আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নেওয়া অপ্রয়োজনীয় ও রুগণ শিল্প প্রকল্পের দায় নিতে চায় না বিএনপি সরকার। বছরের পর বছর ঝুলে থাকা প্রকল্পে নতুন করে অর্থ ঢালার বদলে কোন প্রকল্প কেন নেওয়া হয়েছিল, কত টাকা খরচ হয়েছে এবং কেন তা বাস্তবায়িত হয়নি-তার হিসাব চেয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।
একই সঙ্গে লোকসান ও গ্যাস সংকটে বন্ধ থাকা সার কারখানা, চিনিকলসহ রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পে নতুন বিনিয়োগ ও আধুনিক প্রযুক্তি এনে ফের উৎপাদনে ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে বছরে ৫-৬ হাজার কোটি টাকার সার আমদানির চাপ কমিয়ে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোই এখন সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।
জাতীয় সংসদ ভবনের ক্যাবিনেট কক্ষে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত শিল্প মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠকে এসব বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা ও সিদ্ধান্ত হয়। কমিটির সভাপতি মো. আবুল কালাম, শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরসহ কমিটির সদস্য এবং মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
সভাপতির বক্তব্যেই বিগত সরকারের প্রকল্প নিয়ে কমিটির কঠোর অবস্থান স্পষ্ট হয়। ২০১৮ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত নেওয়া বিভিন্ন প্রকল্পের ব্যয়, বাস্তব অগ্রগতি, দীর্ঘসূত্রতার কারণ এবং বর্তমান অবস্থার সচিত্র প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছে সভায়। একই সঙ্গে বিসিআইসির আওতাধীন বন্ধ ও চালু সার কারখানা এবং শিল্প মন্ত্রণালয়ের নতুন প্রকল্পের বিস্তারিত তালিকাও দিতে বলা হয়।
আগের প্রকল্পের হিসাব দিতে হবে : বিসিআইসির বাফার গুদাম নির্মাণসহ বিভিন্ন প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সভাপতি মো. আবুল কালাম স্পষ্ট করে বলেন, ২০১৮ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত গৃহীত প্রকল্পগুলোর দায়ভার বর্তমান কমিটি নেবে না। ওই সময়ে নেওয়া প্রকল্পের ব্যয়, অগ্রগতি ও বাস্তব পরিস্থিতির সচিত্র ব্যাখ্যা দিতে হবে। কমিটি মনে করছে, শুধু প্রকল্প গ্রহণ করলেই শিল্পায়ন হয় না।
প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা, অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা, বাস্তবায়ন সক্ষমতা এবং শেষ পর্যন্ত জনগণ ও অর্থনীতির কী উপকার হচ্ছে-এসব বিষয়ও মূল্যায়ন জরুরি। এ কারণে পুরোনো প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে কোথায় কত টাকা খরচ হয়েছে, কতটুকু কাজ হয়েছে এবং কেন প্রকল্প শেষ হচ্ছে না-তার পূর্ণাঙ্গ চিত্র চাওয়া হয়েছে। সভায় ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে শিল্প মন্ত্রণালয়কে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখার তাগিদ দেওয়া হয়। অর্থাৎ শুধু নতুন প্রকল্প গ্রহণ নয়, বিদ্যমান সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং বন্ধ শিল্প পুনরুজ্জীবনকেও অগ্রাধিকার দিতে বলা হয়েছে।
শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির সভায় বলেন, অতীতের অপচয় বন্ধ করে রাষ্ট্রীয় ব্যয় কমাতে হবে। ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরি এবং বন্ধ সার ও চিনিকলগুলোয় নতুন বিনিয়োগ এনে আধুনিকায়ন করতে হবে। রুগণ কারখানাগুলোকে লাভজনক করার লক্ষ্যে তিন মাসের মধ্যে প্রাথমিক প্রতিবেদন দেওয়ার কথাও জানান তিনি।
শিল্প খাতের এই অবস্থানকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। এ প্রসঙ্গে সাবেক বাণিজ্য সচিব মাহবুব আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে অতীতের ব্যর্থতার দায় শুধু বহন না করে, কেন প্রতিষ্ঠানগুলো টেকসই হতে পারেনি, সেটি আগে বের করা দরকার। তিনি বলেন, বন্ধ কারখানা পুনরায় চালুর উদ্যোগ ভালো। তবে শুধু অর্থ বরাদ্দ করলেই হবে না। বাজার, কাঁচামাল, জ্বালানি, ব্যবস্থাপনা ও উৎপাদন খরচ-সবকিছুর সমন্বিত হিসাব করে কোন প্রতিষ্ঠান চালু করা অর্থনৈতিকভাবে যৌক্তিক, সেটি নির্ধারণ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পকে বাঁচাতে হলে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক বিবেচনার পরিবর্তে বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। যেসব কারখানা চালু করলে কর্মসংস্থান ও আমদানি বিকল্প তৈরি হবে, সেগুলো অগ্রাধিকার পেতে পারে।
