Image description

রাজধানীর মিরপুর-১ এর দারুস সালাম রোডের পাশে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের (এনএইচএ) শিল্প প্লট-১। প্রায় চার দশক আগে এখানে ছিল সিনেটন ফিল্ম স্টুডিও লিমিটেড। ১৯৮৬ সালে প্রতিষ্ঠানটি তৎকালীন শিল্প ব্যাংক থেকে ৭ কোটি টাকা ঋণ নেয়। ঋণের বিপরীতে তৎকালীন জাতীয় গৃহ সংস্থান অধিদপ্তরের কাছ থেকে ছয় বিঘা জমি লিজ নেওয়া হয়েছে দেখিয়ে তা বন্ধক দেওয়া হয়। কিন্তু সরকারি নথি বলছে, ওই জমির লিজই যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়নি। নির্ধারিত সময়ে ফি পরিশোধ না করায় বরাদ্দ বাতিল করে দেওয়া হয়। এরপরও ওই জমিকে কেন্দ্র করে ঋণ নেওয়া হয়। ঋণ পরিশোধ না করায় পরে সিনেটন ফিল্ম স্টুডিওকে দেউলিয়া ঘোষণা করা হয়। শুরু হয় জমি নিলামে বিক্রির প্রক্রিয়া। সেই নিলাম থেকে জমির দুই বিঘা কেনার দাবি করেন সোনারগাঁও ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী আলহাজ মো. আবুল হোসেন। অন্যদিকে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের দাবি, জমিটি সরকারি এবং সিনেটনের বৈধ লিজস্বত্বই ছিল না। এ নিয়ে মামলা, পাল্টাপাল্টি দখলের চেষ্টা ও সরকারি সংস্থার আপত্তি-সব মিলিয়ে প্রায় চার দশক ধরে ঝুলে আছে জমিটির মালিকানা ও দখলের বিরোধ। বিভিন্ন নথিপত্রে দেখা যায়, ২০০৭ সালে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সিনেটন ফিল্ম স্টুডিওকে বারবার তাগাদা দেওয়া হলেও প্রতিষ্ঠানটি যথাসময়ে লিজ দলিল সম্পন্ন করেনি। ফলে সরকার বরাদ্দপত্র বাতিল করে। লিজ সম্পন্ন না হওয়ায় জমি বন্ধক রাখার আবেদনও অনুমোদিত হয়নি।

১৯৮৮ সালের দুটি চিঠিতেও সরকারি সংস্থার সঙ্গে সিনেটনের বিরোধের চিত্র পাওয়া যায়। একটি চিঠিতে সাত দিনের মধ্যে প্লট-১ এর দখল বুঝিয়ে দিতে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এদিকে ঋণ পরিশোধ না করায় সিনেটন ফিল্ম স্টুডিওর বিরুদ্ধে দেউলিয়া মামলা হয়। নথিতে দেউলিয়া মোকদ্দমা নম্বর ৮৭/২০০০-এর উল্লেখ রয়েছে। ২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠানটিকে দেউলিয়া ঘোষণা করে মেসার্স একনাবীন অ্যান্ড কোং নামের চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস প্রতিষ্ঠানকে রিসিভার নিয়োগ করা হয়। সোনারগাঁও ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী আবুল হোসেন তার এক চিঠিতে বলেছেন, ২০০৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর তিনি রিসিভারের কাছ থেকে টেন্ডারের মাধ্যমে ছয় বিঘার মধ্যে দুই বিঘা জমি কেনেন। সঙ্গে ছিল সিনেটনের অফিস ও কারখানা ভবন। পরে ওই দুই বিঘার পৃথক নকশা করে দেওয়ার জন্য তিনি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন।

অনুসন্ধানে ২০০৮ সালের ২৭ এপ্রিল জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ঢাকা উপ-বিভাগ-১ এর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী হাবিবুর রহমানের একটি চিঠি পাওয়া যায়। সেখানে সোনারগাঁও ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের একটি ঠিকানা পাওয়া যায়। ওই ঠিকানা অনুযায়ী রাজধানীর শ্যামলীর ২ নম্বর রোডের ১১ নম্বর বাড়িতে সরেজমিন গেলে ওই প্রতিষ্ঠানের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। জানতে চাইলে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ঢাকা ডিভিশন-১ এর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (সিভিল) সাখাওয়াত হোসেন এ প্রতিবেদককে জানান, ওই প্রতিষ্ঠানের আসলে কোনো অস্তিত্ব নেই। তিনি যতদিন উপ বিভাগীয় প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত আছেন, ততদিনে ওই প্রতিষ্ঠানের কোনো ব্যক্তিকে তাদের অফিসে দেখেননি। তবে সরকারি জমি হাতিয়ে নেওয়ার চক্র হতে পারে এটি। দেউলিয়া আদালতের ২০০৬ সালের ফেব্রুয়ারির ৭৮ নম্বর আদেশে দুই বিঘা জমি ২০ ফুট রাস্তা রেখে সর্বোচ্চ দরদাতা সোনারগাঁও ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের কাছে ১ কোটি ২০ লাখ টাকায় বিক্রির নির্দেশ দেওয়া হয়। ছয় কিস্তির মধ্যে চার কিস্তিতে ৮০ লাখ টাকা রিসিভারের হিসাবে জমা পড়ে। বাকি ৪০ লাখ টাকা জমা না দিলে নিলাম বাতিল ও জামানত বাজেয়াপ্ত হওয়ার কথা বলা হয়। গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ২০০৯ সালের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, সোনারগাঁওয়ের চাওয়া অনুযায়ী দুই বিঘা জমির নকশা করলে তা পূর্বাচল ড্রিমসের রেজিস্ট্রিকৃত জমির কিছু অংশ এবং তাদের নির্মিত স্থাপনার ওপর পড়বে। এতে নতুন মামলা হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আদালত পূর্বাচল ড্রিমসের শান্তিপূর্ণ দখলে হস্তক্ষেপ না করার আদেশও দিয়েছিল। আর সিনেটন ও পূর্বাচল ড্রিমস, কেউই তাদের স্থাপনার জন্য রাজউকের অনুমোদিত নকশা দেখাতে পারেনি।

