আগামী শিক্ষাবর্ষের জন্য জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) বিনা মূল্যের প্রায় ৩১ কোটি পাঠ্যবই ছাপানো ঘিরে ২৫০ কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে। তারপরও নির্ধারিত সময়সীমা আগামী নভেম্বরের মধ্যে বিপুলসংখ্যক বই দিতে পারবে না ২৬টি ছাপাখানা। একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। এবারের ই-টেন্ডারের প্রাক্কলিত দর ফাঁস, সিন্ডিকেট দর জমা এবং কে কত কাজ পাবে তার ভাগবাঁটোয়ারা—সব কিছুর মূল নিয়ন্ত্রক ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত সহকারী আলোচিত মো. জাহাঙ্গীর আলমের মালিকানাধীন ‘স্কাই রি-অ্যারেঞ্জ লিমিটেড’ কোম্পানির একজন ব্যাবসায়িক পার্টনার ও একটি ছাপাখানার মালিক। তার পরিবারের চারটি ছাপাখানা বরাবরের মতো ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবই ছাপাতেও সর্বোচ্চ কাজ পেয়েছে।
সরকার বদল হলেও এই পরিবারের ক্ষমতা অক্ষুণ্ন থাকার নেপথ্যে কি—এই প্রশ্ন এখন শতাধিক ছাপাখানার মালিকের। এদিকে গোয়েন্দা প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর গত বৃহস্পতিবার আলোচিত সেই জাহাঙ্গীরের ব্যাবসায়িক পার্টনারসহ ১০টি ছাপাখানার মালিককে রাজধানীর সেগুনবাগিচাস্থ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে ডেকে নিয়ে কঠোর হুঁশিয়ার করে দেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি বলেন, ‘আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে সঠিক মানের সব পাঠ্যবই আমি চাই। যারা দিতে পারবে না তাদের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে ডিসেম্বরে চীন থেকে পাঠ্যবই ছাপিয়ে আনা হবে। এ জন্য সার্বিক প্রস্তুতি রাখা হয়েছে।’ সংশ্লিষ্ট সূত্র ইত্তেফাককে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে।
জানা গেছে, বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও অগ্রণী প্রিন্টিং প্রেসের স্বত্বাধিকারী মো. কাউসার-উজ-জামান (রুবেল) এর কাছে পাঠ্যবই ছাপানোর সর্বশেষ অবস্থা জানতে চান শিক্ষামন্ত্রী। জবাবে রুবেল বলেন, ৩০ নভেম্বরের মধ্যে আমরা ৯৫ ভাগ বই দিতে পারব। বাকি ৫ ভাগ বই ছাপানোর জন্য সমিতির পক্ষ থেকে বাড়তি সময় চান তিনি। তখন শিক্ষামন্ত্রী উচ্চকণ্ঠে বলেন, কেন ৩০ নভেম্বরের মধ্যে শতভাগ বই দিতে পারবেন না? যৌক্তিক কারণ দেখান। মন্ত্রীর এই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি রুবেল। বৈঠকে উপস্থিত আরেক ছাপাখানার মালিকের উদ্দেশে মন্ত্রী বলেন, ‘আপনার প্রতিষ্ঠান থেকে কেন নিম্নমানের বই পাওয়া গেছে।’
ভবিষ্যতে আর এমন হবে না বলে অঙ্গীকার করেন ঐ ছাপাখানার মালিক। শিক্ষামন্ত্রী নভেম্বরের মধ্যে যাতে সব পাঠ্যবই ছাপানো শেষ হয়, সেজন্য মুদ্রণ সমিতিকেও কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি। এদিকে গত বুধবারের মধ্যে ৫০ ভাগ পাঠ্যবই ছাপিয়ে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ছাপা হয়েছে ৩০ ভাগের কম। অর্থাত্ নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে ২০ ভাগ বই ছাপাতে পারেনি ছাপাখানাগুলো। অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রতি বছর বিলম্বে পাঠ্যবই ছাপানোর নেপথ্যে রয়েছে নিম্নমানের কাগজে ছাপিয়ে অধিক মুনাফা করা। কারণ শেষ সময়ে যাচাই-বাছাইয়ের সুযোগ কম থাকে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশের বিনা মূল্যের পাঠ্যবই ছাপানোর কাজ করতে চায় চীন। এজন্য তারা একবছর বিনা মূল্যে সব পাঠ্যবই ছাপিয়ে দেওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছে। পাঁচটি ছাপাখানার মালিক ইত্তেফাককে বলেন, এক শ্রেণির ছাপাখানার অধিক মুনাফা লোভের কারণে হয়তো, এই সেক্টরটা বিদেশিদের হাতে চলে যাবে। বর্তমানে এই সেক্টরে কর্মসংস্থান হচ্ছে দুই লাখ মানুষের।
