Image description

কক্সবাজার শহর থেকে মেরিন ড্রাইভ সড়ক ধরে এগোলে ১২ কিলোমিটার দূরে হিমছড়ি সৈকত। সড়কের এক পাশে সমুদ্রের বিশাল নীল জলরাশি, অন্য পাশে ছোট ছোট সবুজ পাহাড়ের সারি। মেরিন ড্রাইভের পাশ ঘেঁষে সবুজ গাছগাছালির মধ্যে লাল রঙের দেয়াল এবং লাল টালির ছাদের নিচে ছোট ছোট ভবন নিয়ে গড়ে উঠেছে একটি রিসোর্ট। নাম ‘মেরিনা বিচ ভিলাস রিসোর্ট’।

সমুদ্রের বিশালতার পরশ পেতে যে রিসোর্টে যাওয়ার কথা ছিল ভ্রমণপিয়াসিদের, সেখানেই ঘাঁটি গেড়েছিল এক ভয়ংকর আন্তর্জাতিক প্রতারক চক্র। তারা পুরো রিসোর্ট ভাড়া নিয়ে এর প্রতিটি কোনাকে উচ্চ প্রযুক্তির সরঞ্জামে সাজিয়ে নিয়েছিল নিজেদের মতো করে। সেখানে কাজ করতেন বিশেষজ্ঞ স্ক্যামারসহ কয়েক শ বিদেশি। কক্সবাজারের উখিয়ায় মেরিন ড্রাইভের ইনানী ও সোনারপাড়ায় আরও দুটি রিসোর্ট এবং চট্টগ্রামের খুলশীতে একটি ভবন ভাড়া নিয়ে সেখানেও থাকতেন এই চক্রের সদস্যরা।

পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি), কক্সবাজার জেলা পুলিশ, সিআইডি ও সিআইডি সদর দপ্তরের সাইবার পুলিশ সেন্টার সূত্রে জানা গেছে, চার দেশ থেকে তাড়া খেয়ে বাংলাদেশে আসা এই চক্রে ছিল চীনাদের নেতৃত্বে আরও কয়েকটি দেশের অন্তত ৪০০ নাগরিক। চক্রের টার্গেট ছিলেন ভারতসহ নয়টি দেশের ধনী ব্যক্তি ও সচ্ছল নারীরা। সন্ধান পাওয়ার আগে গত ফেব্রুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কয়েক মাসে চক্রটি প্রতারণার মাধ্যমে ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে কয়েক মিলিয়ন মার্কিন ডলার হাতিয়ে নিয়েছে।

অন্য একটি দেশের গোয়েন্দাদের তথ্যের ভিত্তিতে অনুসন্ধান চালিয়ে গত সেপ্টেম্বরে এই চক্রকে শনাক্ত করে পুলিশ। অভিযানে কক্সবাজার থেকে ৬ জন এবং চট্টগ্রাম থেকে ৬৩ জন বিদেশি গ্রেপ্তার হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে উচ্চপ্রযুক্তির বিভিন্ন সরঞ্জাম। এ ঘটনায় মামলাও হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বাংলাদেশে বসে চীন ও তাইওয়ানের এসব স্ক্যামার টার্গেট করেছিল মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, মালয়েশিয়া, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, মালদ্বীপ, ভিয়েতনাম ও ভারতের ধনী এবং সচ্ছল নারীদের। নামী কোম্পানির কর্মকর্তা এবং পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের ধনাঢ্য ব্যবসায়ীরাও ছিলেন তাদের টার্গেট। বাংলাদেশে বসে প্রতারণা চালালেও চক্রটির সদস্যদের কেউই বাংলাদেশি নন।

