Image description

লোকোমোটিভ বা ইঞ্জিন সংকট ও চরম অব্যবস্থাপনার কারণে বাংলাদেশ রেলওয়ের পণ্য পরিবহনব্যবস্থা মুখ থুবড়ে পড়েছে। যাত্রী পরিবহনের তুলনায় পণ্য পরিবহন তিন গুণ লাভজনক হওয়া সত্ত্বেও এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হচ্ছে কর্তৃপক্ষ। গত তিন বছরে রেলের কনটেইনার পরিবহন থেকে আয় কমেছে প্রায় ২৪ শতাংশ। ফলে রেলওয়ের পণ্য পরিবহনে বড় বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। ইঞ্জিন সংকটের কারণে পণ্য পরিবহনে চাহিদার অর্ধেক ট্রেনেরও জোগান দিতে পারছে না রেল কর্র্তৃপক্ষ।

রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৮০ হাজার ৭১৯টি ওয়াগনে পণ্য পরিবহন করা হলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ৫৪ হাজার ৫৬৯টিতে। এর প্রভাব পড়েছে সরাসরি আয়েও। গত তিন বছরে এ খাতে আয় কমেছে ২৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ। বিশেষ করে চলতি অর্থবছরের জুলাই মাসে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। কমলাপুর ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোর (আইসিডি) তথ্য অনুযায়ী, আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় জুলাইয়ে বিল অব এন্ট্রি ৩৩ শতাংশ, কনটেইনার পরিবহন ৪৭ শতাংশ, আমদানি পণ্য ৫৮ শতাংশ এবং রাজস্ব আদায় প্রায় ৩১ শতাংশ কমেছে। রেলওয়ে সংশ্লিষ্টদের মতে, চাহিদার তুলনায় লোকোমোটিভের মারাত্মক ঘাটতিই এ বিপর্যয়ের মূল কারণ। যাত্রীবাহী ট্রেন সচল রাখতে অগ্রাধিকার দেওয়ায় পণ্যবাহী ট্রেন পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত ইঞ্জিন বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন বলেন, ‘লোকোমোটিভের স্বল্পতার কারণেই চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটে কনটেইনার ট্রেন আগের মতো পরিচালনা করা যাচ্ছে না। ইঞ্জিন সংকটে যাত্রীবাহী ট্রেন বন্ধ রাখা সম্ভব নয়। তাই প্রথমে যাত্রীবাহী ট্রেন পরিচালনার জন্য লোকোমোটিভ বরাদ্দ দিতে হয়। এরপর যা থাকে তা দিয়েই কনটেইনার ট্রেন চালাতে হচ্ছে। প্রতিদিন কনটেইনার ট্রেন পরিচালনায় তিন থেকে চারটি লোকোমোটিভের প্রয়োজন হয়। কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী লোকোমোটিভ দেওয়া সম্ভব হয় না। তাই পণ্য পরিবহন কিছুটা কমে গেছে।’

জানা গেছে, পর্যাপ্ত ট্রেন না পাওয়ায় চট্টগ্রাম বন্দর ও কমলাপুর আইসিডির মধ্যে কনটেইনার জট তীব্র আকার ধারণ করেছে। বাধ্য হয়ে ব্যবসায়ীরা ব্যয়বহুল বিকল্প সড়ক ও নৌপথ বেছে নিচ্ছেন। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, মাসে ৯০টি ট্রেনের চাহিদা থাকলেও মে, জুন ও জুলাই মাসে যথাক্রমে ৩২টি, ৪৪টি এবং ৩৬টি ট্রেন সরবরাহ করা হয়েছে। সময়মতো পণ্য খালাস ও কনটেইনার পুনর্বিন্যাস না করায় আমদানিকারক ও শিপিং এজেন্টদের বাড়তি খরচ গুনতে হচ্ছে। এতে অনেক শিপিং লাইন বিকল্প বন্দর ব্যবহারের কথা ভাবছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে এবং আমদানি-বাণিজ্য ও সরকারি রাজস্ব সুরক্ষিত রাখতে দ্রুত লোকোমোটিভ সংকট নিরসন করে নিয়মিত ট্রেন চালুর দাবি জানিয়েছেন বন্দর কর্তৃপক্ষ ও ব্যবসায়ীরা।

