অভিযানের পরও পুলিশের তালিকাভুক্ত দেশের শীর্ষ মাদক কারবারিদের তৎপরতা কিছুতেই থামানো যাচ্ছে না। সম্প্রতি কারাগারের প্রিজন ভ্যান থেকে পলাতক শীর্ষ মাদক কারবারি পিচ্চি রাজা পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা তদন্তে আরো নতুন তথ্য বেরিয়ে আসছে।
একইভাবে পিচ্চি রাজার মতো আরেক শীর্ষ ইয়াবা কারবারি দিলদারের রয়েছে ঢাকা ও কক্সবাজারে একাধিক বাড়ি ও ফ্ল্যাট। মূলত তিনি মিয়ানমার থেকে ইয়াবা এনে দেশে ছড়িয়ে দিচ্ছেন। পুলিশ, গোয়েন্দা ও মোহাম্মদপুর বিহারি ক্যাম্পের একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
পিচ্চি রাজা সম্পর্কে জানতে চাইলে তদন্তে পাওয়া তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (এসি) আব্দুল্লাহ আল মামুন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শীর্ষ মাদক কারবারি পিচ্চি রাজা মাদকের টাকায় ফ্ল্যাট, গাড়ি, বাড়িসহ যেসব সম্পদ করেছেন তার সন্ধান চলছে।
সূত্র মতে, পিচ্চি রাজা এর আগেও একাধিকবার গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। জামিনে বের হয়ে তিনি ফের শুরু করেন মাদক কারবার। তাঁর বিরুদ্ধে বিস্ফোরকদ্রব্য আইনেও একাধিক মামলা রয়েছে।
সর্বশেষ গাজীপুরের কেন্দ্রীয় কারাগারে নেওয়ার পথে প্রিজন ভ্যান থেকে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা তদন্তে পুলিশ জানতে পেরেছে, পিচ্চি রাজাকে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরাই পুরান ঢাকার তাঁতীবাজার এলাকায় প্রিজন ভ্যান থেকে ছেড়ে দেন। এ ঘটনায় প্রিজন ভ্যানের দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের জড়িত থাকার প্রমাণ পেয়েছে গাজীপুর মহানগর পুলিশের (জিএমপি) পর্যবেক্ষণ কমিটি। ওই ঘটনায় পাঁচ পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
তদন্তে বেরিয়ে আসে টয়লেটে যাওয়ার কথা বলে নয়, এসআই প্রবীর কুমার ও নায়েক কামাল হোসেনের সহযোগিতায় পালিয়ে গেছেন পিচ্চি রাজা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রিজন ভ্যান থেকে পালানোর পরই পিচ্চি রাজা সীমান্ত এলাকায় চলে যান। এরপর সীমান্ত পেরিয়ে অন্য দেশে চলে যান।
জিএমপি কমিশনার মো. ইসরাইল হাওলাদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রিজন ভ্যানের দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরা পিচ্চি রাজাকে টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দিয়েছেন। তবে কত টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দিয়েছেন তার তদন্ত চলছে। তদন্তে প্রিজন ভ্যানের চালক কামাল হোসেনের বাড়ি থেকে ৬০ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে এসআই প্রবীর কুমার বিশ্বাস ও নায়েক কামাল হোসেন নামের দুই পুলিশ সদস্য ও পিচ্চি রাজার বোন তাসলিমাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’
বিপুল সম্পদের মালিক শীর্ষ মাদক কারবারি দিলদার
পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ মাদক কারবারি দিলদার মাদকের টাকায় বিপুল সম্পদ গড়েছেন। পুলিশের ভাষ্য, দিলদারের রয়েছে অর্ধশতাধিক সহযোগী। এর আগে তাঁর এক সহযোগী বিপুল পরিমাণ ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হন।
মাদক কারবারি দিলদারের বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ কর্মকর্তা (এসি) আব্দুল্লাহ আল মামুন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দিলদার শীর্ষ মাদক কারবারিদের মধ্যে অন্যতম। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ইয়াবা ব্যবসায় সম্পৃক্ত। তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রায়েছে। তাঁকে গ্রেপ্তার করতে অভিযান চলছে।’
পিচ্চি রাজা ও দিলদারের মতো মোহাম্মদপুর এলাকায় আরো শীর্ষ ছয় গডফাদার রয়েছেন। তাঁদের নিয়ে জেনেভা ক্যাম্পের সাধারণ বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক রয়েছে। তাঁরা হলেন—মনু ওরফে গালকাটা মনু, সালাম, নেটা সেলিম, ইরফান, লালন ও ইমতিয়াজ। তাঁদের দুই শতাধিক সহযোগী ক্যাম্প ও আশপাশের এলাকায় প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি করেন।
প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি
গত কয়েক দিন কারওয়ান বাজার রেলগেট, মোহাম্মদপুর বিহারি ক্যাম্প, মগবাজার রেলগেট, পল্লবী থানা এলাকা, খিলগাঁও ওহাব কলোনি, উত্তর বাড্ডা এলাকার কয়েকটি গলি ঘুরে দেখা গেছে, অনেকটা প্রকাশ্যেই মাদক কেনাবেচা হচ্ছে। এসব ক্রেতা ও বিক্রেতার বেশির ভাগই তরুণ। এলাকাগুলোয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর বারবার অভিযানেও নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি মাদক কারবার।
গত মঙ্গলবার রাত ১১টার দিকে কারওয়ান বাজার রেলগেট এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, অন্তত সাতজন কিশোর-তরুণ প্রকাশ্যে মাদকের ব্যাগ কাঁধে নিয়ে ঘুরছে। তারা বলছিল, ‘নতুন বাবা (ইয়াবা) আছে। সস্তায় দিচ্ছি।’
সরেজমিনে মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্পে গিয়ে দেখা যায়, প্রকাশ্যে ইয়াবা, হেরাইনসহ সব ধরনের মাদক বিক্রি হচ্ছে। কোথাও কোথাও লাইন ধরে মাদক বিক্রি করতে দেখা গেছে। ক্যাম্পের চারপাশে পুলিশের চেকপোস্ট থাকলেও কারবারিরা থেমে নেই।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, গত ৩০ এপ্রিল থেকে রাজধানীসহ সারা দেশে মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছে। পুলিশের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে সারা দেশে ১৯ হাজার ৪৯টি মাদক মামলা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় এক হাজার ৯৪০টি মামলা হয়েছে। বিশেষ অভিযান শুরু হওয়ার পর এক সপ্তাহে শুধু রাজধানী থেকেই অন্তত এক হাজার ২০০ জন ছোট-বড় মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।