চক্রটি সম্পর্কে যেভাবে জানা গেল

সূত্রগুলো বলছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর ও ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে কয়েক শ চীনা নাগরিক বাংলাদেশে আসেন। তাঁদের অধিকাংশই আসেন ভিসা অন অ্যারাইভাল সুবিধায় (দেশে ঢোকার পর ভিসা নেওয়া)। প্রথমে ঢাকার উত্তরায় কিছুদিন অবস্থান করে কয়েকজন কক্সবাজারে চলে যান। সেখানে উখিয়ার মেরিন ড্রাইভের ইনানী ও সোনারপাড়ায় ড্রিম হলিডে রিসোর্ট, অর্কিড ব্লু হোটেল ও চট্টগ্রামের ইলিয়াস ব্রাদার্স নামের একটি ভবন ছয় মাসের জন্য ভাড়া নিয়ে থাকতে শুরু করেন। অফিস হিসেবে বেছে নেন কক্সবাজারের হিমছড়ির সাগরপাড়ের প্রায় পাঁচ বিঘা জায়গাজুড়ে স্থাপিত মেরিনা বিচ ভিলাস রিসোর্টকে। এই রিসোর্টকে তাঁরা নিজেদের মতো করে বদলে নিয়ে উচ্চপ্রযুক্তির জগৎ বানিয়ে ফেলেন।

পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, মেরিনা বিচ ভিলাস রিসোর্ট থেকে চক্রটি প্রতারণা করতে ভারতীয় কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নাগরিককে টার্গেট করে। তাদের স্ক্যামিংয়ের শিকার কয়েকজন ভারতীয় বিষয়টি সে দেশের সরকারের সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে জানান। পরে ভারতীয় সাইবার তদন্তকারীরা অনুসন্ধান করে জানতে পারেন, প্রতারণার সঙ্গে জড়িত চক্রটির অবস্থান বাংলাদেশে। বিষয়টি তাঁরা বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে জানান।

খোঁজ নিতে গিয়ে দেশের গোয়েন্দারা জানতে পারেন, কক্সবাজারের চারটি রিসোর্টে ২০০ থেকে ২৫০ জন বিদেশি নাগরিক অবস্থান করছেন। খবর পেয়ে গত মার্চের শুরু থেকে চীনা নাগরিকদের কর্মকাণ্ড নজরদারিতে রাখতে শুরু করে পুলিশের গোয়েন্দা শাখা এসবি। তাদের তদন্তে উঠে আসে, চীনা নাগরিকেরা কর্মসংস্থান ভিসা বা ই-ভিসায় এসেছেন। ইমিগ্রেশন অ্যান্ড পাসপোর্ট অধিদপ্তর (ডিআইপি) চীনাদের বাংলাদেশে আসার বিষয়টি জানলেও এসবির ফরেন ডেস্ক বা বিদেশি সহায়তা সেল তা জানত না। নিয়ম অনুযায়ী, বাংলাদেশে আসার পর বিদেশি নাগরিকদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এসবিতে নিবন্ধন করতে হয়।

মেরিনা বিচ ভিলাস রিসোর্টের ডাইনিং হল ভেঙে আরও তিনটি কক্ষ যুক্ত করে তৈরি হয় এই জায়গা। সারি সারি কম্পিউটার বসিয়ে এখানে কাজ করতেন প্রতারক চক্রের সদস্যরা (বাঁয়ে)। রিসোর্টের আরেক ভবনে চারপাশে তোশক লাগিয়ে তৈরি করা হয় শব্দনিরোধক ছোট ছোট কক্ষ। ছবি: আজকের পত্রিকা
মেরিনা বিচ ভিলাস রিসোর্টের ডাইনিং হল ভেঙে আরও তিনটি কক্ষ যুক্ত করে তৈরি হয় এই জায়গা। সারি সারি কম্পিউটার বসিয়ে এখানে কাজ করতেন প্রতারক চক্রের সদস্যরা (বাঁয়ে)। রিসোর্টের আরেক ভবনে চারপাশে তোশক লাগিয়ে তৈরি করা হয় শব্দনিরোধক ছোট ছোট কক্ষ। ছবি: আজকের পত্রিকা

বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশি নাগরিকদের পাসপোর্ট ও ভিসার কপি জেলা বিশেষ শাখায় দেওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু কক্সবাজারের রিসোর্টে অবস্থানকারী চীনা ও তাইওয়ানের নাগরিকদের পাসপোর্ট ও ভিসার কপি জমা দেওয়া হয়নি। বিদেশিদের হোটেল-রিসোর্ট ভাড়া দেওয়ার তথ্যও জেলা এসবিকে জানায়নি মালিকপক্ষ।