কমলাপুর রেলওয়ে আইসিডির কমিশনার (কাস্টম) কাজী মুহাম্মদ জিয়াউদ্দীন বলেন, ইঞ্জিন সংকটের কারণে নিয়মিত পণ্যবাহী ট্রেন না আসায় ব্যবসায়ীরা বাধ্য হয়ে নৌ ও সড়কপথে পণ্য পরিবহন করছেন। এর ফলে কনটেইনার পরিবহনের পাশাপাশি রাজস্ব আদায়ও কমেছে।

কমলাপুর আইসিডি সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাইয়ের তুলনায় চলতি অর্থবছরের জুলাইয়ে সব সূচকেই নেতিবাচক হয়েছে। এর মধ্যে বিল অব এন্ট্রি ৩৩ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ, কনটেইনার পরিবহন ৪৭ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ, আমদানি পণ্য ৫৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ, শুল্কায়নযোগ্য মূল্য ৩১ দশমিক ৩৯ শতাংশ এবং রাজস্ব আদায় ৩১ দশমিক ৮৪ শতাংশ কমেছে।

গত জুলাইয়ে পণ্যের বিল অব এন্ট্রি হয়েছে ৫৫০টি, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৮২২টি। কনটেইনার পরিবহন ১ হাজার ৫৭৯টি থেকে কমে ৮৩৬টিতে নেমেছে। ২৬ হাজার ৪১০ টনের পরিবর্তে পণ্য আমদানি হয়েছে ১ হাজার ৯৪২ টন। শুল্কায়নযোগ্য মূল্য ৬৪০ কোটি টাকা থেকে কমে হয়েছে ৪৩৯ কোটি টাকা। আর রাজস্ব আদায় ২৯৩ কোটি ৮৩ লাখ টাকা থেকে নেমে হয়েছে ২০০ কোটি ২৬ লাখ টাকা।

গত তিন বছরের কনটেইনার পরিবহনের আয় নিয়ে রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৭ লাখ ৯০ হাজার ৫৩৬ মেট্রিক টন পণ্য পরিবহন করে ৮০ হাজার ৭১৯টি ওয়াগন থেকে আয় হয় ১১৪ কোটি ৬৯ লাখ ৩৮ হাজার ৬১৮ টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৭ লাখ ৭ হাজার ২৩ মেট্রিক টন পণ্য পরিবহন করে ৬৩ হাজার ১০০টি ওয়াগন থেকে আয় হয় ৭৬ কোটি ২৮ লাখ ৩৮ হাজার ২৮৭ টাকা। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৫ লাখ ৫৮ হাজার ৫৯৭ মেট্রিক টন পণ্য পরিবহন করে ৫৪ হাজার ৫৬৯টি ওয়াগন থেকে আয় হয় ৮৭ কোটি ৬৭ লাখ ৪ হাজার ১০৫ টাকা। চলতি অর্থবছরে রেলওয়ের কনটেইনার পরিবহনের অবস্থা খুবই শোচনীয় বলে জানিয়েছেন রেলওয়ের কর্মকর্তারা।

পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মামুনুল ইসলাম বলেন, চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটে প্রতিদিন প্রায় ১৫টি মিটারগেজ ইঞ্জিনের চাহিদা থাকলেও তিন-চারটিও দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ইঞ্জিনের ব্যবস্থা করা গেলে যাত্রী ও পণ্য-দুই খাতেই আয় বাড়বে। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ডেপুটি ট্রাফিক ম্যানেজার (আইসিডি, কমলাপুর) মোহাম্মদ আশরাফ করিম চৌধুরী বলেন, ‘কমলাপুর আইসিডিতে কনটেইনার পরিবহন কমে যাওয়ার মূল কারণ রেলওয়ের ইঞ্জিন সংকট। এ সমস্যা সমাধানে রেল কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আশানুরূপ সমাধান হয়নি। আমাদের চাহিদা মাসে ৯০টি কনটেইনার ট্রেন। সেখানে ৬০টি দেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। কিন্তু মাসে ৩০টি কনটেইনার ট্রেনও আসে না।’