Image description

সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী রেদোয়ান আহমেদ ও তার স্ত্রী মমতাজ আহমেদের বিরুদ্ধে ২০০৭ সালের ১৯ ডিসেম্বর রমনা থানায় মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মামলাটি তদন্ত শেষে ২০০৮ সালের ৭ জুলাই চার্জশিট বা অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। এতে তাদের বিরুদ্ধে ১ কোটি ৯ লাখ ৭৯ হাজার ১১ টাকার সম্পদ গোপন ও ৪ কোটি ৫ লাখ ২৪ হাজার ৫১১ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার কথা জানায় দুদক। দুর্নীতির মামলার চার্জশিট পাওয়ার পর আইনে ৬০ কার্যদিবসে বিচার শেষ করার বিধান রয়েছে। তবে রেদোয়ানের বিরুদ্ধে হওয়া মামলায় চার্জশিট দাখিলের পর পেরিয়ে গেছে প্রায় ১৯ বছর, এখনো মামলাটির বিচার শেষ হয়নি। এমনকি গুলনাহার বেগম নামে এক গৃহিণীর দুর্নীতির মামলার বিচারও এক দশক ধরে ঝুলে আছে।

দুদকের মামলার বিচার দ্রুত শেষ করতে ১৯৫৮ সালের ‘দ্য ক্রিমিনাল ল অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট’ অনুযায়ী বিশেষ জজ আদালত স্থাপন করে সরকার। এ আইনের ৬(ক) ধারা অনুযায়ী, দুর্নীতি মামলা আমলে নেওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করার কথা। এ ছাড়া ২০১৬ সালের ৯ নভেম্বর দুদকের মামলার বিচারের ক্ষেত্রে ৬০ দিনের বিধান পালনে সার্কুলার জারি করেন সুপ্রিম কোর্ট। কিন্তু ৬০ দিন তো দূরের কথা, দেড় যুগেও স্ত্রীসহ সাবেক প্রতিমন্ত্রী রেদোয়ানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলার বিচার শেষ হয়নি। আইনে উল্লিখিত বিধান ও সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা শুধু কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।

রেদোয়ানের মামলাটি বর্তমানে ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-১০-এ বিচারাধীন। মামলার চার্জশিটভুক্ত ৩৫ সাক্ষীর মধ্যে ২৩ জনের সাক্ষ্য শেষ হয়েছে। পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য আগামী ২৯ অক্টোবর দিন ধার্য রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট আদালতের পেশকার রবিউল আলম।

জানা যায়, মামলাটির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে রিট করেন রেদোয়ান আহমেদ। এরপর মামলাটি হাইকোর্টে স্থগিত ছিল। ২০২২ সালের ৯ মার্চ সেই রিট আবেদন খারিজ করে দেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে এক বছরের মধ্যে মামলাটি নিষ্পত্তির নির্দেশনাও দেওয়া হয়। এরপর সাড়ে চার বছর পেরিয়ে গেলেও হাইকোর্টের সেই নির্দেশনা মানা হয়নি। মামলা নিষ্পত্তি করা যায়নি এখনো।

বিচার কার্যক্রম শেষ না হওয়ার বিষয়ে এ মামলার রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী দুদকের পাবলিক প্রসিকিউটর শাহ মো. নাজমুজ সাকিব কালবেলাকে বলেন, ‘আমি গত বছর নিয়োগ পেয়েছি। আমাদের কোর্টে দীর্ঘদিন বিচারকও ছিলেন না। তবে মামলাটির সাক্ষ্য গ্রহণ প্রায় শেষের দিকে। সাক্ষীরা হাজির হচ্ছেন। আশা করছি, মামলাটির বিচার দ্রুত শেষ হবে।’