সন্দেহ বাড়লে এসবি গত আগস্টের দিকে কক্সবাজারের হোটেল-রিসোর্টগুলোর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে। ড্রিম হলিডে হোটেলের ম্যানেজার এমদাদুল হক, অর্কিড-ব্লু হোটেলের ম্যানেজার সঞ্জয় রায় এবং মেরিনা বিচ রিসোর্টের মালিক শোয়েব আলী প্রাথমিকভাবে জানান, প্রতিটি হোটেলে ২০ থেকে ২৫ জন চীনা নাগরিক আছেন। এগুলো একটি চীনা প্রতিষ্ঠান ভাড়া নিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি হোটেলগুলোর পুরোনো সেটআপ পরিবর্তন করে নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী কক্ষ ও শয্যা স্থাপন করেছে।

পুলিশ জানতে পারে, বাবর আলী নামের পরিচিত এক চীনা নাগরিক এবং অর্কিড-ব্লু হোটেলের ম্যানেজার সঞ্জয় রায় যৌথভাবে তিনটি হোটেল-রিসোর্ট ভাড়া নেওয়ার বিষয়ে মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করেন। তবে ভাড়ার চুক্তি করা হয় চীনা নাগরিক পাই লেডিংয়ের সঙ্গে। উ ওয়েইপিং নামের আরেক চীনা নাগরিক ‘জিন শিন কনস্ট্রাকশন কোম্পানি’র মালিক হিসেবে পরিচয় দেন। বাংলাদেশে একটি নির্মাণ কোম্পানি প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া চলার দাবি করেছিলেন তিনি।

গ্রেপ্তার যেভাবে, জব্দ তালিকা দেখে পুলিশের বিস্ময়

পুলিশ ওই রিসোর্টে অবস্থানরত চীনা নাগরিকদের পাসপোর্ট ও ভিসার কপি চাইলে তা নেই বলে জানায় হোটেল-রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ। পরে চক্রটির সঙ্গে জড়িত একজনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রাথমিকভাবে ২৫ চীনা নাগরিকের তালিকা দেন। এরপর বিভিন্ন অজুহাতে তথ্য দিতে কালক্ষেপণ করা হয়। পরে গত ২৩ আগস্ট হোটেল-রিসোর্ট মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করে পুলিশ বিদেশি নাগরিকদের তথ্য জেলা পুলিশকে দেওয়ার আইনগত বাধ্যবাধকতা জানায়। এরপর তিনটি হোটেলে থাকা ১৮০ চীনা নাগরিকের মধ্যে মাত্র ৬৬ জনের পাসপোর্টের কপি দেন হোটেল মালিকেরা। তবে কারও ভিসার কপি দেওয়া হয়নি।

কক্সবাজার জেলা পুলিশ, এসবি ও সিআইডি সূত্র বলছে, পরিস্থিতি দেখে প্রথম দফায় ২৫ আগস্ট মেরিনা বিচ ভিলাস রিসোর্টে অভিযান চালায় পুলিশ। তবে টের পেয়ে সেখানে থাকা চীনা ও তাইওয়ানের নাগরিকেরা পেছনের সৈকত দিয়ে পালিয়ে যান।

ওই রিসোর্টের হলরুম ও অন্যান্য স্থানে তল্লাশি চালিয়ে ল্যাব ও শব্দরোধী কক্ষের সন্ধান পাওয়া যায়। এসব সরঞ্জাম ও স্থাপনা জব্দ করা হয়। পরে বিষয়টি ঢাকায় চীনা দূতাবাসকে জানায় এসবি। ২৬ আগস্ট চীনা দূতাবাসের তিন সদস্যের প্রতিনিধিদল মেরিনা বিচ ভিলাসে গিয়ে কম্পিউটার ল্যাব, শব্দরোধী কক্ষ, আইফোনসহ বিভিন্ন স্থাপনা ঘুরে দেখে। ২৮ আগস্ট কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের একটি দল রিসোর্টটি পরিদর্শন করে।

