Image description

আগামী বছরের জানুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে দেশের সব ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন শেষ করার পরিকল্পনা করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তবে নির্বাচনের সময়সূচি নির্ধারণে সরকারের সঙ্গে আলোচনা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরীক্ষার সূচি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় নিতে হচ্ছে কমিশনকে।

 

নির্বাচনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে সেনাবাহিনী মোতায়েনের কথা জানিয়েছে সরকার। কমিশনও পরিস্থিতি বিবেচনায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলছে।

 

দেশে চার হাজার ৫৮০টি ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় চার হাজার ২৭২টির নির্বাচন আইন অনুযায়ী মেয়াদ শেষ হওয়ার আগের ১৮০ দিনের মধ্যে আয়োজনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ। আগামী বছরের ৬ জুনের আগেই ইউপি নির্বাচন শেষ করতে চায় কমিশন।

 

আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের সানাউল্লাহ বলেন, “আগামী সোমবার কমিশন সভা রয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন কবে শুরু হবে, কোন ধাপ কবে হবে, তা জানিয়ে দেওয়া হবে।”

 

কমিশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, জানুয়ারিতে নির্বাচন শুরু করে রমজানের আগে কয়েক ধাপে ভোট গ্রহণ করা হতে পারে। এরপর পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে রমজানের পরও নির্বাচন চলবে। তবে ধাপ ও তারিখ এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

 

সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে সময়সূচি

নভেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরুর পরিকল্পনা করেছিল ইসি। গত সেপ্টেম্বরে প্রাক-প্রস্তুতিমূলক সভা শেষে সাত ধাপে ইউপি নির্বাচনের পরিকল্পনা জানানো হয়। তখন প্রথম ধাপের সম্ভাব্য ভোটের তারিখ ছিল ১২ নভেম্বর।

 

পরে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, সম্ভাব্য তারিখগুলো নিয়ে ইসির সঙ্গে যোগাযোগ হয়নি। এরপর ১৭ সেপ্টেম্বর আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় নির্বাচনের উপযুক্ত সময় নির্ধারণের বিষয়টি আলোচনায় আসে।

 

নভেম্বর-ডিসেম্বরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা, শিক্ষকদের পরীক্ষাসংক্রান্ত দায়িত্ব এবং পিছিয়ে পড়া শিক্ষা কার্যক্রমের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ওই সময়ে নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করে কমিশন।

 

ওই সময় নির্বাচন কমিশনার সানাউল্লাহ বলেন, “নভেম্বর-ডিসেম্বরে পরীক্ষা থাকায় নির্বাচনের জন্য সময় কম। জানুয়ারিতে কিছুটা সময় পাওয়া গেলেও ফেব্রুয়ারির শুরুতে রমজান এবং এরপর এসএসসি পরীক্ষা শুরু হবে। এসএসসি পরীক্ষা শেষে এইচএসসি পরীক্ষা শুরুর আগেও কিছুটা সময় পাওয়া যাবে। এই সময়ের মধ্যে নির্বাচন শেষ করতে হবে।”

 

গত ১ অক্টোবর স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, “জনগণের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর ও জনমুখী করতে নিয়মিত নির্বাচনের বিকল্প নেই। সে লক্ষ্যেই আগামী বছরের জানুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে দেশের সব ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সম্পন্ন করার লক্ষ্যে কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

 

নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেছেন, “স্থানীয় সরকার নির্বাচনের কোনটি আগে হবে, তা ঠিক করতে সরকারের সঙ্গে আলোচনা প্রয়োজন। সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন একসঙ্গে আয়োজন করা সম্ভব নয়। কোন প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন আগে হবে, তা নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে সময়সূচি ঘোষণা করা হবে।”

 

সরকারের পক্ষ থেকে জানুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে ইউপি নির্বাচন সম্পন্ন করার কথা বলা হয়েছে। কমিশনও এই সময়ের মধ্যে নির্বাচন শেষ করার পরিকল্পনা করছে। তবে কোন ধাপে কোন এলাকার নির্বাচন হবে এবং অন্যান্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সঙ্গে কীভাবে সময়সূচি সমন্বয় করা হবে, তা কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পর স্পষ্ট হবে।

 

সীমিত সময়ে কয়েক হাজার ইউপিতে ভোট

আব্দুর রহমানেল মাছউদের বক্তব্য অনুযায়ী, জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে প্রথম ধাপের ভোট শুরু করা গেলে রমজানের আগে তিন ধাপে প্রায় দুই হাজার ইউপিতে নির্বাচন করা সম্ভব হতে পারে। প্রথম ধাপের ভোট জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে হলে ৪০ থেকে ৪৫ দিন আগে তফসিল ঘোষণা করা হবে। রমজানের পর পরিস্থিতি বিবেচনা করে আবার নির্বাচন শুরু করে জুনের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

 