বছরে ৫-৬ হাজার কোটি টাকার সার আমদানি : বাংলাদেশের সার শিল্পের অন্যতম বড় সমস্যা গ্যাস সংকট। গ্যাসের অভাবে দেশীয় সার উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় কৃষির চাহিদা মেটাতে বিপুল অর্থ ব্যয়ে সার আমদানি করতে হচ্ছে।
শিল্পমন্ত্রী জানান, বছরে প্রায় ৫-৬ হাজার কোটি টাকার সার আমদানি করতে হয়। গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতে সার রপ্তানির সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে বলে জানান তিনি। এজন্য এফএসআরইউ-এর মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহের উদ্যোগের কথাও বৈঠকে তুলে ধরা হয়।
এ প্রসঙ্গে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন যুগান্তরকে বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগ অর্থনৈতিকভাবে যৌক্তিক হতে পারে। তবে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের কস্ট বেনিফিট বিশ্লেষণ জরুরি। বছরের পর বছর লোকসান দেওয়া প্রতিষ্ঠান শুধু সরকারি অর্থ ঢেলে চালু করলে তা টেকসই হবে না।
তিনি মনে করেন, কারখানা চালু করতে কত বিনিয়োগ লাগবে, কত কর্মসংস্থান হবে, উৎপাদিত পণ্যের বাজার আছে কি না এবং উৎপাদন ব্যয় আমদানিকৃত পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারবে কি না-এসব বিষয় আগে যাচাই করতে হবে। একই সঙ্গে পুরোনো প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি বা অনিয়ম থাকলে জবাবদিহিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
চিনিকলে নতুন ভাবনা : বন্ধ চিনিকল চালুর ক্ষেত্রেও নতুন পরিকল্পনার কথা উঠে এসেছে। শিল্পমন্ত্রী জানান, আখের পাশাপাশি আধুনিক ‘বিট সুগার’ চাষের মাধ্যমে দেশে চিনির ঘাটতি পূরণের সম্ভাবনা বিবেচনা করা হচ্ছে। কমিটির সদস্যরা কারখানার বিদ্যুৎ ব্যয় কমানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেন। সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া কারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল স্থাপনের প্রস্তাব দেন।
সদস্য বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতার সমালোচনা করে ফাইল আটকে রাখার প্রবণতা বন্ধের দাবি জানান। আল ফারুক আব্দুল লতিফ উত্তরাঞ্চলের সস্তা শ্রম ও ভৌগোলিক সুবিধা কাজে লাগিয়ে শিল্পায়নের আহ্বান জানান এবং বন্ধ কারখানার প্রকৃত কারণ তদন্তের দাবি করেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহী অঞ্চলে আমভিত্তিক খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প ও কোল্ডস্টোরেজ স্থাপনের দাবি জানান সদস্য মো. কেরামত আলী। সভায় আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতারও কঠোর সমালোচনা হয়। সদস্য বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ফাইল চলাচলের ধীরগতি এবং নথি আটকে রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। মন্ত্রণালয়ের কাজে দীর্ঘসূত্রতা সহ্য করা হবে না বলেও তিনি সতর্ক করেন। আর সদস্য মনজুর এলাহী বন্ধ কারখানা চালুর পাশাপাশি বৃহৎ কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর গুরুত্ব দেন। কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বন্ধ ও রুগণ শিল্প পুনরায় চালুর জন্য প্রয়োজনীয় বাজেট, ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল ও কারিগরি মূল্যায়ন প্রতিবেদন দিতে হবে। পরীক্ষামূলকভাবে এক বছরের মধ্যে অন্তত একটি সার বা চিনিকলকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব উদ্যোগ সফল করতে হলে শুধু বন্ধ কারখানা চালু নয়, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জন্য বাস্তবসম্মত ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, বিনিয়োগ কাঠামো, উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ও জবাবদিহির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিকভাবে অকার্যকর প্রকল্পের বিষয়ে কঠিন ও বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়াও জরুরি।