রেদোয়ানের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ দুদকের: রেদোয়ান ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলার সময় দুদক প্রথমে ২ কোটি ৩০ লাখ ৯৭ হাজার টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন ও ১ কোটি ৩৬ লাখ ৫৫ হাজার ৮২৮ টাকার সম্পদ গোপনের অভিযোগ আনে। মামলাটি তদন্ত করে অভিযোগপত্র দেন দুদকের সহকারী পরিচালক শাহীন আরা মমতাজ। অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, ‘রেদোয়ান আহমেদ তার দাখিলকৃত সম্পদ বিবরণীতে তিনটি বাড়ির ভবনাদি কাঠামো এবং সাজসরঞ্জামের মূল্য বাবদ ৬৮ লাখ ৬০ হাজার ৫৯১ টাকা উল্লেখ করেন। কিন্তু গণপূর্তের পরিমাপে ওই তিনটি ভবনের প্রকৃত নির্মাণ ব্যয় এসেছে ১ কোটি ৪৩ লাখ ৫২ হাজার ৩৮৫ টাকা। অর্থাৎ ৭৪ লাখ ৯১ হাজার ৭৯৪ টাকা সম্পদের মূল্য গোপন করে মিথ্যা তথ্য প্রদান করা হয়েছে। এ ছাড়া, সম্পদবিবরণীতে দুটি গাড়ির কথা উল্লেখ করা হলেও ২৪ লাখ ৮৭ হাজার ২১৭ টাকা ক্রয়ে আরও দুটি গাড়ির তথ্য গোপন করা হয়েছে বলে তদন্তে জানায় দুদক। তবে জিজ্ঞাসাবাদে রেদোয়ান দুদককে জানান, সম্পদবিবরণী দাখিলের আগে সেই গাড়ি দুটি বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল। তবে দুদক জানায়, বিআরটিএ থেকে রেকর্ড অনুসারে গাড়ি দুটির স্বত্ব তাদের নামেই রয়েছে। এ ছাড়া রেদোয়ানের নামে আরেকটি গাড়ির সন্ধান পেলেও সেটা দুষ্কৃতকারীরা ২০০৬ সালে পুড়িয়ে ফেলেছেন বলে দুদককে জানান রোদোয়ান।

অন্যদিকে, দুদকের তদন্তে উঠে আসে, কুমিল্লার চান্দিনার পৌর মার্কেটে রেদোয়ানের পরিবারের সদস্যদের নামে ৮ লাখ ৫০ হাজার টাকার পাঁচটি দোকানের তথ্য তিনি গোপন করেন। এ ছাড়া রেদোয়ানের স্ত্রী মমতাজের নামে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে ২০০২ সালের ৩ জুলাই রাজউকের চেয়ারম্যান বরাবর আবেদন করে দেড় লাখ টাকা জমা দিয়ে ২০ লাখ টাকার ১০ কাঠার একটি প্লট বরাদ্দ নেওয়া হয়, যার তথ্য গোপন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করে দুদক।

অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, রেদোয়ান আহমেদ অবৈধভাবে অর্জিত অর্থকে বৈধ করার হীন মানসে তার ১৩ বছরের অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলে সুলতান মঈন আহমেদের নামে আয়কর নথি খোলেন। এরপর ১৯৯১-৯২ কর বছরের আয়কর নথিতে ৪৫ ভুয়া আত্মীয়স্বজনের নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে এফিডেভিটের মাধ্যমে অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলের নামে ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা দান হিসেবে দেখান। এরপর ছেলের আয়কর নথির মাধ্যমে তার ও স্ত্রীর নামে ২ কোটি টাকা দান ও ২০ লাখ টাকা ঋণ দেখান। কিন্তু অপ্রাপ্তবয়স্ক একটি ছেলের হঠাৎ করে বিপুল অর্থের মালিক হওয়া ও দান-ঋণের তথ্য একেবারেই মিথ্যা বানোয়াট।

অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, দুদকের সম্পদবিবরণীতে মৎস্য খাত থেকে ৮২ লাখ ৪৮ হাজার ৫০০ টাকা আয় দেখানো হয়। তবে বাস্তবে তার মালিকানাধীন জমিতে ১২টি পুকুর দেখা গেলেও কোনো মৎস্য খামার বা বিজ্ঞানসম্মত মৎস্য চাষের কোনো আলামত দেখা যায়নি। সেসব পুকুর থেকে সনাতন পদ্ধতিতে ৩-৪ লাখ টাকার মাছ উৎপাদন হতে পারে। সার্বিক তদন্তে রেদোয়ান ও তার স্ত্রী মমতাজের বিরুদ্ধে ৪ কোটি ৫ লাখ ২৪ হাজার ৫১১ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন ও ১ কোটি ৯ লাখ ৭৯ হাজার ১১ টাকার সম্পদ গোপনের প্রাথমিক সত্যতা পায় দুদক। তাই তাদের বিরুদ্ধে দুদক আইনের ২৬(২) ও ২৭(১) ধারা ও দণ্ডবিধির ১০৯ ধারায় অভিযোগ আনা হয়।