সিন্ডিকেট দরে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও এনসিটিবি চুপ ছিল কেন? অনুসন্ধানে জানা গেছে, আলোচিত পিয়ন জাহাঙ্গীরের ব্যাবসায়িক পার্টনার এবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়, এনসিটিবি ও প্রেস মালিকদের সমন্বয়ে ত্রিপক্ষীয় একটি সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। যে কারণে টেন্ডার লাইভে থাকাবস্থায় প্রাক্কলিত দর বাড়ানোর মতো বিধিবহির্ভূত ঘটনাও ঘটেছে। শুরুতে সরকার একটি প্রাক্কলিত দর ঠিক করেছিল, তা ফাঁস হয়ে যায় এবং ফাঁস হওয়া দর দেখে পিয়ন জাহাঙ্গীরের ব্যাবসায়িক পার্টনার ঠিকাদার তা বৃদ্ধির জন্য চাপ দেন। অদৃশ্য কারণে এনসিটিবি সেটি মেনে নিয়ে প্রাক্কলিত দর বাড়িয়ে দেয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও ছিল চুপ। পরে ঠিকাদারেরা সমঝোতা করে দরপত্র দাখিল করে কাজ ভাগাভাগি করেন। এর মাধ্যমে ২৫০ কোটি টাকা গায়েব করেছে সিন্ডিকেটটি।
সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে এটি একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। প্রতিযোগিতাহীন উচ্চমূল্যের এই দরপত্র মূল্যায়ন ও অনুমোদনে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (পিপিআর) ২০২৫ মানা হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এরই মধ্যে তথ্য সংগ্রহে এনসিটিবিতে অভিযান চালিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির আটটি, ষষ্ঠ শ্রেণির ১২টি, সপ্তম শ্রেণির ১০টি, অষ্টম শ্রেণির চারটি ও নবম-দশম শ্রেণির ১১টিসহ মোট ৪৫টি দরপত্রের মধ্যে একক দরপত্র জমা পড়েছে ৩০টি (৬৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ), দুটি করে দরপত্র জমা পড়েছে ১৩টি (২৮ দশমিক ৮৮ শতাংশ) তিনটি করে দরপত্র জমা পড়েছে দুটি (৪ দশমিক ৪৪ শতাংশ)। অথচ দেশে সহস্রাধিক ছাপাখানা রয়েছে।
১০০ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ: ২০১০ সালে ‘স্কাই রি-অ্যারেঞ্জ লিমিটেড’ নামে একটি কোম্পানি গঠন করে বিকাশের ডিস্ট্রিবিউশন ফ্র্যাঞ্চাইজি নেন আলোচিত সেই পিয়ন জাহাঙ্গীর আলম। কিন্তু এর আড়ালে তিনি অসংখ্য সন্দেহজনক ব্যাংকিং কার্যক্রম করেন। কোম্পানির নামে একাধিক ব্যাংক অ্যাকাউন্টে অস্বাভাবিক অঙ্কের টাকা জমা হয়, যার বৈধ উত্স পাওয়া যায়নি ও যা ব্যবসার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। কোম্পানিটি এবং জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে বিদেশে প্রায় ১০০ কোটি টাকা অর্থ পাচারের অভিযোগে মামলা করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠার চার বছর পর সব সরকারের আমলে ক্ষমতাধর একটি ছাপাখানার মালিক জাহাঙ্গীরের ব্যাবসায়িক পার্টনার হন। ২০২৪ সালে ৫ আগস্টের পর জাহাঙ্গীর আমেরিকায় চলে যান। এই কোম্পানির ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলোর কন্ট্রোল চলে যায় পাঠ্যবই ছাপানোর কাজ করে আসা ঐ ছাপাখানার মালিকের হাতে। পরিস্থিতি অনুকূলে নয়-বুঝতে পেরে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে ‘স্কাই রি-অ্যারেঞ্জ লিমিটেড’ প্রতিষ্ঠান থেকে সব কিছু গুটিয়ে নেন তিনি।
সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে আইন-বহির্ভূত কাজ: সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, দরপত্র লাইভে থাকা অবস্থায় প্রাক্কলিত দর বাড়ানো বা কমানোর সুযোগ নেই। কারণ প্রাক্কলন কমিটি বাজার যাচাই সাপেক্ষে দর প্রস্তুত করে হোপ-এর অনুমোদন নিয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রথমত দরপত্র উন্মুক্ত হওয়ার পর কোনো দরদাতা না পাওয়া গেলে পুনরায় দাপ্তরিক প্রাক্কলন প্রণয়ন করিয়ে পুনঃ দরপত্র দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, দরদাতারা প্রাক্কলিত মূল্যের অধিক দর প্রস্তাব করলে বাজেটপ্রাপ্তি