জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশের কাঁচাবাজার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে। পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বিভিন্ন পণ্যের সরবরাহ খরচ বেড়েছে। এর প্রভাব পড়ছে খুচরা বাজারেও। ফলে বাড়তি ব্যয়ের চাপে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে গিয়ে বিপাকে পড়ছেন সাধারণ মানুষ।
রাজধানীর কারওয়ান বাজার ও মোহাম্মদপুর কৃষি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, কাঁচামরিচসহ বিভিন্ন সবজির দাম গত মাসের তুলনায় কিছুটা বেড়েছে। একই সঙ্গে চাল, চিনি, আটা, ডিম ও দুধের মতো নিত্যপণ্যের দামও বাড়ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, কারওয়ান বাজারে বেগুন, করলা, বরবটি, ঢ্যাঁড়স, পটল ও কাঁকরোলসহ বেশিরভাগ সবজি গত মাসে ৪০ থেকে ৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও এ মাসে বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকায়। মোহাম্মদপুর কৃষি বাজারে এসব সবজির দাম কেজিপ্রতি ৭০ টাকা পর্যন্ত। তুলনামূলক কম দামে শসা ৫০ টাকা ও পেঁপে ৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। গোল বেগুন বাজারভেদে ১০০ থেকে ১১০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। গত মাসের শুরুতে কাঁচামরিচের দাম ছিল কেজি ১১০ টাকা। এখন তা বেড়ে ১২০ থেকে ১৩০ টাকা হয়েছে।
অন্যান্য নিত্যপণ্যের দামও বেড়েছে। বাজারে চিনি প্রতি কেজি ১২৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে, যা গত মাসে ছিল ১১০ টাকা। গত মাসে ৫৫ টাকা কেজি দরের আটা এখন বিক্রি হচ্ছে ৬৫ টাকায়। সাধারণ চালের দামে বড় পরিবর্তন না থাকলেও চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে পোলাওর চাল। খোলা পোলাওর চাল ১৯০ থেকে ২০০ টাকা এবং প্যাকেটজাত পোলাওর চাল ২২০ থেকে ২৩০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের তরল দুধ প্রতি লিটার ১১০ টাকা, যা গত মাসে ছিল ১০০ টাকা।
কারওয়ান বাজারে বাজার করতে আসা ভর্তি পরীক্ষার্থী সাজ্জাদ হাসিব বলেন, ‘বাজারে যে হারে জিনিসের দাম বাড়তেসে, কিছুদিন পরে ব্যাগ ভর্তি টাকা নিয়ে বাজার করতে যেতে হবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম ঠিকমতো না থাকলে বেঁচে থাকাই তো কষ্ট হয়ে যাবে।’
বাজারে কাঁকরোল ৫০ টাকা, গাজর ৮০ টাকা, পেঁপে ৪০ টাকা, ঢ্যাঁড়শ ৫০ টাকা, টমেটো ১২০ টাকা, কচু ৬০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া ৫০ টাকা এবং কাঁচা কলা হালি ৩০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। প্রতি পিস লাউ ৫০ থেকে ৬৫ টাকা হলেও গোল লাউ বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকায়। কচুর লতির দাম কেজি ৭০ টাকা। তবে নিত্যপ্রয়োজনীয় আলু ৩০ টাকা ও পেঁয়াজ ৫০ টাকা কেজি দরে অপরিবর্তিত রয়েছে।
মোহাম্মদপুর কৃষি বাজারের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রেতা রিপন মিয়া বলেন, ‘পরিবহন খরচ আগের চাইতে বেশি হচ্ছে। তেলের বেশি দাম তো এখান থেকেই আমাদের তুলতে হয়, তাই দাম বাড়ানো ছাড়া উপায় নাই। বেশি দামে কিনলে তো আমাদের বেশি দামেই বিক্রি করতে হবে।’
নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার বিষয়ে খুচরা ব্যবসায়ী রায়হান আবির বলেন, ‘পাইকারি কিনতে হয় বেশি। সয়াবিন তেলের কোম্পানি সয়াবিন তেল দিতে চায় না। পাঁচ কাটন চাইলে দেয় দুই কাটন। মানুষের তো কিনতেই হবে, তাই দাম বেশি হইলেও তারা নিয়ে নেয়। বর্তমানে যাতায়াত খরচ বাড়ার কারণে আরও বেড়েছে।’
মাছের বাজারেও একই চিত্র দেখা গেছে। তেলাপিয়া ২৫০ থেকে ২৬০ টাকা, পাঙাশ ২৩০ থেকে ২৫০ টাকা, রুই ও কাতল ৩৮০ থেকে ৪২০ টাকা, চিংড়ি ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা, পাবদা ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা, বড় আকারের রুই ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা এবং ট্যাংরা ৭০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া ভেটকি ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকা, মৃগেল ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, বাইন ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা, দেশি কই ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা, চাষের কই ৩০০ টাকা, পোয়া ২৬০ টাকা এবং শোল ৭০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, কাঁচাবাজারের অস্থিরতা মৌসুম ও আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল হলেও আটা, চিনি ও দুধের মতো নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির পেছনে শুধু সরবরাহ সংকট দায়ী নয়। তাদের দাবি, করপোরেট সিন্ডিকেট, পাইকারি পর্যায়ের অসাধু দালালি ও তদারকির অভাবও এর জন্য দায়ী। খুচরা পর্যায়ে শুধু অভিযান না চালিয়ে আমদানিকারক ও মিলমালিকদের উৎপাদন ও বিক্রয়মূল্য নিয়মিত তদারকির আওতায় আনা এবং টিসিবির মাধ্যমে নিত্যপণ্যের খোলা বাজারে সরবরাহ বাড়ানো গেলে সাধারণ ক্রেতাদের দুর্ভোগ কমানো সম্ভব বলে মনে করছেন তারা।