নির্বাচনের ধাপ ও সময় নির্ধারণের পাশাপাশি ভোটকেন্দ্র প্রস্তুত, নির্বাচনী সরঞ্জাম সরবরাহ, ভোট গ্রহণের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের নিয়োগ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের দায়িত্ব বণ্টন করতে হবে। একাধিক ধাপে নির্বাচন হলে প্রতিটি ধাপের প্রস্তুতি ও পরবর্তী ধাপের সময়সূচি সমন্বয় করাও প্রয়োজন হবে।

 

প্রথম ধাপে কোন এলাকার ইউপিতে নির্বাচন হবে, তা নিয়েও আলোচনা চলছে। শুরুতে জেলার সদর উপজেলার সব ইউপিতে নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা থাকলেও একটি বিভাগের সব জেলার ইউপিতে একসঙ্গে ভোট করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ।

 

একটি বিভাগে একসঙ্গে নির্বাচন হলে প্রয়োজনে অন্য বিভাগ থেকে জনবল এনে দায়িত্ব দেওয়ার সুযোগ থাকতে পারে। তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। কোন পদ্ধতিতে নির্বাচন আয়োজন করা হবে, তা নির্ধারণের সময় জনবল ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে।

 

আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কী পরিকল্পনা

ইউপি নির্বাচনে সহিংসতার আশঙ্কার কথা বলেছে ইসি। এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতা চাওয়ার পাশাপাশি তফসিল ঘোষণার পর তাদের সঙ্গে আলোচনার পরিকল্পনা রয়েছে ইসির। নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ চরচাকে বলেন, “আগামী সোমবারের কমিশন সভায় রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলোচনার বিষয়টি থাকবে। আমরা ইউপি নির্বাচনের দিন-তারিখ ঠিক করার পরই দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ করব।”

 

 

গত ১ অক্টোবর স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, “নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য হতে হবে। ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হবে।” নির্বাচন পরিচালনায় কোনো ধরনের অনিয়ম বা বিশৃঙ্খলার সুযোগ দেওয়া হবে না বলেও জানান তিনি।

অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনার রহমানেল মাছউদ বলেছেন, “প্রথম ধাপের নির্বাচন যত দূর সম্ভব নিরাপদ পরিবেশে আয়োজনের চেষ্টা থাকবে। প্রথম ধাপের পর পরিস্থিতি প্রত্যাশিত না হলে পরবর্তী ধাপে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে সেনাবাহিনী মোতায়েনের বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে।”

 

সরকার ও কমিশনের বক্তব্যে নির্বাচনী নিরাপত্তার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা রয়েছে। কমিশনের বক্তব্য থেকে কিছুটা স্পস্ট যে, সেনাবাহিনী মোতায়েনের বিষয়ে পরিস্থিতি বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। প্রথম ধাপের ভোটে সেনাবাহিনী মোতায়েন থাকছে না। ওই ধাপে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হলে পরবর্তী ধাপগুলোতে সেনা মোতায়েন করা হবে।

 

নির্বাচনের নিরাপত্তা পরিকল্পনার মধ্যে পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব, ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা এবং নির্বাচনী এলাকায় বাহিনী মোতায়েনের বিষয়ও রয়েছে। নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনায় এসব বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত আসে, তা থেকেও নিরাপত্তা পরিকল্পনার বিস্তারিত জানা যেতে পারে।

 

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে দেশে আর কোনো স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট অনুযায়ী, সর্বশেষ ২০২২ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি ১৩৮টি ইউনিয়ন পরিষদে এবং একই বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি আরও আটটি ইউপিতে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

 

দীর্ঘ বিরতির পর ইউপির পাশাপাশি পৌরসভা, উপজেলা, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন নির্বাচনও আয়োজন করতে হবে কমিশনকে। ফলে কোন নির্বাচন কখন হবে, তা নির্ধারণে সরকারের সঙ্গে আলোচনা এবং মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতির সমন্বয় প্রয়োজন।

 

আগামী সোমবারের কমিশন সভায় ইউপি নির্বাচনের ধাপ ও সময়সূচি জানানো হতে পারে। এর মধ্য দিয়ে জানুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে নির্বাচন শেষ করার পরিকল্পনা সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় নিরাপত্তাব্যবস্থা ও সেনাবাহিনী মোতায়েনের বিষয়ে কমিশনের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা থাকবে।

 

ইউপি নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি মূল্যায়নে তাই গুরুত্বপূর্ণ হবে- সরকারের সঙ্গে আলোচনা শেষে সময়সূচি কীভাবে নির্ধারিত হয়, ঘোষিত সময়ের মধ্যে ভোট গ্রহণের প্রশাসনিক প্রস্তুতি কতটা এগোয় এবং নির্বাচনী নিরাপত্তার বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়নের তথ্য পাওয়া গেলেই কমিশনের প্রস্তুতির পরিধি আরও স্পষ্টভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।