধান ফলিয়ে রফিক জমির ধার শেষ করেছে। আরো জমি কিনেছে।

রফিক এখন আর আগের মত গরীব নেই। ব্যবসায়ী, বড়লোক এবং ঘোড়ার গাড়ীওয়ালা সবাই এখন তার বন্ধু।