গত ১ সেপ্টেম্বর চীনা দূতাবাসের আরেকটি প্রতিনিধিদল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। তারা স্থাপিত প্রযুক্তিগত অবকাঠামো দেখে বিস্মিত হয়। ৩ সেপ্টেম্বর কলাতলীর দুটি হোটেলে পুলিশ অভিযান চালিয়ে তাইওয়ানের ওয়েই ছিং ওয়েন এবং চীনের সু ইয়াংফান, ইয়ান চ্যাংশেং, সু হাইয়াং, উ চিয়ানশিয়ং ও ঝাং ঝেমিংকে গ্রেপ্তার করে। পালিয়ে যান ঝান ইউয়ান ফান ওরফে বাবর আলী, পাই লেডিং, উ জিপিং ও জিয়ান ঝাং। অভিযানে ১ হাজার ৯৩৮টি আইফোন, ৪০টি ল্যাপটপ, ৫০টি মনিটর, ৪৪টি কম্পিউটার, ৩০টি কি-বোর্ড, ৪০টি মাউসসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করা হয়।

এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে রামু থানায় সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা করে। ওই মামলায় গ্রেপ্তার ছয়জনকে কারাগারে পাঠানো হয়।

রামু থানার উপপরিদর্শক মিন্টু দত্ত আজকের পত্রিকাকে বলেন, মামলায় গ্রেপ্তার ছয়জন ছাড়া আরও চারজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। আরও ৩০০ চীনা ও তাইওয়ানের নাগরিককে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়।

এসবির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ল্যাবে পাওয়া ইলেকট্রনিক ডিভাইস প্রাথমিকভাবে ফরেনসিক পরীক্ষা করে দেখা গেছে, চীনা প্রতারক চক্রের জাল বিভিন্ন দেশে বিস্তৃত। মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, মালয়েশিয়া, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভিয়েতনামে সক্রিয় এই চক্রের সদস্যরা।

জানতে চাইলে কক্সবাজার জেলার পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘কিছুদিন ধরে তাদের ওপর নজরদারি করা হচ্ছিল। একপর্যায়ে জেলা পুলিশের নেতৃত্বেই অভিযান চালানো হয়। তবে বিষয়টি সাইবার-সংশ্লিষ্ট হওয়ায় মামলাটি আমরা রাখিনি। জেলা সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে জেলা সিআইডি থেকে মামলাটি সিআইডির সদর দপ্তরের সাইবার পুলিশ সেন্টারে চলে গেছে। তারাই এখন তদন্ত করছে।’

চার দেশ ঘুরে প্রতারক চক্র বাংলাদেশে

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র বলছে, চীন ও তাইওয়ানের এই সাইবার প্রতারক চক্র প্রথমে লাওস ও কম্বোডিয়ায় এবং পরে মিয়ানমারের থাইল্যান্ড-সংলগ্ন কে কে পার্ক এলাকায় সংগঠিতভাবে প্রতারণার কেন্দ্র গড়ে তুলেছিল। পরে সেখানে মিয়ানমার সেনাবাহিনী অভিযান চালালে তারা সেন্টার গুটিয়ে শ্রীলঙ্কায় ঘাঁটি গাড়ার চেষ্টা করে। সেখানেও অভিযান শুরু হওয়ায় বাংলাদেশকে বেছে নেয়।

সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশে চীনের কয়েকটি বড় প্রকল্প চলমান আছে এবং সেসব প্রকল্পে অনেক চীনা নাগরিক কাজ করেন। এই সুবিধা কাজে লাগায় প্রতারক চক্র। তারা এসব প্রকল্পের কর্মী পরিচয় দিয়ে নিজেদের আড়ালে রেখে সহজে স্ক্যামিং চালিয়ে যেতে থাকে। পাশাপাশি বাংলাদেশে সাইবার নজরদারি তুলনামূলক কম থাকার সুযোগও নিতে চেয়েছিল তারা। তবে শেষ পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরে পড়ে যায় চক্রটি।

চক্রের প্রধান কার্যালয় ‘মেরিনা বিচ ভিলাস’