১৯৯২ সালে ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশের সহায়তায় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ প্লটটির দখল নেয়। তবে সিনেটনের কিছু মালামাল একটি ভবনে তালাবদ্ধ ছিল। পরে দেউলিয়া আদালতের নিয়োগ করা রিসিভার ও একটি ব্যাংকের লোকজন সেখানে ঢুকে নিজেদের তালা লাগান। ওই ঘটনায় গৃহায়নের কর্মকর্তারা মিরপুর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে।

২০০৮ সালের ৭ সেপ্টেম্বর রিসিভারের লোকজন জমি মাপতে গেলে গৃহায়নের কর্মকর্তারা বাধা দেন। তখন তাদের জানানো হয়, জমিটি সরকারি।

সোনারগাঁওয়ের স্বত্বাধিকারী আবুল হোসেন সরকারকে বিবাদী করে হাইকোর্টে রিট করেন, যার নম্বর ৪২৬৪/২০০৬। ২০০৬ সালের ২৮ আগস্ট রায় সরকারের বিপক্ষে যায়। পরে সরকার আপিল বিভাগে সিভিল পিটিশন ফর লিভ টু আপিল করে, যার নম্বর ১৪০২/২০০৬। ২০০৯ সালের সরকারি নথিতে সেখানে স্থিতাবস্থা বহাল থাকার কথা বলা হয়। ২০২০ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও মোহাম্মদপুর রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) পুলিশ নিয়ে প্লট-১/এ ও ১/বি এলাকায় যান দেউলিয়া মামলার দখল কার্যক্রমে সহায়তা করা। গৃহায়নের কর্মকর্তারা সেখানে গিয়ে সংস্থার বক্তব্য ও তাদের কাগজপত্র উপস্থাপন করেন। পরে ম্যাজিস্ট্রেট জায়গাটি নিজের তত্ত্বাবধানে সিলগালা করেন।

এরপর ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে সোনারগাঁও ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের পক্ষ থেকে কয়েকজন ব্যক্তি আবার জায়গাটি দখলের চেষ্টা করেন বলে গৃহায়নের কর্মকর্তারা অভিযোগ করেন। পরে তারা দারুস সালাম থানায় জিডি করে এবং সেখানে নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করে।

২০২৪ সালের জানুয়ারিতে দারুস সালাম থানার তৎকালীন ওসি নজরুল ইসলাম ওই জিডির বিষয়ে একটি প্রতিবেদন দেন। সেখানে ১৯৮৬ সালে শিল্প ব্যাংক থেকে সিনেটনের ৭ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া, ছয় বিঘা জমি বন্ধক দেখানো, পরে লিজ বাতিল এবং ঋণ পরিশোধ না করার বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়। পরে সিনেটনকে দেউলিয়া ঘোষণা করে জমিটি নিলামে তোলা হয়।

তৎকালীন জাতীয় গৃহ সংস্থান অধিদপ্তর বর্তমানে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ এবং শিল্প ব্যাংক বর্তমানে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক।

মিরপুরের এই জমির অনুসন্ধানের মধ্যেই ময়মনসিংহের ভালুকায় প্রায় ১৬ একর সরকারি খাসজমি দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে ভোগদখলে রাখার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ভালুকার বিরুনিয়া ইউনিয়নের কংশেরকুল ও চান্দরাটি মৌজায় এসব জমির অবস্থান। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, মৃত খোরশেদ আলমের দুই ছেলে রবিউল আলম ও ফটিক মিয়া জমিগুলো নিয়ন্ত্রণ করছেন। স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির ছত্রছায়ায় তাঁরা সরকারি জমির দখল ধরে রেখেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। অনুসন্ধানে ১৯৭৭ সালের একটি ডুপ্লিকেট কার্বন রসিদ পাওয়া গেছে। সেখানে সুরত আলীসহ ১৭ জন লিজগ্রহীতার নাম রয়েছে।  স্থানীয়দের অভিযোগ, ওই লিজগ্রহীতাদের নামে থাকা বকেয়া অর্থ গোপনে পরিশোধ করে ভূমি-সংক্রান্ত কাগজপত্র নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। এ কাজে উপজেলা ভূমি অফিস ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ের কোনো কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশ রয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

তবে ভালুকায় সরকারি জমি দখলের ঘটনা নতুন নয়। ২০২৪ সালের ১ জুন উপজেলা প্রশাসন অভিযান চালিয়ে প্রায় ২০ একর সরকারি খাসজমি উদ্ধার করে। প্রশাসনের হিসাবে ওই জমির আনুমানিক মূল্য ছিল প্রায় ২০০ কোটি টাকা।

এর আগে ২০২২ সালে হবিরবাড়ী ইউনিয়নের জামিরদিয়া মৌজায় সরকারি খাসজমিতে বাড়ি নির্মাণের অভিযোগে মামলা হয়েছিল।

মিরপুরের ছয় বিঘা জমির চার দশকের বিরোধ এবং ভালুকার ১৬ একর খাসজমি দখলের অভিযোগ- এই দুই ঘটনাই সরকারি সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা ও নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা।