Image description

চিহ্নিত শীর্ষ সন্ত্রাসী ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগাকে ধরতে যাওয়া পুলিশকে বাধাদান, সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) প্রকাশ্যে গালাগাল এবং মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সেই ওসিকে বদলি করানোর ঘটনায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেনকে ঘিরে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের পাঁচ বছরের মেয়াদ আট মাস আগেই শেষ হয়ে গেছে। এর মধ্যেও বিএনপি নেতা শাহাদাত যেভাবে নিজের পদ ব্যবহার করে ঘনিষ্ঠদের রক্ষা করছেন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর প্রভাব দেখাচ্ছেন—তাতে এই বিতর্ক আরও চাঙা হয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত গত মঙ্গলবার রাতে। বগা নগর ভবনের আশপাশে আছেন—এমন খবর পেয়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের উত্তর বিভাগ ও খুলশী থানার পুলিশ নগর ভবন এলাকা ঘেরাও করে।

বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য নগর ভবনের ভেতরে ঢুকলে মেয়র শাহাদাত তাদের আটকে দেন এবং সেখান থেকে চলে যেতে বলেন বলে অভিযোগ। এ সময় মেয়রের অনুসারীরা সাংবাদিকদের লাঞ্ছিত করেন। পরে মেয়র নিজেও সংবাদকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা করার হুমকি দেন।

পরদিন খুলশী থানার ওসি আব্দুর রহিমের ওপর প্রকাশ্যে ক্ষোভ ঝাড়েন মেয়র। এর মাত্র দুই ঘণ্টার মাথায় ওই ওসিকে বদলি করা হয়।

তবে নগর ভবনে বগার থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন মেয়র শাহাদাত। তার দাবি, খুলশী থানার ওসি অহেতুক মামলা দিয়ে হয়রানি করছেন—এমন অভিযোগ নিয়ে বগার দুই ভাই তার কাছে এসেছিলেন। তিনি শুধু তাদের কথা শুনেছেন, কোনো পদক্ষেপ নেননি।

মেয়রের এমন কর্মকাণ্ড অবশ্য নতুন নয়। এর আগে ফুটপাত উচ্ছেদের সময় তিনি এক গাড়িচালককে কান ধরে ওঠবস করিয়েছিলেন।

এরপর বাঁশখালীর মানুষকে ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিয়ে ‘পেটানো উচিত’ বলে মন্তব্য করার পর তীব্র সমালোচনার মুখে তিনি ক্ষমা চান। নতুন এই ঘটনার পর এখন মেয়রের সঙ্গে বগার সম্পর্ক নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠছে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রাম জেলার সাধারণ সম্পাদক আকতার কবির চৌধুরী ‘টাইমস’কে বলেন, ‘ওসির বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে প্রতিকার চাওয়ার আইনি পথ আছে। কিন্তু প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ বা গালমন্দ করা কোনো দায়িত্বশীল জনপ্রতিনিধির কাজ হতে পারে না।’ আকতার কবির মনে করেন, মেয়রের এসব কর্মকাণ্ড অপরাধীদের প্রশ্রয় দেওয়ার মানসিকতাকেই স্পষ্ট করে।

চট্টগ্রাম নগর জামায়াতের আমির মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম ‘টাইমস’কে বলেন, ‘মেয়াদোত্তীর্ণ মেয়র যা করেছেন, তাতে তিনি নিজেই প্রমাণ করেছেন যে তিনি চট্টগ্রামের সন্ত্রাসীদের গডফাদার।’
নজরুল ইসলাম আরও বলেন, ‘একারণেই আজ চারপাশে স্লোগান উঠছে—ডক্টর শাহাদাত চমৎকার, মেয়াদ শেষ তিনি সন্ত্রাসীদের গডফাদার।’

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) চট্টগ্রাম নগর শাখার সদস্য সচিব আরিফ মঈনুদ্দিন বলেন, বিএনপির কোনো চাঁদাবাজ বা সন্ত্রাসী ধরা পড়লে বা ধরার চেষ্টা করলেই ১০ মিনিটের মধ্যে ওসি আওয়ামী লীগের লোক হয়ে যান। আর ভাগবাটোয়ারা মিললে তিনি আবার বিএনপির ওসি। এ যেন এক ‘এন্টারপ্রাইজ ও চাঁদাবাজ সন্ত্রাসী গ্যাং’!

মেয়রের চোখে বগা ‘সংগ্রামী’, ভাইয়েরা ভুক্তভোগী

অভিযানের পর শাহাদাত প্রকাশ্যে বগার প্রশংসা করে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের ১৭-১৮ বছর বগা লড়াই-সংগ্রামে ছিলেন। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনেও অবদান রেখেছেন।
তবে পুলিশের খাতায় বগার হিসাব ভিন্ন। চার মাস আগে পর্যন্ত বগা চট্টগ্রাম স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। কিন্তু একের পর এক অপরাধের অভিযোগ ওঠায় গত ৮ জুন তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।

পুলিশ জানায়, অস্ত্র, মাদক ও চাঁদাবাজিসহ তার বিরুদ্ধে ২৩টি মামলা রয়েছে। তার প্রভাবের কারণে অনেক সময় পুলিশও অসহায় হয়ে পড়েছিল।

গত ২৯ আগস্ট পাহাড়তলী কলেজের শিক্ষক মিজানুর রহমানকে অপহরণ ও মারধরের অভিযোগে খুলশী থানায় বগার বিরুদ্ধে মামলা হয়।

মামলা নেওয়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে বগা ওসিকে ‘আওয়ামী লীগ’ বলে গালমন্দ করেন এবং উলঙ্গ করে পেটানোর হুমকি দেন উল্লেখ করে ওসি রহিম থানায় জিডি করেন।

 

এরপর ৪ সেপ্টেম্বর সকালে বগাকে ধরতে গেলে পুলিশের ওপর হামলা চালানো হয়। এতে ওসি রহিমসহ ছয় পুলিশ সদস্য আহত হন এবং পুলিশের একটি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়।

এই ঘটনার পর বগার বাবা উল্টো ওসির বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেন। তার অভিযোগ, পুলিশ তাদের ঘরে ঢুকে ভাঙচুর, লুটপাট ও মারধর করেছে।

গত ২৯ সেপ্টেম্বর ওয়্যারলেস কলোনিতে ‘সেভেন স্টার’ ও ‘ফাইভ স্টার’ নামে দুই কিশোর গ্যাংয়ের সংঘর্ষে হৃদয় নামে এক তরুণ খুন হন। সেই মামলার আসামির তালিকায়ও বগার নাম আছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, সেভেন স্টার হলো বগার দল, আর ফাইভ স্টার হলো খুলশী থানা যুবদলের আহ্বায়ক হেলাল হোসেনের দল।

মঙ্গলবার নগর ভবনে পুলিশ যখন ঘেরাও দেয়, সেদিনও খুলশী থানায় বগাসহ ৩৬ জন এবং অজ্ঞাতনামা আরও দেড়শ-দুইশ জনের বিরুদ্ধে নতুন মামলা হয়। অভিযোগ—জমি দখল, চাঁদাবাজি ও অপহরণ।

মামলার বাদী এজাহারে পাঁচটি ঘটনার কথা জানান। যার মধ্যে ১১ ফেব্রুয়ারি ও ২৫ এপ্রিল তাকে তুলে নিয়ে বগার আস্তানায় আটকে রেখে চাঁদা দাবি করার কথা উল্লেখ রয়েছে।

তবে মেয়রের দাবি, ওসি ও এক এসআই মিলে কামরুল নামে এক আসামিকে মারধর করে জোর করে বগা এবং তার ভাইয়ের নাম বলায়। আর সেই ভিত্তিতে মামলা দেয়।

ওসি কেন বদলি হলেন?

বুধবার চট্টগ্রাম নগরীর ঈদগাহ এলাকার এক অনুষ্ঠানে খুলশী থানার ওসির ওপর ক্ষোভ উগড়ে দেন মেয়র শাহাদাত। তার অভিযোগ, ওসি অহেতুক বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের মামলায় ফাঁসিয়ে হয়রানি করছেন।

এই বক্তব্যের দুই ঘণ্টার মধ্যে ওসি রহিমকে পদ থেকে সরিয়ে সিএমপির বিশেষ শাখায় (এসবি) পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

অবশ্য এটাকে ‘নিয়মিত বদলি’ বলে দাবি করেছেন সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম) ফয়সাল আহমেদ।

অথচ গত ২৪ আগস্ট খুলশী থানায় যোগ দিয়েছিলেন রহিম। দেড় মাসের মাথায় বদলি কীভাবে ‘নিয়মিত’ হয়—জানতে চাইলে ফয়সাল বলেন, ‘কোনো ওসির যোগ্যতা না থাকলে তাকে বদলি করা হতেই পারে।’

