বরগুনার রিফাত শরীফ হত্যার সাত বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। মামলাটি বিচারিক আদালতের রায়ের পর উচ্চ আদালতে আসামিদের ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। নিহতের স্ত্রী ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আয়শা সিদ্দিকা মিন্নি তখন থেকে বরিশাল কারাগারের কনডেম সেলে অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছেন। সেখানে ইবাদত-বন্দেগি করেই দিন পার করছেন তিনি, চূড়ান্ত বিচারের অপেক্ষা তার যেন ফুরায় না। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানির জন্য পেপারবুক প্রস্তুত প্রক্রিয়ায় রয়েছে। আইনজীবীরা দ্রুত শুনানির জন্য দাবি জানিয়েছেন।
বরগুনা সরকারি কলেজে ২০১৯ সালের ২৬ জুন দুপুরে রিফাতকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এ মামলায় ২০২০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর আদালত প্রাপ্তবয়স্ক ১০ আসামির মধ্যে নিহতের স্ত্রী মিন্নিসহ ছয় আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন। রায়ের পর আসামিদের ডেথ রেফারেন্সের (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) জন্য নথিপত্র ২০২০ সালের ৪ অক্টোবর হাইকোর্টে আসে। অন্যদিকে দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে মিন্নিসহ ছয় আসামি ওই বছরই পৃথক আপিল করেন। পাশাপাশি অসুস্থতাসহ বিভিন্ন গ্রাউন্ডে গত বছর হাইকোর্টে জামিন আবেদন করেন মিন্নি, যা শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।
বর্তমানে উচ্চ আদালতে ১২৬৫টি ডেথ রেফারেন্স শুনানির অপেক্ষায় আছে। গত কয়েক বছর আগে একই সময়ে শুনানির অপেক্ষায় ছিল ৮৪৩টি। ডেথ রেফারেন্স কোর্টের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সৈয়দ ইজাজ কবির যুগান্তরকে বলেন, বর্তমানে ২০১৯ সালে আসা ডেথ রেফারেন্সগুলো শুনানি হচ্ছে। রিফাত হত্যার ডেথ রেফারেন্সটি বর্তমানে কোন অবস্থায় আছে, সেটি খোঁজ নিয়ে জানানো যাবে।
একজন ফাঁসির আসামিকে হাইকোর্টে মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বছরের পর বছর কনডেম সেলে থাকতে হচ্ছে। আর হাইকোর্ট যদি কোনো আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন, তাহলে বিচারিক আদালত থেকে সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগে মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ১৫ থেকে ২০ বছর বা আরও বেশি সময় কনডেম সেলে থাকতে হচ্ছে। আবার কোনো মৃত্যুদণ্ডের আসামি ২০ বছর কনডেম সেলে থাকার পর আপিল বিভাগে খালাসও পাচ্ছেন।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বিচারের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির কনডেম সেলে বছরের পর বছর থাকা মানবাধিকারের লঙ্ঘন। যেহেতু একটি হত্যা মামলা চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হতে ১৫-২০ বছর লেগে যাচ্ছে, সে ক্ষেত্রে ফাঁসির আসামিদের কনডেম সেলের বাইরে রাখা যায়। কারণ চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হওয়ার আগ পর্যন্ত কাউকে দোষী বলা ঠিক হবে না।
মিন্নির আইনজীবী জেড আই খান পান্না যুগান্তরকে বলেন, এই হত্যাকাণ্ডে মিন্নির জড়িত থাকা নিয়ে সাক্ষীদের একেক রকম বক্তব্য, কারাগারে অসুস্থতা ও নারী কয়েদি বিবেচনায় ২০২২ সালের ১৬ অক্টোবর হাইকোর্টে জামিন আবেদন করা হয়। ২০২৩ সালের ১১ জানুয়ারি জামিন আবেদন শুনতে অপারগতা প্রকাশ করেন হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ। পরে অন্য একটি বেঞ্চে জামিন আবেদনটি উপস্থাপন করা হলে আদালত মুলতবি করেন। তালিকায় আর আসেনি।
সংশ্লিষ্ট বেঞ্চের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল যুগান্তরকে বলেন, বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কোনো আসামির এ পর্যন্ত জামিনের কোনো নজির নেই। আসামিপক্ষে সিনিয়র আইনজীবী শুনানি করবেন, তাদের পক্ষে সময়ের আবেদন করলে আদালত মুলতবি করেন।
মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর যুগান্তরকে বলেন, ষড়যন্ত্র করে মেয়েকে ফাঁসানো হয়েছে। এতে সাবেক এমপি ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর হাত রয়েছে। তিনি বলেন, মাসে একবার মেয়েকে দেখতে দেয় কারা কর্তৃপক্ষ। তার শারীরিক অবস্থা ভালো নয়। এদিক বিবেচনা করে অন্তত মিন্নিকে জামিন দিতে পারেন আদালত।
কনডেম সেলে ইবাদত-বন্দেগি করেই দিন পার : মিন্নির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বাবা-মা ও স্বজনদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ এবং মামলা পরিচালনার সুবিধার্থে কাশিমপুর কারাগার থেকে বরিশালে পাঠানো হয়। কারাগারটির কনডেম সেলের একমাত্র নারী আসামি মিন্নি। জানা গেছে, কনডেম সেলে ইবাদত-বন্দেগি করেই দিন পার করছেন তিনি।
কারাবিধি অনুযায়ী, কনডেম সেলের বন্দির দুই সেট করে পোশাক দেওয়া হয়েছে। তারা সেল থেকে বের হতে পারেন না। তবে মাসে একবার স্বজনদের সঙ্গে দেখা করতে পারেন। সপ্তাহে একবার নির্দিষ্ট সময় পরিবারের সঙ্গে ফোনে কথা বলতে পারেন। মিন্নির ক্ষেত্রেও বাইরের কারো সঙ্গে কথা বলার তেমন একটা সুযোগ নেই। বাবা-মা দেখা করতে এলে তাদের সঙ্গেই তার যত কথা। এছাড়া বাকি সময় ইবাদত-বন্দেগি করেই কাটে তার সময়।
কারা কর্তৃপক্ষ সূত্র জানা যায়, মিন্নির মধ্যে কোনো অস্থিরতা বা আবেগ প্রকাশ পায়নি। তিনি সব সময় চুপচাপ থাকেন। তবে তাকে নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতে দেখা যায়। কারাগারে তার আচার-আচরণও সন্তোষজনক। এখন পর্যন্ত কারাগারে কোনো অপরাধে জড়িত হননি তিনি।