সাপেক্ষে পুনরায় বাজার যাচাই করে ১০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি দরে কার্যাদেশ দিতে পারেন। কিন্তু এই দুটি প্রক্রিয়ার কোনোটিই অনুসরণ করা হয়নি, যা পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (পিপিআর)-২০২৫-এর লঙ্ঘন। পিপিআর-এর বিধি ৪৪(২)-এ বলা হয়েছে, ‘সকল দরপত্র, প্রস্তাব বা কোটেশন বাতিল করা যাইবে, যদি-(ক) দাপ্তরিক প্রাক্কলিত ব্যয় বাস্তবসম্মত হওয়া সত্ত্বেও সর্বনিম্ন মূল্যায়িত দরপত্র বা কোটেশন উক্ত প্রাক্কলিত ব্যয় অপেক্ষা অধিক হয়; বা (খ) ক্রয় প্রক্রিয়ায় কার্যকর প্রতিযোগিতার অভাব থাকার প্রমাণ পাওয়া যায় (যথা-সম্ভাব্য কতিপয় দরপত্রদাতা কর্তৃক অংশগ্রহণ না করা)।’
প্রেস মালিকদের ডেকে এনে ব্যাকডেটে স্বাক্ষর: দরপত্রে অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় গত মঙ্গলবার এনসিটিবিতে অভিযান চালায় দুদক। তারা দরপত্রের বেশ কিছু কাগজপত্র গ্রহণ করে। এ পরিস্থিতিতে গত বুধবার এনসিটিবি অনানুষ্ঠানিক অধিকাংশ প্রেস মালিককে ডেকে এনে তাদের কাছ থেকে প্রথম পর্যায়ের প্রাক্কলিত দর যে বাজার উপযোগী ছিল না, সে ব্যাপারে প্যাডে ব্যাকডেটে লিখিত নেয়। বিষয়টির সত্যতা জানতে গতকাল রাতে এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ফখরুল মাওলাকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি। আর অন্য কর্মকর্তারা ফোন ধরলেও এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি। এদিকে প্রতিটি দরপত্রের বিপরীতে একাধিক সিডিউল বিক্রি হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির ৩৪১ নম্বর লটে ২৪টি দরপত্র বিক্রি হলেও জমা পড়েছে দুটি, ৩৫৯ নম্বর লটে ২২টি দরপত্র বিক্রি হলেও জমা পড়েছে দুটি, ৩৮৮ নম্বর লটে ১৭টি দরপত্র বিক্রি হলেও জমা পড়েছে একটি।
ষষ্ঠ শ্রেণির ৬৫২ নম্বর লটে ১৯টি দরপত্র বিক্রি হলেও জমা পড়েছে একটি, ৬২১ নম্বর লটে ১৮টি দরপত্র বিক্রি হলেও জমা পড়েছে একটি ও ৬৩৪ নম্বর লটে ১৭টি দরপত্র বিক্রি হলেও জমা পড়েছে মাত্র একটি। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে মাধ্যমিকের ফর্মাপ্রতি গড় দর পড়েছে ৩.৩২ টাকা এবং প্রাথমিকের ফর্মাপ্রতি গড় দর ৩.৫৪ টাকা। অথচ ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের বই মুদ্রণে কোনো একক দরপত্র জমা পড়েনি। ঐ বছর মাধ্যমিকে ফর্মাপ্রতি গড় দর ছিল ২.৩১ টাকা এবং প্রাথমিকে ফর্মাপ্রতি গড় দর ছিল ৩.৪৪ টাকা। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে প্রায় ৮৫ হাজার মেট্রিক টন কাগজে বই ছাপা হচ্ছে। সেই হিসাবে দরপত্র লাইভে থাকা অবস্থায় দর পরিবর্তন করে ২৫০ কোটি টাকার বেশি গায়েব করা হয়েছে। জানা গেছে, ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে মাধ্যমিক স্তরের প্রতি ফর্মা প্রাক্কলিত দর ৩.১৭ টাকা হলেও প্রেস মালিকরা প্রতিযোগিতামূলক দরে গড়ে ফর্মাপ্রতি ২.৩১ টাকায় কাজ করেছেন। এর অন্যতম কারণ এনসিটিবির প্রাক্কলিত দর তারা জানতে পারেননি এবং নিজেদের মধ্যে সিন্ডিকেট করতে পারেননি। আবার গত বছর প্রতিটি দরপত্রের বিপরীতে ১০ থেকে ২৫টি দরপত্র জমা পড়েছে।
বাংলাদেশ মুদ্রণশিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি তোফায়েল খান ইত্তেফাককে বলেন, ‘দরপত্রে লাইভে চলে আসার পর নতুন করে দরপত্র প্রাক্কলনের কোনো সুযোগ নেই। এটা আইন-বহির্ভূত কাজ। অথচ সেই কাজটি করেছে এনসিটিবি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও সব জেনেশুনে চুপ ছিল কেন—সেটি আমার বোধগম্য নয়। আমরা এই অনিয়মের প্রতিকার চাই।’ তিনি বলেন, ‘দুদক এনসিটিবিতে অভিযান চালিয়েছে। তারা তদন্ত করলেই আসল সত্যটা বেরিয়ে আসবে। আমরা চাই, শিক্ষার্থীরা বছরের প্রথম দিন যেন ভালো মানের বই পায়। সরকারকেও এই মহত্ কাজে যেন অতিরিক্ত টাকা গচ্চা দিতে না হয়।’