বাংলাদেশে প্রতারক চক্রটির প্রধান কার্যালয় হয়ে উঠেছিল হিমছড়ির ‘মেরিনা বিচ ভিলাস’ রিসোর্ট। গত ফেব্রুয়ারি থেকে সেখানে কার্যক্রম শুরু করে চক্রটি। প্রায় পাঁচ বিঘা জায়গার পুরো রিসোর্টই ভাড়া নিয়েছিল তারা। এ জন্য মাসে প্রায় ৪০ লাখ টাকা ভাড়া দেওয়া হতো।

রিসোর্টটিতে অন্তত ৩০০ জনের কাজের পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল। বাবুর্চি, ইলেকট্রিশিয়ান থেকে শুরু করে ছোট-বড় সব ধরনের কাজের জন্য নিজেদের লোক নিয়োগ করেছিল চক্রটি। নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী পুরো রিসোর্টের সাজসজ্জায়ও পরিবর্তন আনা হয়। এমনকি নিরাপত্তাব্যবস্থাও নিজস্ব লোক দিয়ে চালাত চক্রটি। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী মালিকপক্ষের কাউকেই সেখানে থাকতে দেওয়া হতো না।

গত বুধবার সরেজমিনে রিসোর্টটি ঘুরে দেখা যায়, বড় একটি ডাইনিং হলকে রূপান্তর করা হয়েছিল কম্পিউটার ল্যাবে। সেখানে ৬০ টির বেশি কম্পিউটার রাখার টেবিল রয়েছে। বিভিন্ন ধরনের সার্ভার ও বৈদ্যুতিক যন্ত্রের সংযোগের তার ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। পুরো ব্যবস্থাপনা দেখেই বোঝা যায়, জায়গাটি বড় একটি প্রযুক্তি ল্যাব হিসেবে ব্যবহার করা হতো।

ল্যাবে রয়েছে নিজস্ব সার্ভার, আইপি সিস্টেম, যোগাযোগব্যবস্থা ও নেটওয়ার্ক। পুরো ডেকোরেশনই করা হয়েছে শব্দরোধীভাবে। প্রযুক্তিগত বিভিন্ন সরঞ্জাম একটি কক্ষে জব্দ করে রেখেছে পুলিশ।

তবে সবচেয়ে বিস্ময়কর ছিল একটি কক্ষ। সেখানে তৈরি করা হয়েছে ছয়টি বুথ। প্রতিটি বুথই শব্দরোধী। ওপরে রয়েছে শব্দহীন ফ্যান। ছোট টেবিলের সামনে চেয়ার ও ফোন রাখা। সঙ্গে রয়েছে পেনসিল ও সাদা খাতা।

রিসোর্টটির সেখানে দায়িত্ব পালন করা পুলিশ কনস্টেবল মো. শাহাদত জানান, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে তাঁরা শুনেছেন, এসব বুথেই পে-মোবাইল ফোন ব্যবহার করে প্রতারণার ফাঁদ পাতার কাজ করত চক্রটির সদস্যরা।

তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ল্যাব থেকে জব্দ করা ইলেকট্রনিক ডিভাইস ফরেনসিক পরীক্ষায় এরই মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। এআই ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রামে লোভনীয় তথ্য আদান-প্রদান করত চক্রটির সদস্যরা। এসব যোগাযোগের মাধ্যমে চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভিয়েতনামের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের প্রলোভন দেখানো হতো।

সিআইডির কক্সবাজার জেলার পরিদর্শক ও মামলার দ্বিতীয় ধাপের তদন্ত কর্মকর্তা আবু কালাম আজাদ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘এটা প্রতারণার বিরাট আয়োজন। মুখে বলে যা বোঝানো যাবে, তার চেয়ে বড়। তবে এ বিষয়ে আমি কোনো কথা বলতে পারব না। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিষয়টি দেখছেন।’

প্রতারক চক্রের থাকার আরও তিন জায়গা

মেরিনা বিচ ভিলাস ছাড়াও প্রতারক চক্রের সদস্যরা থাকতেন ইনানীর অর্কিড ব্লু ও ড্রিম হলিডে রিসোর্ট এবং চট্টগ্রামের খুলশীতে ইলিয়াস ব্রাদার্স নামের একটি ভবনে। অভিযানের পর থেকে স্থাপনাগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে পুলিশ। প্রধান ফটকগুলো তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। দায়িত্বরত প্রহরীদের কড়া নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, বাইরের কেউ যেন সেখানে প্রবেশ করতে না পারে।

