Image description

একসময় দেশে নির্ভরযোগ্য যোগাযোগমাধ্যম ছিল বাংলাদেশ ডাক বিভাগ। মানুষের সুখ-দুঃখ, অপেক্ষা ও আবেগের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল প্রতিষ্ঠানটি। চিঠি, মানি অর্ডার, পার্সেল, সঞ্চয়পত্র, সরকারি বার্তা, চাকরির নিয়োগপত্র, পরীক্ষার প্রবেশপত্র থেকে আদালতের নোটিশ-সবই পৌঁছে যেত ডাকপিয়নের হাত ধরে। প্রিয়জনের একটি চিঠির জন্য ছিল কত প্রতীক্ষা। কিন্তু প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারায় আজ বেহাল দেশের অধিকাংশ ডাকঘর।

চিঠির জায়গা নিয়েছে মোবাইল ফোন, ই-মেইল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। মানি অর্ডারের জায়গা নিয়েছে মোবাইলভিত্তিক আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠানগুলো। কিন্তু ডাকঘরকে আধুনিক ও জনমুখী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে পারেনি ডাক বিভাগ। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার ডাকঘর ঘুরে দেখা গেছে-অনেক অফিস তালাবদ্ধ থাকে। কিছু অফিস দিনে দু-এক ঘণ্টার জন্য খোলা হয়। কর্মস্থলে অনুপস্থিত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। পোস্টম্যানদের কেউ কেউ অন্য পেশায় যুক্ত। ফলে কাগজে-কলমে সেবা থাকলেও বাস্তবে বঞ্চিত হচ্ছেন গ্রাহকরা।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ-জনবল সংকট, পরিচালনায় দুর্বলতা, পুরোনো ব্যবস্থাপনা, বেতন বৈষম্য, রাজস্ব খাতের বাইরের কর্মচারীদের নামমাত্র বেতনসহ নানা কারণে নিুমুখী সেবার মান। বিশেষজ্ঞরা বলছেন-এসব প্রতিষ্ঠান দ্রুত আধুনিকায়ন ও জনমুখী সংস্কার না হলে বিপুল সরকারি ব্যয়ে পরিচালিত ডাক বিভাগ কেবল অতীতের স্মৃতিবাহী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সারা দেশে ডাকঘরের সংখ্যা সাড়ে ৮ হাজার এবং প্রায় ৪০ হাজার কর্মী ডাক বিভাগে কর্মরত। বাংলাদেশ এনজিওস নেটওয়ার্ক ফর রেডিও অ্যান্ড কমিউনিকেশনসের (বিএনএনআরসি) প্রধান নির্বাহী এইচ এম বজলুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, দেশের সবচেয়ে বিস্তৃত অবকাঠামো ও জনবল রয়েছে বাংলাদেশ ডাক বিভাগের। প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত ডাকঘর ও ডাককর্মীর এই নেটওয়ার্ক বেসরকারি কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানের তুলনায় বড় সম্পদ। তবে সময়োপযোগী সংস্কার ও আধুনিকায়নের অভাবে সেই সম্ভাবনা কাজে লাগানো যায়নি। ফলে দ্রুত বিকাশমান ই-কমার্স ও লজিস্টিকস খাতে ডাক বিভাগের অংশগ্রহণ ক্রমেই সীমিত হয়ে পড়ছে।

ডাক বিভাগের মহাপরিচালক (ডিজি) কাজী আসাদুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, প্রতিষ্ঠান ধরে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছি। জনবল সংকট রয়েছে। কোন অফিসগুলো তালাবদ্ধ থাকছে-সেই তালিকা আমাদের দিলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ঢাকার কয়েকটি ডাকঘরের চিত্র : বাংলাদেশ ডাক বিভাগের বর্তমান চিত্র তুলে ধরতে সম্প্রতি রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের কয়েকটি ডাকঘর সরেজমিন অনুসন্ধান করে দৈনিক যুগান্তর। এতে ডাকঘরের বেহাল চিত্র উঠে আসে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, অধিকাংশ সময় তালাবদ্ধ থাকে রাজধানীর মাণ্ডা ডাকঘর। অনুপস্থিত থাকেন পোস্টমাস্টার, ডাক বহনকারী কিংবা পোস্টম্যান। অভিযোগ রয়েছে, সাব-পোস্টমাস্টার ফাতেমা আক্তার নিজ বাসায় করেন দাপ্তরিক কাজ। এই সুযোগে বাসায় প্রাইভেট পড়ান শিক্ষার্থীদের।

মাণ্ডা ডাকঘরের পোস্টম্যান মো. আব্দুর রহমান বলেন, আমি একাই চিঠি গ্রহণ ও বিতরণের কাজ করি। চিঠি বিলি করতে বাইরে থাকায় অনেক সময় অফিস বন্ধ রাখতে হয়। ম্যাডাম (সাব-পোস্টমাস্টার) বাসায় থাকেন। তিনি নিয়মিত অফিসে আসেন না। অভিযোগের বিষয়ে সাব-পোস্টমাস্টার ফাতেমা আক্তার যুগান্তরকে বলেন, আমি নিয়মিত অফিসে যাই। বাসায় প্রাইভেট পড়ানোর অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, সরকার যে মাসিক ভাতা দেয় তা দিয়ে এক মাসের চা-খরচও চলে না।

সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল উপ-ডাকঘরে গিয়ে দেখা যায়, অফিসে তালা ঝুলছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা উপস্থিত নেই। প্রায় ৩০ মিনিট অপেক্ষার পর তালা খুলে ভেতরে প্রবেশ করেন সাব-পোস্টমাস্টার দীপক চন্দ্র দাস। তবে তখন কোনো সেবাগ্রহীতাও ছিল না। তিনি বলেন, এখানে আমরা দুজন দায়িত্ব পালন করি। একজন বাইরে থাকায় অফিস বন্ধ রেখে ওয়াশরুমে গিয়েছিলাম। বর্তমানে মূলত চিঠিপত্রের কাজ হওয়ায় গ্রাহকও খুব কম।

দয়াগঞ্জ পোস্ট অফিসে গিয়ে দেখা যায়, একাই দায়িত্ব পালন করছেন সাব-পোস্টমাস্টার আবুল হাসান। সেবাগ্রহীতা না থাকায় অনেকটাই অলস সময় কাটাচ্ছেন তিনি। জানতে চাইলে বলেন, আগে মানুষ নানা ধরনের ডাকসেবা পেত। সেবা কমায় গ্রাহকের সংখ্যাও কমছে। তবে অফিসে কাজ নেই, বিষয়টি এমন নয়। চিঠিপত্রের চাপ রয়েছে। আমি একাই দায়িত্ব পালন করি। প্রয়োজনে বাইরে গেলে অফিস বন্ধ থাকে।

সম্প্রতি সরেজমিন মতিঝিলের বিআইডিসি সাব-পোস্ট অফিসে তেমন গ্রাহকের উপস্থিতি দেখা যায়নি। অফিসের ভেতরে চিঠিপত্র প্রস্তুত করতে দেখা যায় সাব-পোস্টমাস্টার আবুল বাসারকে। তিনি বলেন, মতিঝিলে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেশি। মানুষ জরুরি আর্থিক সেবাগুলো ব্যাংক থেকেই নিয়ে থাকেন। ফলে আমাদের গ্রাহক তুলনামূলক কম।

বাসাবো সাব-পোস্ট অফিসে সেবাগ্রহীতাদের তেমন ভিড় দেখা যায়নি। অফিসের দায়িত্বশীলদের অবসর সময় কাটাতে দেখা যায়। সাব-পোস্টমাস্টার মো. ইমদাদুল হক যুগান্তরকে বলেন, গ্রাহক কম মানেই আমরা অলস বসে থাকি না। সঞ্চয়পত্র, এফডিআর, চিঠিপত্র, পার্সেল বুকিং ও ডেলিভারিসহ বিভিন্ন কাজে আমরা ব্যস্ত।

তবে খিলগাঁও উপ-ডাকঘরে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। সেখানে ছিল কর্মব্যস্ত পরিবেশ। সাব-পোস্টমাস্টার বিকাশ চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হওয়ায় কাজের চাপ বেশি। চিঠিপত্র বিতরণে নির্ধারিত সময়ের পরও অফিস খোলা রাখতে হয়। পার্সেল পাঠাতে আসা আরিফুল ইসলাম বলেন, জরুরি পার্সেল পাঠাতে মাঝেমধ্যেই আসি। অনেক সময় সেবা পেতে বিড়ম্বনার মুখে পড়তে হয়।

সবগুলো ডাকঘরের দেওয়ালে লম্বা সেবার তালিকা টানানো। এতে ডাকটিকিট ও পোস্টাল স্টেশনারি বিক্রি, রেজিস্ট্রিকরণ ও ফ্র্যাংকিং মেশিন পরিচালনা, জিইপি ও ইএমএস সেবা, পার্সেল, বিমা ও রেজিস্ট্রি, ভিপি দ্রব্য নিবন্ধন, সাধারণ মানি অর্ডার, সঞ্চয় ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্রসংক্রান্ত লেনদেন, ডাক জীবন বিমা, নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প বিক্রি, পোস্টাল অর্ডার এবং প্রাইজবন্ড বিক্রি ও ভাঙানো, পোস্টাল ক্যাশ কার্ড লেনদেন, মোবাইল মানি অর্ডার ইস্যু ও বিতরণ, সার্টিফিকেট অব পোস্টিং এবং ডাক প্রেরণসহ নানা ধরনের সেবা তালিকায় উল্লেখ করা। উল্লেখিত সেবাগুলো বর্তমানে অধিকাংশ ডাকঘরে বাস্তবে পাওয়া যায় না।

