Image description

রাজধানীর মেরুল বাড্ডা এলাকায় রাজউকের (রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ) জমি বেদখল করে গড়ে তোলা হয়েছে বহুমুখী বাণিজ্যকেন্দ্র। ২১ বছর ধরে জায়গাটি দখলে রেখেছে প্রভাবশালী চক্র। রামপুরা-কুড়িল রোর্ড-সংলগ্ন প্রায় ১১ একর এই জমির বর্তমান বাজারমূল্য আনুমানিক ১ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা। এ জমিটি দখলে রাখতে রাজউকের বিরুদ্ধে করা হয়েছে পাঁচটি রিট মামলা। তবে রাজউক কার্যকর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় বেহাত হয়েছে এ সম্পত্তি।    

নথিপত্রের তথ্যানুযায়ী, তৎকালীন ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (ডিআইটি-যা বর্তমানে রাজউক) আবাসিক প্রকল্পের জন্য ১৯৬২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি বাড্ডা মৌজার এই ১১ একর জমি অধিগ্রহণ করে। ঢাকা জেলা প্রশাসনের এলএ কেস নম্বর ১৩৮/৬১-৬২-এর আদেশ অনুযায়ী ওই বছরের ২৫ এপ্রিল টাউন ইমপ্রুভমেন্ট অ্যাক্ট-১৯৫৩-এর ৯৩-এ ধারায় ডিআইটিকে জমির দখল হস্তান্তর করা হয়। পরবর্তীকালে জমির দখল ঘিরে বিরোধ সৃষ্টি হয় এবং দখল বজায় রাখতে রাজউকের বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত পাঁচটি রিট মামলা করা হয়েছে। ২০০৫ সালে দেলোয়ার হোসেন ব্যাপারী প্রথম রিট (নং ৫৬১০) করেন। একই বছর রাজউকের তৎকালীন ম্যাজিস্ট্রেট রোকন উদ-দৌলার নেতৃত্বে পরিচালিত উচ্ছেদ অভিযান বন্ধে হাইকোর্টে আরেকটি রিট করা হয়। তার পর ২০০৭ সালে ‘মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতি’র পক্ষ থেকে ২১৪১ নম্বর রিটসহ ধাপে ধাপে আরও মামলা দায়ের করা হয়। খোঁজ নিতে গিয়ে দেখা গেছে, এই জমিতে কাঁচাবাজার, মাছ ও মুরগির পাইকারি আড়ত, বাঁশের ব্যবসা এবং একটি বিশাল বস্তি গড়ে উঠেছে। প্রতিদিন ভোরে বিভিন্ন জেলা থেকে আসা পণ্যবাহী ট্রাক এখানে ভিড় করে এবং দিনভর চলে বেচাকেনা। স্থানীয়দের অভিযোগ, জমিতে স্থায়ী-অস্থায়ী দোকান বসিয়ে নিয়মিত স্পটভাড়া আদায় করা হয়, যা থেকে মাসে প্রায় ১৫ কোটি টাকা আয় হয়। স্থায়ী দোকান দেওয়ার আশ্বাসে প্রায় ৬ হাজার মানুষের কাছ থেকে দীর্ঘ সময়ে ৩০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে। কিন্তু স্থায়ী দোকান বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি।

সরেজমিন দেখা গেছে, মূল সড়কের পাশে বাঁশের আড়ত, মাছ ও মুরগির পাইকারি বাজার এবং অস্থায়ী দোকান রয়েছে। ভোরে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মাছ, মুরগি ও বাঁশবোঝাই ট্রাক এসে সেখানে ভিড় করে। সকাল হলেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার খুচরা ব্যবসায়ীদের আনাগোনায় জমজমাট হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। পাশাপাশি গড়ে উঠেছে একটি বড় বস্তি। স্থানীয়দের অভিযোগ, জমিতে স্থায়ী ও অস্থায়ীভাবে দোকান বসানোর বিনিময়ে নিয়মিত স্পটভাড়া আদায় করা হয়। এ খাত থেকে প্রতি মাসে প্রায় ১৫ কোটি টাকা আয় হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। রাজউক জানিয়েছে, মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতির নামে কোনো জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। অথচ সরেজমিন দেখা গেছে, জমির পাশে সমিতির নামে সাইনবোর্ড এবং সেখানে জমির মালিকানা ও আমমোক্তার সংক্রান্ত তথ্য উল্লেখ রয়েছে। এতে জমিটির মালিকানা নিয়ে বিভ্রান্তি ও সাধারণ ব্যবসায়ীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সমিতি সদস্যদের অভিযোগ, স্থায়ী দোকানের আশায় অনেকে সঞ্চয় ভেঙে, কেউ জমি বিক্রি করে, আবার কেউ ঋণ নিয়ে সমিতিতে টাকা জমা দিয়েছেন। কিন্তু বছরের পর বছর পার হলেও দোকান পাননি তারা। সদস্যদের কেউ কেউ দাবি করেন, তাঁদের জমা দেওয়া অর্থেরও কোনো স্বচ্ছ হিসাব নেই। সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহীন বলেন, ‘সব জায়গাই বাজার সমিতির দখলে নেই। বাজার সমিতির নামে মিথ্যাচার করা হচ্ছে। বাজার কমিটি ৫ শতক জায়গা ক্রয় করেছিল দীর্ঘদিন আগে। বাকি ১.৮৯ শতক জায়গা চাওয়া হয়েছে। তবে আলাদা আলাদা সাইনবোর্ড টাঙিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি নানা নামে দখল করে আছে।’ সমিতির সদস্য মো. হুমায়ুন কবির জানান, নিজের একটি দোকানের আশায় তিনি দীর্ঘদিন হলো টাকা দিয়েছেন। প্রায় ১৬ বছর পার হলেও দোকান পাননি এবং সদস্যদের বিপুল অর্থেরও কোনো হিসাব পাওয়া যাচ্ছে না। আরেক সদস্য মো. রবিউল ইসলাম জানান, প্রায় ২০ বছর ধরে তিনি সমিতিতে টাকা দিয়েছেন। দোকান পাওয়ার আশা না থাকায় কিস্তি দেওয়া বন্ধ করেছেন, কিন্তু জমা অর্থের কী হয়েছে তা জানেন না।

এ প্রসঙ্গে রাজউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রিয়াজুল ইসলাম বলেন, রাজউকের বিরুদ্ধে অনেক রিট মামলা রয়েছে এবং মামলা পরিচালনার জন্য আইনজীবী নিয়োগ করা আছে। বেদখল জমি যাতে দ্রুত দখলমুক্ত করা যায় আমরা সেদিকে নজর দিয়েছি। সংশ্লিষ্টদের দাবি, জমির মালিকানা ও দখলসংক্রান্ত সব নথি প্রকাশ্যে এনে দ্রুত আইনি নিষ্পত্তি এবং সমিতির আর্থিক লেনদেনের নিরপেক্ষ তদন্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে জমিটি কারা কীভাবে ব্যবহার করছে এবং এর মাধ্যমে কারা আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছে, সেটিও তদন্তের আওতায় আনা জরুরি।