Image description

দেশে মোটরসাইকেলের সংখ্যা প্রায় ৫০ লাখ। গণপরিবহনের সীমাবদ্ধতা ও দ্রুত যাতায়াতের সুবিধার কারণে দিন দিন বাড়ছে এই বাহনের ব্যবহার। তবে এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানিও। সড়ক নিরাপত্তা ফাউন্ডেশনের হিসাবে, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত সারা দেশে ১৬ হাজার ৬৫টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৫ হাজার ৭১২ জন নিহত এবং ১৪ হাজার ১৪৩ জন আহত হয়েছে। বিপুলসংখ্যক মোটরসাইকেলের চলাচল, চালকদের একাংশের বেপরোয়া গতি ও ট্রাফিক আইন অমান্যের প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে পুলিশ। বিশেষ করে রাজধানীর ব্যস্ত সড়কগুলোতে উলটো পথে চলা, সংকেত অমান্য, ফুটপাত দিয়ে মোটরসাইকেল চালানো এবং যানবাহনের ফাঁক গলে ঝুঁকিপূর্ণভাবে এগিয়ে যাওয়ার প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে।

রাজধানীতে  ১৩ লাখের বেশি মোটরসাইকেল :বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের সংখ্যা ৪৯ লাখ ৯৭ হাজার ৯০টি। এর মধ্যে মে মাস পর্যন্ত ঢাকা মহানগরে নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের সংখ্যা ছিল ১৩ লাখ ২৫ হাজার ৩৯৪টি। তবে নিবন্ধিত সব মোটরসাইকেল প্রতিদিন সড়কে নামে না। আবার ঢাকার বাইরে নিবন্ধিত অনেক মোটরসাইকেলও রাজধানীতে চলাচল করে। ফলে প্রতিদিন ঢাকার সড়কে প্রকৃতপক্ষে কতটি মোটরসাইকেল চলাচল করছে, তার সুনির্দিষ্ট হিসাব পাওয়া কঠিন।

চালকদের বড় অংশ কিশোর ও তরুণ :সড়ক নিরাপত্তা ফাউন্ডেশনের হিসাবে, ২০২৫ সালে দেশে ৩ হাজার ২৯টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৬৭২ জন নিহত হন। সংস্থাটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক এ আই মাহবুব উদ্দিন আহমেদ বলেন, দেশের মোটরযানের প্রায় ৭১ শতাংশ মোটরসাইকেল। চালকদের বড় একটি অংশ কিশোর ও তরুণ। তাদের বেপরোয়া চালনা নিজেদের পাশাপাশি অন্যদেরও দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে ফেলছে। তার মতে, সড়ক পরিবহন খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও জবাবদিহির ঘাটতির কারণে সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। শুধু বৈঠক, কর্মশালা ও সুপারিশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; দুর্ঘটনা কমাতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

রাজধানীর সড়কে নিহতদের বড় অংশ পথচারী ও মোটরসাইকেল আরোহী :রাজধানীর সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যানও উদ্বেগজনক। সড়ক নিরাপত্তা ফাউন্ডেশনের হিসাবে, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ঢাকায় ১ হাজার ৮৪৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৩৮৪ জন নিহত এবং ২ হাজার ৪৮৮ জন আহত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ৫৩৬ জন মোটরসাইকেল আরোহী, যা মোট প্রাণহানির ৩৮ দশমিক ৭২ শতাংশ। একই সময়ে ৫৯২ জন পথচারী নিহত হয়েছে, যা মোট প্রাণহানির ৪২ দশমিক ৭৭ শতাংশ। বাকি ২৫৬ জন ছিল বাস, রিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশাসহ অন্যান্য যানবাহনের চালক ও আরোহী।

রাতে বাড়ে প্রাণহানির ঝুঁকি :দুর্ঘটনার সময় বিশ্লেষণেও ঝুঁকির চিত্র স্পষ্ট। ঐ সময়ে রাজধানীতে রাতে ৫১৯ জন নিহত হয়েছে, যা মোট প্রাণহানির ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ। সকালে নিহত হয়েছে ২৫৮ জন। দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত যানবাহনের মধ্যে ভারী পণ্যবাহী যান ছিল ৩৩ দশমিক ২৫ শতাংশ এবং মোটরসাইকেল ২৬ শতাংশ। রাত ১০টা থেকে ভোর পর্যন্ত ভারী যানবাহনের চলাচল, দীর্ঘ যানজটে চালকদের অধৈর্য আচরণ, ফুটপাত দখল এবং একই সড়কে ধীর ও দ্রুতগতির যানবাহনের চলাচল দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, মোহাম্মদপুর, কুড়িল বিশ্বরোড ও বিমানবন্দর সড়কের মতো এলাকায় ঝুঁকি কমাতে সড়কের ত্রুটি চিহ্নিত করা, ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা, নিরাপদ পারাপার নিশ্চিত করা এবং রাতের ভারী যানবাহনের চলাচল কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।

আইন সবার জন্য সমান :ডিএমপি কমিশনার : ট্রাফিক আইন প্রয়োগের বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ বলেছেন, ট্রাফিক আইন সবার জন্য সমান। সরকারি কর্মকর্তা, সাধারণ নাগরিক কিংবা পুলিশ সদস্য—কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নন। কোনো পুলিশ সদস্য আইন অমান্য করলেও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি। তবে রাজধানীতে উলটো পথে চলা, ট্রাফিক সংকেত অমান্য, ফুটপাত দিয়ে মোটরসাইকেল চালানো এবং যানবাহনের ফাঁক গলে ঝুঁকিপূর্ণভাবে এগিয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গিয়ে ট্রাফিক পুলিশকে বাড়তি চাপ সামলাতে হচ্ছে। প্রতিদিন কতটি মোটরসাইকেলের বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে কিংবা কোন ধরনের আইন লঙ্ঘনের ঘটনা বেশি ঘটছে, তার সমন্বিত হালনাগাদ পরিসংখ্যান প্রকাশ্যে নেই।