সরেজমিন পাওয়া এসব অভিযোগের বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি ঢাকা মেট্রোপলিটন সার্কেলের পোস্টমাস্টার জেনারেল মৌসুমী রহমান। মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি পোস্ট অফিসগুলোর এই চিত্র সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিতে অস্বীকৃতি জানান। সরাসরি কথা বলার অনুরোধও প্রত্যাখ্যান করেন। বিশেষ করে অভিযোগগুলোর সত্যতা, সেবার বেহাল, নিয়মিত তালাবদ্ধ থাকা ডাকঘর কিংবা জনভোগান্তির বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো উত্তর না দিয়ে বিষয়টি এড়িয়ে যান। এ বিষয়ে অন্য কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।

ডেপুটি পোস্টমাস্টার জেনারেল (ঢাকা উত্তর) মো. আব্দুল হামিদ যুগান্তরকে বলেন, অনেক ডাকঘরের ল্যাপটপ ও কম্পিউটার দীর্ঘদিনের পুরোনো। এগুলো পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় বাজেট পাওয়া যায় না। তারপরও পর্যায়ক্রমে সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা করছি। তিনি বলেন, জনবল সংকট রয়েছে এবং তদারকিতেও কিছু ঘাটতি আছে।

ঢাকার বাইরেও বেহাল : ঢাকার বাইরে থেকে যুগান্তরের স্টাফ রিপোর্টার ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরেও ডাকঘরগুলোর বেহাল চিত্র দেখা গেছে। রাঙামাটি জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ডাকঘর কোথাও আছে, আবার কোথাও শুধু নামেই। চিঠিপত্র নেই, ডাক নেই। তাই কোথাও কোথাও পোস্ট অফিস ও সাব পোস্ট অফিসে কাজকর্মও নেই। তবে ‘স্পিড পোস্ট সেবা’ চালুর মাধ্যমে ঘুরে দাঁড়িয়েছে রাঙামাটি প্রধান ডাকঘর। এই ডাকঘরটি প্রাইভেট কুরিয়ার সার্ভিসগুলোর মতো ব্যাপক সেবা দিচ্ছে। ডাক বিভাগের নিজস্ব পরিবহণ দিয়ে ঢাকাসহ সারা দেশে যে কোনো পণ্য দ্রুত ডেলিভারি দেওয়া হচ্ছে।

গাজীপুরের কালিয়াকৈরে ১৪টি ডাকঘর রয়েছে। এর মধ্যে বেশির ভাগের অবস্থাই খুব শোচনীয়। অধিকাংশ ডাকঘরের অস্তিত্ব নেই। ঢাকার ধামরাইয়ের কালামপুর সাব-পোস্ট অফিসের জীর্ণদশা। জরাজীর্ণ কক্ষ, নোংরা ও দুর্গন্ধময় পরিবেশ। নেই পর্যাপ্ত জনবল। নামমাত্র সম্মানি ভাতায় এখানে কাজ করেন তিনজন। খোলা থাকে প্রতি কার্যদিবসে মাত্র দুই ঘণ্টা। স্থানীয়রা জানান, এটি পাকিস্তান আমলে স্থাপিত হয়েছে। তবে আজ পর্যন্ত সরকারি রাজস্বের আওতায় আসেনি।

এখানে কর্মরতদের নামমাত্র সম্মানি ভাতা দেওয়া হয়। পোস্টমাস্টার দুলাল হোসেন সম্মানির বিষয়ে জানান, পোস্ট অফিসটিতে কর্মরত পোস্টমাস্টার, বিলিকারক ও রানার সরকারের কাছ থেকে খুবই কম মাসিক সম্মানি পেয়ে থাকেন। পোস্টমাস্টার পান ৫ হাজার ৮৪৩ টাকা, বিলিকারক ৪ হাজার ৩শ টাকা ও রানার পান ৪ হাজার ১শ টাকা। রাজস্বের আওতায় আনতে কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার দাবি জানিয়েছেন। কোনো সমাধান আসেনি।

সরেজমিন জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার কয়েকটি শাখা ডাকঘর ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ ডাকঘরে নেই উপযুক্ত কর্মপরিবেশ। অনেক ডাকঘরে নেই চিঠি রাখার বাক্স ও সাইনবোর্ডও। মানিকগঞ্জের সিংগাইরে ১১টি ডাকঘরের ভবন নেই, জনবল সংকটের কারণে অচলাবস্থা দেখা গেছে। অন্যদিকে দীর্ঘদিন সংস্কার না করায় চাঁদপুরের মতলব উত্তরে সাব-পোস্ট অফিস ও ব্রাঞ্চ পোস্ট অফিসগুলো জরাজীর্ণ হয়ে আছে। ভবনের ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ছে।

জানতে চাইলে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম যুগান্তরকে বলেন, আপনাদের (সাংবাদিক) অনুসন্ধানে যেসব অনিয়ম পেয়েছেন সেগুলোর তথ্য আমাদের দেন। এসব তথ্য ধরে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কারণ ডাক সেবার উন্নয়নে আমাদের কাজ চলমান রয়েছে। এই সেবা কীভাবে দ্রুত মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া যায়-সেভাবে কর্মপরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। এসব কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে আর কোনো সমস্যা থাকবে না।