অবশেষে রাজধানীর শাহবাগের সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের জট খুলছে। হাসপাতালটি চলবে কোম্পানি আইনে। দ্রুতই আলাদা পরিচালনা পর্ষদ গঠন করে শুরু হবে জনবল নিয়োগ। করপোরেট ব্যবস্থায় চলবে এ হাসপাতাল। নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মীরা প্রাইভেট প্র্যাকটিস করতে পারবেন না। প্রসঙ্গত, প্রায় চার বছর অলস পড়ে থাকার পর অক্টোবরে চালু হতে যাচ্ছে দেড় হাজার কোটি টাকার এই হাসপাতাল। সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালের আদলে তৈরি করা হয় সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালটি। নির্মাণ শেষে বাংলাদেশ সরকারের কাছে এটি হস্তান্তর করে দক্ষিণ কোরিয়া। এর পরই শুরু হয় দুর্নীতি আর অব্যবস্থাপনা। ফলে প্রায় চার বছর ধরে অলস পড়ে থাকে দেড় হাজার কোটি টাকার হাসপাতালটি।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালটি চালু করতে নেওয়া হয় উদ্যোগ। এজন্য বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় আইন সংশোধন করা হয়। এটি এখন পরিচালনা করবে আলাদা বোর্ড অব ডিরেক্টরস, যেখানে থাকবেন হাসপাতাল পরিচালনায় অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা। হাসপাতালের ১০ শতাংশের মালিকানা সরকারের, আর ৯০ শতাংশের মালিক বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ)। প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হবেন উপাচার্য, ব্যবস্থাপনা পরিচালক একজন উপ-উপাচার্য, আর প্রধান নির্বাহী নেওয়া হবে বাইরে থেকে (যার করপোরেট হাসপাতাল পরিচালনার অভিজ্ঞতা আছে)।
পরিচালনা পর্ষদই গঠন করে দেবে নিয়োগ কমিটি। তাদের অধীনে শুরু হবে নতুন করে জনবল নিয়োগ। করপোরেট হাসপাতালের মতো এটি পরিচালনায় থাকবেন একজন প্রধান নির্বাহী, বেতন কাঠামো হবে আলাদা। প্রাইভেট প্র্যাকটিস করতে পারবেন না কেউ। বেতন ছাড়াও লভ্যাংশ পাবেন স্বাস্থ্যকর্মীরা। সব নিয়োগ হবে চুক্তিভিত্তিক।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘এই হাসপাতালকে দেশের করপোরেট হাসপাতালগুলোর মতো করে গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে। যাতে হাসপাতালটি সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক ও ভারতের উন্নত হাসপাতালগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারে। দেশে ভালো চিকিৎসকের অভাব নেই। কিন্তু কাক্সিক্ষত পরিবেশ না থাকায় অনেকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে চলে যান। এই হাসপাতালকে একটি ‘টেস্ট কেস’ হিসেবে নেওয়া হয়েছে। আমরা চাচ্ছি এটা একটা অলাভজনক করপোরেট হাসপাতাল হবে। করপোরেটরা চার্জ করে এবং সেখান থেকে মুনাফা করে, কিন্তু আমরাও চার্জ করব, যাতে কর্মীদের ভালো বেতন এবং সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পারি। সেই চার্জের মাত্রা সহনীয় পর্যায়ে থাকবে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালটির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘সুপার স্পেশালাইজড তো করপোরেট, মানে কোম্পানি আইনে চলবে। এটির মালিকানা ৯০ শতাংশ বিএমইউর অধীনে থাকবে, ১০ শতাংশ সরকারের। হাসপাতাল চালুর জন্য মন্ত্রণালয়ের একটি চিঠির অপেক্ষা করা হচ্ছে। সেটি পাওয়া গেলে কোম্পানি রেজিস্ট্রেশনের প্রক্রিয়া শুরু হবে। এরপর নিয়োগ কার্যক্রম শুরু হবে।’ তিনি আরও বলেন, সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে হাসপাতাল চালুর লক্ষ্য রয়েছে। এই দুই মাসের মধ্যেই প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।’
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালটি বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটির (বিএমইউ) অংশ। হাসপাতাল নির্মাণে সরকার ঋণ নিয়েছিল এবং সেই অর্থেই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। সরকার সেই ঋণ পরিশোধ করছে। ফলে হাসপাতালটিতে সরকারের বড় ধরনের বিনিয়োগ রয়েছে। তবে মালিকানা রয়েছে বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটির। আইনি পরিবর্তনের ভিত্তিতেই হাসপাতাল পরিচালনার জন্য নতুন কোম্পানি কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। আমরা নতুন স্ট্রাকচারে এটাকে স্বাধীনভাবে চলতে দিতে চাচ্ছি।
তিনি আরও বলেন, ‘নতুন কাঠামোর অধীনে হাসপাতালের জন্য নতুন করে জনবল নিয়োগ দেওয়া হবে। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রচলিত সরকারি নিয়োগ পদ্ধতির পরিবর্তে করপোরেট প্রতিষ্ঠানের মতো পদ্ধতি অনুসরণ করার পরিকল্পনা রয়েছে। সব নিয়োগই হবে চুক্তিভিত্তিক। চিকিৎসকদের বাইরে প্র্যাকটিস না করার শর্তে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি আলোচনা হচ্ছে। আমরা প্র্যাকটিস না করার অপশনটাই চিন্তা করছি, যাতে তারা ভালো বেতন এখান থেকেই পান। দেশের ভালো চিকিৎসকদের এখানে নিয়োগ দেওয়া হবে। অনেক রোগী ব্যাংকক, সিঙ্গাপুরে চিকিৎসার জন্য যান। সমাজের ওই অংশ দেশের হেলথ সিস্টেমেই যেন সেবাটা পান সেটা নিশ্চিত করতে চাই আমরা।’ উল্লেখ্য, ২০২২ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর হাসপাতালটির উদ্বোধন করা হয়। ৭৫৮ শয্যার এ হাসপাতালে রয়েছে ১০০ শয্যার আইসিইউ ইউনিট ও ১৪টি অত্যাধুনিক অপারেশন থিয়েটার। বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার জন্য রয়েছে লিভার, কিডনি ও কার্ডিয়াকসহ পাঁচটি বিশেষায়িত সেন্টার।