সরেজমিনে দেখা যায়, ইনানীর অর্কিড ব্লুতে ধোয়া-মোছার কাজ চলছে। দ্রুত পর্যটকদের জন্য রিসোর্টটি খুলে দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। তবে ড্রিম হলিডে রিসোর্ট ও ইলিয়াস ব্রাদার্স ভবনটি এখনো তালাবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে।

অর্কিড ব্লুর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ইমান আলী আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘চীন ও তাইওয়ানের নাগরিকেরা মূলত এখানে থাকতেন। তাঁরা বাইরে তেমন বের হতেন না। গাড়িতে করে আসতেন, আবার গাড়িতেই বের হয়ে যেতেন। কারও সঙ্গে কথা বলতেন না। এখন তদন্তের জন্য পুলিশসহ বিভিন্ন সরকারি লোকজন আসছেন। আরও কিছুদিন কক্ষগুলো এভাবেই রেখে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’

ব্যাকআপ অফিস চট্টগ্রামের খুলশীতে

কক্সবাজার থেকে গ্রেপ্তার চীন ও তাইওয়ানের নাগরিকদের জিজ্ঞাসাবাদে চট্টগ্রামের খুলশীতে তাদের আরেকটি ব্যাকআপ কার্যালয়ের সন্ধান পান তদন্তকারীরা। সেখানে পৃথক একটি দল একই ধরনের কার্যক্রম চালাত। পরে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট (সিটিইউ) ও খুলশী থানা-পুলিশের যৌথ অভিযানে জালালাবাদ আবাসিক এলাকার একটি সাততলা ভবনের ১৪টি ফ্ল্যাটে অভিযান চালানো হয়। সেখানে সার্ভার, কম্পিউটার, ল্যাপটপসহ বিভিন্ন তথ্যপ্রযুক্তির সরঞ্জাম স্থাপন করা হয়েছিল।

পুলিশ জানায়, অভিযানে গ্রেপ্তার ৬৩ জনের মধ্যে লাওসের ৩৫, পাকিস্তানের ২১, চীনের ৫, নেপালের ১ ও ভিয়েতনামের ১ জন নাগরিক রয়েছেন। তাঁদের কাছ থেকে ল্যাপটপ, মুঠোফোনসহ ১৭০টি ইলেকট্রনিক ডিভাইস উদ্ধার করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার ফয়সাল আহম্মদ বলেন, ‘লাওস, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ায় অনলাইন প্রতারকদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান চলছে। সেখানে প্রতারণার কাজ চালানো কঠিন হয়ে পড়ায় তাঁরা বাংলাদেশকে বেছে নিয়েছেন।’

সূত্র জানায়, জালালাবাদ আবাসিক এলাকার সাততলা একটি ভবন পুরোটা ১৬ লাখ টাকা অগ্রিম দিয়ে মাসে ৪ লাখ টাকায় ভাড়া নেওয়া হয়। ভবনটি ভাড়া নেওয়ার ক্ষেত্রে মধ্যস্থতা করেন এক সাবেক সেনাসদস্য। তিনিই চীন ও তাইওয়ানের নাগরিকদের নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন। তাঁর নাম জাফর। জাফরের সঙ্গে কথা বলেন বাড়ির মালিক দুবাইপ্রবাসী তিন ভাই।

গত মঙ্গলবার সরেজমিনে ওই বাসায় গিয়ে দেখা যায়, খুলশী থানার দুই কনস্টেবল হৃদয় ও মিরাজুল সেখানে দায়িত্ব পালন করছেন। পুরো বাসাটি সিলগালা করে রাখা হয়েছে।