বিচারাধীন দুর্নীতির মামলা মাথায় নিয়ে নির্বাচন: রেদোয়ান আহমেদ ১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টি থেকে প্রথম সংসদ সদস্য ও পরে ১৯৯১ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচিত হন। ২০০১ সালে বিএনপি সরকারের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান রেদোয়ান আহমেদ। ২০০৬ সালে বিএনপি ছেড়ে যোগ দেন অলি আহমদের দল লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টিতে (এলডিপি)। এরপর মুক্তিযোদ্ধাদের ৫০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুদকের আরেক মামলায় ২০২৩ সালের ১৪ আগস্ট রেদোয়ান আহমেদকে তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেন ঢাকার ২ নম্বর বিশেষ জজ আদালত। জুলাই আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে রেদোয়ান আহমেদ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এলডিপির মহাসচিব পদ থেকে পদত্যাগ করে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজের আগের দল বিএনপিতে ফিরে আসেন। পরে কুমিল্লা-৭ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করলেও স্বতন্ত্র প্রার্থীর (বিএনপির বিদ্রোহী) কাছে পরাজিত হন। বিচারাধীন দুর্নীতির মামলা মাথায় নিয়েই এ নির্বাচন করেন তিনি।

এক দশক ধরে ঝুলছে গৃহিণীর বিরুদ্ধে করা দুদকের মামলা: শুধু রেদোয়ান আহমেদের মামলাই নয়, দুদকের আরও অনেক মামলা বছরের পর বছর ধরে আদালতে ঝুলে আছে। এর মধ্যে ১০ বছর ধরে বিচারাধীন রয়েছে অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র সহকারী সচিবের স্ত্রী গুলনাহার বেগমের বিরুদ্ধে দুদকের একটি মামলা। পেশায় গৃহিণী গুলনাহারের নামে ১ কোটি ৩৬ লাখ ২০ হাজার ২৮৮ টাকার বৈধ সম্পদের উৎস না থাকায় ২০২৬ সালের ৯ নভেম্বর রাজধানীর রমনা থানায় মামলা করেন দুদকের উপসহকারী পরিচালক সিলভিয়া ফেরদৌস। গুলনাহার এ অর্থ স্বামীর বেতন, কৃষি আয় থেকে সঞ্চয়, পোলট্রি খামার থেকে আয় ও ছেলের বৈদেশিক অর্থ থেকে প্রাপ্ত দাবি করলেও দালিলিক কোনো প্রমাণ দাখিল করতে না পারার কারণে ২০১৭ সালের ৫ অক্টোবর অভিযোগপত্র দাখিল করে দুদক।

পরের মাসে ২৮ নভেম্বর আদালত আসামির বিরুদ্ধে চার্জশিট আমলে নিলে এর বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রিভিশন মামলা করে আসামিপক্ষ। চার্জ শুনানির জন্য তিনবার সময় নেন আসামি। পরে গুলনাহার বেগমের বিরুদ্ধে ২০১৮ সালের ৫ মার্চ চার্জ গঠন করে বিচার শুরু করা হয়। আদেশে বলা হয়, রিভিশন মামলার শুনানি কবে শেষ হবে, তার নিশ্চয়তা নেই। তা ছাড়া ফৌজদারি কার্যবিধির সংশোধন আইন ১৯৫৮-এর ৬ক (১) ও (২) অনুসারে দুর্নীতির মামলা ৬০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। চার্জ গঠন করার পর সাক্ষীদের সমন দেওয়া হয়। ২০১৮ সালের ৮ এপ্রিল সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য করা হলেও সাক্ষ্য গ্রহণ হয়নি। লিভ টু আপিলের আদেশ দাখিলের নামে বারবার সময় পেছানো হয়েছে। সর্বশেষ চলতি বছরের ২২ সেপ্টেম্বর ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-১০-এ মামলার তারিখ ছিল। কিন্তু লিভ টু আপিলের আদেশ দাখিল না হওয়ায় নতুন দিন ধার্য হয়েছে।

যা বলছে টিআইবি: এদিকে ৬০ দিনে দুর্নীতির মামলার বিচার শেষ করতে না পারার বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান কালবেলাকে বলেন, ‘এটা খুব বাস্তবসম্মত বিধান নয়। তবে এটা আদর্শ, প্রত্যাশার জায়গা থেকে ঠিক আছে। দুর্নীতির মামলা আমাদের মতো পৃথিবীর সব দেশেই জটিল। এ ছাড়া আমাদের বিচারিক প্রক্রিয়াতেও দুর্বলতা আছে। দুদকের কাজ মামলা কোর্ট পর্যন্ত বিচারের জন্য নিয়ে যাওয়া। এরপর সেটা আদালতের ওপর নির্ভর করে। আমাদের দেশে মামলার তুলনায় বিশেষ আদালত নেই। যে আদালতগুলো আছে সেখানে গতিশীলতার ঘাটতি আছে। মামলাগুলো যেন দ্রুত শেষ হয়—সেটাই প্রত্যাশা।’