Image description

সীমিত আয় আর নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও শিক্ষা অর্জনকেই জীবনের প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ছায়েদ উল্লাহ। সেই ত্যাগের ফল মিলেছে হাতেনাতে। একে একে তার পাঁচ সন্তান সুযোগ পেয়েছিলেন দেশের অন্যতম সেরা বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এবার ছোট ছেলেও সেই তালিকায় নাম লেখানোয় একই পরিবারের সব ৬ সন্তানই এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।

লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার তোরাবগঞ্জ ইউনিয়নের ফাজিল মিয়ার হাট এলাকার ‘ছায়েদ মাস্টার বাড়ি’র এই গল্পটি এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ছায়েদ উল্লাহ নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার দক্ষিণ ওয়াপদা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দীর্ঘ ৩০ বছর শিক্ষকতা করে অবসরে যান। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সীমিত বেতনই ছিল তাদের পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস। সন্তানদের পড়াশোনার খরচ চালাতে গিয়ে একসময় নিজের জমিজমাও বিক্রি করতে হয়েছে তাকে। তবে সেই আর্থিক ত্যাগই আজ এনে দিয়েছে এক অনন্য গৌরব।

বিজ্ঞাপন

পরিবারটির এই সাফল্যের সূচনা হয় ২০০৭-০৮ শিক্ষাবর্ষে। ছায়েদ উল্লাহর বড় ছেলে শামসুল আলম দিপু রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। পড়াশোনা শেষে তিনি ৩৫তম বিসিএসের মাধ্যমে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

মানচিত্রদেখুন

 

দ্বিতীয় ছেলে শাহজাহান সিরাজ আল মামুন ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষে লোকপ্রশাসন বিভাগে ভর্তি হয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। বর্তমানে তিনি কর্মসংস্থান ব্যাংকের হাজীগঞ্জ শাখায় সিনিয়র অফিসার। তৃতীয় ছেলে আশরাফুল ইসলাম শহীদ ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ থেকে উচ্চশিক্ষা শেষ করে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের লক্ষ্মীপুর আঞ্চলিক শাখায় সিনিয়র অফিসার হিসেবে কর্মরত।

চতুর্থ ছেলে শরীফুল ইসলাম বিজয় বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করে বর্তমানে বিসিএসের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। পরিবারের একমাত্র মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগে অধ্যয়নরত। আর সবশেষ সংযোজন ছোট ছেলে আরাফাত হোসেন; ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে ‘এ’ ইউনিটে উত্তীর্ণ হয়ে ভর্তি হয়েছেন এই প্রাচীন বিদ্যাপীঠে।

২০২২ সালে পরিবারটির পাঁচ সন্তানের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার খবর প্রকাশ্যে এলে দেশজুড়ে প্রশংসিত হয়। তিন বছর পর ছোট ছেলে আরাফাতের ভর্তির মাধ্যমে সেই সফলতায় যুক্ত হলো নতুন এক মাইলফলক।

ছয় সন্তানের এই অবিশ্বাস্য ধারাবাহিক সাফল্যের পেছনে ছায়েদ উল্লাহ ও তার স্ত্রী শামীমা বেগমের দীর্ঘদিনের একনিষ্ঠ প্রচেষ্টা ও ত্যাগ কাজ করেছে। স্থানীয় শিক্ষাবিদেরা মনে করছেন, এই অর্জন যেকোনো নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের স্বপ্ন দেখার নতুন প্রেরণা যোগাবে।

সংবাদপোর্টা

 

এ প্রসঙ্গে কমলনগরের একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সানা উল্লাহ সানু বলেন, “এটি কেবল ছয় সন্তানের ভর্তির গল্প নয়; এটি একজন শিক্ষকের নিষ্ঠা এবং শিক্ষাকে সবচেয়ে বড় সামাজিক বিনিয়োগ হিসেবে দেখার এক প্রোজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।”

কমলনগরে অবস্থিত স্থানীয় কলেজের অধ্যক্ষ মো. আরিফ হোসেন বলেন, “শিক্ষক ছায়েদ উল্লাহ ও তার পরিবার প্রমাণ করেছেন, সততা, অদম্য ইচ্ছা ও সঠিক চেষ্টার সামনে অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা কখনো বাধা হতে পারে না। একটি সীমিত আয়ের পরিবারের ছয় সন্তানই দেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে—এটি বাস্তবে রূপ নেওয়া এক রূপকথা।”