শীতের আগমনী বার্তা এখন সারা দেশে। দিনের ভ্যাপসা গরম শেষে ভোররাতে ঠান্ডা আবহাওয়া। শহরের বাইরে অনেক জায়গা ঢেকে যাচ্ছে কুয়াশার চাদরে। আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশ থেকে বিদায় নিয়েছে। অর্থাৎ, বর্ষা চলে গেছে; কিন্তু ডেঙ্গুর প্রকোপ এখনো কমেনি। যদিও বর্ষাকালকে ডেঙ্গুর চূড়ান্ত মৌসুম বিবেচনা করা হয়।
জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ আর মশক নিধনে কার্যকর উদ্যোগের অভাবে ডেঙ্গু এখন বছরজুড়ে ভোগান্তির নাম। চলতি বছরের কয়েক মাস ধরে ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে রোগীর চাপ। বছরের শুরুতে ডেঙ্গুর প্রকোপ তুলনামূলক কম থাকলেও জুন থেকে পরিস্থিতির অবনতি হতে থাকে। জুলাই ও আগস্টে রোগী এবং মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ার পর সেপ্টেম্বরে তা আরও তীব্র হয়। অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহেও সেই প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। গত ৯ দিনে ডেঙ্গুতে অর্ধশত মানুষের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১৫ হাজারের বেশি রোগী।
ফলে জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, থেমে থেমে বৃষ্টিপাত, এডিস মশার প্রজননস্থল এবং সংক্রমণের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপের অভাব পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলতে পারে। চলতি মাসের বাকি সময়েও ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। তাদের ভাষ্যমতে, ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শুধু মশা নিধনের সাময়িক অভিযান চালিয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া সম্ভব নয়। এ জন্য বছরজুড়ে সমন্বিত ও কার্যকর কর্মসূচি বাস্তবায়ন জরুরি। বিশেষ করে যেসব এলাকায় রোগীর সংখ্যা বেশি, সেসব এলাকা চিহ্নিত করে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত নজরদারি এবং মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। বৃষ্টির পর বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি দ্রুত অপসারণে সিটি করপোরেশন ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। একই সঙ্গে নাগরিকদের সচেতনতা ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সেইসঙ্গে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার পাশাপাশি হাসপাতালগুলোতে রোগী ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়ানো এবং আক্রান্তদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনা জরুরি। রোগীর সংখ্যা ও মৃত্যুর ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা মোকাবিলায় স্বাস্থ্য বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন ও নাগরিকদের সমন্বিত উদ্যোগের বিকল্প নেই।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, অক্টোবরেও সংক্রমণের ঝুঁকি রয়েছে। তাই পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন ও সিটি করপোরেশনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি মানুষকে সচেতন করতে হবে, যাতে জ্বর হলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া হয়।
তিনি বলেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আমাদের প্রস্তুতিতে এখনো ঘাটতি রয়েছে। শুধু বর্ষা মৌসুমে মশা নিধনের উদ্যোগ নিলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। সারা বছর এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং মশার ঘনত্ব পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা থাকতে হবে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় রোগীর সংখ্যা বেশি, সেসব এলাকায় নিবিড় নজরদারি ও কার্যকর মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম চালাতে হবে। রাজধানীর পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ডেঙ্গু সংক্রমণকে শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রোগী বাড়ার অর্থ হলো, আক্রান্ত এলাকাগুলো চিহ্নিত করে স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। বৃষ্টির পর জমে থাকা পানি অপসারণ, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং নিয়মিত নজরদারি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু কীটনাশক ছিটিয়ে মশা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। একই সঙ্গে হাসপাতালে রোগী ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়াতে হবে, যাতে গুরুতর রোগীরা দ্রুত চিকিৎসা পান। ডেঙ্গুতে জ্বর কমে যাওয়ার পরও বিপজ্জনক উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তাই মানুষের মধ্যে এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। অক্টোবরের বাকি সময়ে পরিস্থিতি মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ এবং নিয়মিত তথ্য বিশ্লেষণের ভিত্তিতে পদক্ষেপ নিতে হবে।