তবে এটাকে সাধারণ বদলি হিসেবে মানতে রাজি নন আকতার কবির চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘মেয়রের ক্ষোভ প্রকাশের পরপরই এমন পদক্ষেপ প্রমাণ করে প্রশাসন আর ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে কোনো ভারসাম্য নেই। এতে আমজনতার কাছে ভুল বার্তা যায়।’

সাংবাদিকদের লাঞ্ছনা, তারপর হুমকি

ঘটনার রাতে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সাংবাদিকরাও হেনস্থার শিকার হন। কালের কণ্ঠের চট্টগ্রাম ব্যুরোর রিপোর্টার অনিক আকন্দ ‘টাইমস’কে বলেন, ‘মেয়র উঁচু গলায় আমাদের কাছে জানতে চান আমরা কেন ওখানে গেছি। এর পর মেয়র ও বগার অনুসারী কিছু লোক সাংবাদিকদের সঙ্গে চরম দুর্ব্যবহার করেন।’

ইনফো বাংলার রিপোর্টার রাইসা হাসান বলেন, ‘আরাফাত নামে এক সাংবাদিককে কয়েকজন টেনে নিয়ে যাওয়ার সময় আমি বাধা দিই। তখন লাল শার্ট পরা এক লোক আমাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়। এতে আমি আঘাত পাই।’

এদিকে ঘটনার খবর সংগ্রহ করতে যাওয়া চ্যানেল ২৪-এর আবাসিক সম্পাদক কামাল পারভেজের হোয়াটসঅ্যাপে বগার নম্বর থেকে বার্তা পাঠানো হয়। বার্তায় লেখা ছিল—‘টাকা খেয়ে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা খবর করছেন। আপনারও বিচার হবে।’

এ ঘটনার প্রতিবাদে পরদিন বিকালে নগরীর কাজীর দেউড়ি এলাকায় মানববন্ধন করেন সাংবাদিকরা।

অন্যদিকে, মেয়র শাহাদাতও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা করার হুমকি দেন। তার দাবি, আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী বগাকে জড়িয়ে গল্প বানিয়ে তার সম্মান নষ্ট করছে। যেসব সংবাদমাধ্যম প্রমাণ ছাড়া এসব প্রচার করবে, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান মেয়র।

চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সবুর শুভ ‘টাইমস’কে বলেন, ‘যেহেতু জায়গাটি মেয়রের কার্যালয়, তাই সেখানে সন্ত্রাসী ছিল না—তা প্রমাণের দায়িত্ব মেয়রেরই। সত্যিটা বের করতে মেয়রের সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ করা উচিত।’

পুলিশের কথায় অমিল

সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) ফয়সাল আহমেদ ‘টাইমস’-এর কাছে নগর ভবনে পুলিশের অভিযানের কথা অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, পুলিশের কাজে কেউ বাধাও দেয়নি।’

তবে সিএমপির সহকারী কমিশনার (মিডিয়া) আমিনুর রশীদ বলছেন ভিন্ন কথা। তিনি জানান, ‘গোপন সূত্রে খবর ছিল বগা টাইগারপাস এলাকায় আছে। আমাদের লোকজন টাইগারপাসসহ আশপাশের রাস্তায় ছিল। কিন্তু খবর পেয়ে সে আগেই কেটে পড়ে, তাই ধরা সম্ভব হয়নি।’

শাহাদাত কীভাবে এখনো মেয়র?

আইন অনুযায়ী, ২০২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি থেকে হিসাব করলে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের পাঁচ বছরের মেয়াদ ২০২৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি শেষ হয়ে গেছে।

শাহাদাত ২০২১ সালের নির্বাচনের ফল চ্যালেঞ্জ করে আদালতে গিয়েছিলেন। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর ১ অক্টোবর আদালত তার পক্ষে রায় দেয়, ৩ নভেম্বর তিনি মেয়র পদে শপথ নেন।

তবে রায়ে নতুন করে পাঁচ বছর মেয়াদের কথা বলা হয়নি। এরপরও মেয়াদ শেষ হওয়ার পর সেখানে কোনো নতুন নির্বাচন হয়নি বা প্রশাসক বসানো হয়নি।

শাহাদাত এখনো মেয়রের পদে বহাল থাকার আইনগত ভিত্তি নিয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় বা শাহাদাত—কেউই আদালতের পরিষ্কার নির্দেশনা চাননি।

তবে শাহাদাত চট্টগ্রাম সংবাদকর্মীদের একাধিকবার বলেছেন, আদালতের রায় অনুযায়ী তার মেয়াদ ২০২৯ সালের ৩ নভেম্বর পর্যন্ত বহাল থাকবে।