বাসার কেয়ারটেকার ইলিয়াস আলীর মাধ্যমে জানা যায়, দেড় মাস আগে বাসাটি ভাড়া নেওয়ার পরপরই ট্রাকে করে নানা ধরনের সরঞ্জাম সেখানে নিয়ে আসা হয়। জাফরের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়। বাড়ির কেয়ারটেকার হলেও ইলিয়াসকে বাসার ভেতরে যেতে দেওয়া হতো না।

ইলিয়াস আলী আজকের পত্রিকাকে বলেন, ১৪টি কক্ষের মধ্যে আটটি কক্ষে তাঁরা কাজ করতেন। বাকিগুলোতে থাকতেন। তাঁদের চীনা বাবুর্চি ছিল। তারাই রান্না করত।

পুলিশের তদন্তে যা উঠে আসছে

তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, বাংলাদেশে বসেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া ও মালদ্বীপের নাগরিকদের টার্গেট করত চক্রটি। কয়েক মাসেই তারা ওই সব দেশ থেকে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে।

সিআইডির তদন্তকারীরা বলছেন, চক্রটির প্রতারণার ধরন ছিল একাধিক। গ্রুপ করে করে একেকজন একেক বিষয়ে কাজ করত। ‘সহজে বিনিয়োগ ও ডাবল বেনিফিট’ এমন চটকদার বিজ্ঞাপন প্রচার করে মানুষের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হতো। এ জন্য পাঁচ থেকে ছয় মাসের জন্য নতুন অ্যাপ ও ওয়েবসাইট চালু করা হতো। এসব সাইটে ব্যাংক কার্ডের তথ্য দিলেই ভুক্তভোগীর অজান্তে তাঁর অ্যাকাউন্ট থেকে ডলার সরিয়ে নেওয়া হতো।

থাইল্যান্ডের নারীদের টার্গেট করে রোমান্স স্ক্যামিংয়ের ফাঁদে ফেলেও অর্থ আত্মসাৎ করা হতো। অন্যদিকে ধনী দেশের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারী ব্যক্তিদের প্রোফাইল সংগ্রহ করা হতো। তাঁদের সঙ্গে ব্যবসায়িক আলাপের মাধ্যমে বিনিয়োগসংক্রান্ত তথ্য নেওয়া হতো। শেয়ারের দাম বাড়িয়ে লাভবান করে দেওয়ার কথা বলে পরে পুরো অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে হাজার হাজার ডলার মার্কেট থেকে সরিয়ে ফেলত।

এর বাইরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদেরও টার্গেট করা হতো। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে সচেতনতামূলক বার্তার আড়ালে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা হতো। পরে তাঁদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে তুলে প্রতারণা ফাঁদ পাতা হতো।

কর্মকর্তারা বলছেন, টার্গেট দেশগুলোতে চক্রটির বিভিন্ন পর্যায়ের লোকজন রয়েছে। বাংলাদেশ থেকে প্রতারণার কার্যক্রম পরিচালিত হলেও পরবর্তী পর্যায়ের কাজ সংশ্লিষ্ট দেশগুলো থেকে করা হতো।

তদন্তকারীরা বলছেন, এসব প্রতারণার পাশাপাশি ব্যাংকিং সিস্টেম ও অনলাইন জুয়ার সঙ্গেও চক্রটির সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে রিমান্ডে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চীনা, তাইওয়ান ও পাকিস্তানের প্রায় ৪০০ নাগরিক এই চক্রের সঙ্গে যুক্ত। তাঁদের মধ্যে প্রায় ১৫০ জন উচ্চ প্রযুক্তিজ্ঞানসম্পন্ন স্ক্যামার। তাঁদের প্রত্যেকের মাসিক বেতন ছিল প্রায় ৩ হাজার মার্কিন ডলার। আর বাংলাদেশে থাকা স্টেশন চিফের বেতন প্রায় ৭ হাজার ডলার।

মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে মামলার তদারক কর্মকর্তা সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের বিশেষ পুলিশ সুপার মনিরুল ইসলাম আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘বিষয়টি স্পর্শকাতর। জেলা পুলিশের সাইবার-সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ সুযোগ-সুবিধা না থাকায় সিআইডি তদন্ত করছে। তদন্তাধীন অবস্থায় এর চেয়ে বেশি কিছু বলা ঠিক হবে না।’