সেপ্টেম্বরেই সর্বোচ্চ মৃত্যু, অক্টোবরে বাকি সময়ে উদ্বেগ ডেঙ্গু রোগীর অনেকেই হাসপাতালে আসেন। বাকিরা সাধারণ জ্বর ভেবে অবহেলা করেন। তবুও শনাক্ত রোগীর সংখ্যা প্রায় লাখের ঘরে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত রাজধানীসহ সারা দেশে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছেন ৯৫ হাজার ৪৫১ জন। তার মধ্যে মারা গেছেন ২৯৫ জন। হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ৮৯ হাজার ৩৮০ জন। এখনো দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৫ হাজার ৭৭৬ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মাসভিত্তিক হিসাব বলছে, সেপ্টেম্বরে ৪৩ হাজার ৭৭৪ জন হাসপাতালে ভর্তি এবং ১৪৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছরের এ পর্যন্ত এক মাসে সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ড হয়েছে সেপ্টেম্বরে। এর পর অক্টোবরের প্রথম ৯ দিনেই ৫০ জনের মৃত্যু আর হাসপাতালে ভর্তি ১৫ হাজার ৮৩১ জন। এ তথ্যও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। চলতি মাসের বাকি সময়ে সেপ্টেম্বরের চেয়েও ডেঙ্গুতে বেশি রোগী ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটতে পারে। এদিকে জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মোট পাঁচজনের মৃত্যু হয়। জুনে মারা যান ১৩ জন, জুলাইয়ে ৩৬ এবং আগস্টে ৪৩ জন। সেপ্টেম্বরে মৃত্যুর সংখ্যা এক লাফে বেড়ে দাঁড়ায় ১৪৮ জনে।
রোগী ভর্তির পরিসংখ্যানেও একই প্রবণতা। জুলাইয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ৯ হাজার ২০৬ জন। আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২০ হাজার ৫৩৬ জনে। সেপ্টেম্বরে হাসপাতালে ভর্তি হন ৪৩ হাজার ৭৭৪ জন। আগস্টের তুলনায় সেপ্টেম্বরে রোগী ভর্তির সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। এ ছাড়াও চলতি বছরের জানুয়ারিতে ১০৮১ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৪০৯, মার্চে ৩৫৩, এপ্রিলে ৬৪০, মে মাসে ভর্তি হন ৭১৪ জন এবং জুনে ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন ২ হাজার ৯০৭ জন। চিকিৎসকরা বলছেন, অক্টোবরের শেষ পর্যন্ত ডেঙ্গু পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা এখনো নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। তবে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকা, মশার প্রজননস্থল নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা এবং বিভিন্ন অঞ্চলে সংক্রমণের বিস্তার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
রাজধানীর বাইরে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর চাপ ডেঙ্গু পরিস্থিতির উদ্বেগজনক দিক হলো, সংক্রমণের চাপ রাজধানীর বাইরে ছড়িয়ে পড়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গতকালের তথ্যমতে, গতকাল ডেঙ্গু নিয়ে আরও ১ হাজার ৩০০ জন মানুষ রাজধানীসহ সারা দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে খুলনায় একজন শিশু মারা গেছে। গত চব্বিশ ঘণ্টায় শনাক্ত রোগীর মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশের বেশি রাজধানীর বাইরের রোগী। তার মধ্যে বরিশাল বিভাগে ১৪১ জন, চট্টগ্রামে ৩১৮, ঢাকা বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ৩৪৩, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ৩৫, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ৩৬, খুলনায় ২৭৪, ময়মনসিংহে ৬৯, রংপুরে ৮০ এবং সিলেটে চারজন রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
চিকিৎসায় দেরি হলে বাড়তে পারে মারাত্মক ঝুঁকি ডেঙ্গুতে আক্রান্তের পাশাপাশি মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকায় চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ৯ অক্টোবর পর্যন্ত চলতি বছরে ২৯৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে ৯৫ হাজার ৪৫১ জন রোগীর মধ্যে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ৮৯ হাজার ৩৮০ জন। অধিকাংশ ডেঙ্গু রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও চাপ অব্যাহত রয়েছে নতুন রোগীর। চিকিৎসকদের মতে, জ্বর কমে যাওয়ার পরও ডেঙ্গু রোগীর অবস্থা গুরুতর হতে পারে।
তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, রক্তপাত, শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক দুর্বলতা কিংবা অস্থিরতা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে। জ্বর হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষা ও চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক এবং অন্যান্য শারীরিক জটিলতা থাকা রোগীদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। হাসপাতালগুলোতেও রোগীর চাপ অনুযায়ী শয্যা ও জনবল প্রস্তুত রাখা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা এবং গুরুতর রোগীদের দ্রুত শনাক্ত করার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। দেরিতে হাসপাতালে পৌঁছানোর কারণে চিকিৎসা জটিল হয়ে উঠতে পারে। এসব বিষয়ে জনসচেতনতার বিকল্প নেই।