Image description

লাশকাটা ঘরে পড়ে ছিল লাশটি। নাম নেই, ঠিকানা নেই। মর্গের খাতায় তাই পরিচয়- ‘অজ্ঞাত’। পুলিশের কাগজপত্রেও একই পরিচয়। অথচ মৃত্যুর আগে এই মানুষটির পরিচয় ছিল। তিনি ছিলেন কারও সন্তান, বাবা, ভাই কিংবা স্বজন। কোথাও হয়তো তার জন্য অপেক্ষা করছিল একটি পরিবার। ২০২৪ সালের ২ নভেম্বর হবিগঞ্জের মাধবপুরে রেললাইনের পাশ থেকে অজ্ঞাত ওই যুবকের লাশ উদ্ধার করা হয়। তখনো তার পরিচয় জানা যায়নি। পরে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) প্রযুক্তির সহায়তায় জানা যায়, ওই যুবকের নাম তানজিল (২৫)। তিনি নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার দরিকান্দির আনোয়ারের ছেলে। এক সপ্তাহ আগে তিনি রূপগঞ্জে নিখোঁজ ছিলেন।

এরও আগে ২০১৮ সালের ২৯ অক্টোবর রাজধানীর ধানমন্ডির সোবহানবাগে সিএনজিচালিত অটোরিকশার ধাক্কায় গুরুতর আহত হন অজ্ঞাত এক নারী। পুলিশ তাকে অচেতন অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়। দুই দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর তাঁর মৃত্যু হয়। পরে জানা যায়, ওই নারীর নাম সুফিয়া বেগম, বয়স ৫৫ বছর। বাড়ি কিশোরগঞ্জের হেমন্তগঞ্জের মিঠাইমনা গ্রামে। পরিবারের কাছে তিনিও কিছুদিন ধরে নিখোঁজ ছিলেন। সুফিয়ার মতোই দেশের বিভিন্ন এলাকায় অজ্ঞাত লাশ হয়ে পড়ে থাকা মানুষের একটি অংশ আসলে দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ। সময়মতো পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় তাদের দাফন করা হয় অজ্ঞাত হিসেবেই, নামহীন কবরে। তাদের অনেকেই ছিলেন মানসিক ভারসাম্যহীন, ভবঘুরে কিংবা ছিন্নমূল মানুষ। আবার সড়ক ও রেল দুর্ঘটনায় তাদের মৃত্যু হলে পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। সেই সব অজ্ঞাত লাশের পরিচয় খুঁজে বের করার কাজ করছে পিবিআইয়ের ফিঙ্গারপ্রিন্ট আইডেন্টিফিকেশন অ্যান্ড ভেরিফিকেশন সিস্টেম (এফআইভিইএস)।

তবে, বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অজ্ঞাত লাশ শনাক্তের জন্য দেশের সব মানুষের ডিএনএ ডেটাবেস  তৈরির বিকল্প নেই। পিবিআইয়ের সর্বশেষ হিসাব বলছে, ২০১৯ সালের মার্চ থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত প্রযুক্তির সহায়তায় সারা দেশে ৯ হাজার ৪৩১টি অজ্ঞাত লাশের পরিচয় শনাক্তের জন্য কাজ করে। এর মধ্যে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে ২ হাজার ৬৫৭ জন পুরুষ ও ৬৯৮ জন নারীর। অর্থাৎ মোট ৩ হাজার ৩৫৫টি লাশের পরিচয় শনাক্ত হয়েছে। শনাক্তের হার ২৮ দশমিক ১৭ শতাংশ। বাকি ৬ হাজার ৭৭৪টি লাশের পরিচয় এখনো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। অর্থাৎ প্রযুক্তির সহায়তায় পরিচয় মিললেও এখনো বিপুলসংখ্যক অজ্ঞাত লাশের পরিচয় অজানা রয়ে গেছে। তবে শনাক্ত হওয়া লাশগুলোর একটি উল্লেখযোগ্য অংশের সঙ্গে নিখোঁজ মানুষের যোগসূত্র পাওয়া যাচ্ছে।

জানতে চাইলে পিবিআই প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মোস্তফা কামাল বলেন, অজ্ঞাত লাশ উদ্ধারের পর প্রায় ৭০ ভাগের পরিচয় পাওয়া যায় না। আর যাদের পাওয়া যায় তাদের মধ্যে আগে থেকে নিখোঁজ থাকা ব্যক্তি থাকে, খুনের ঘটনাও থাকে এবং দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ারও ঘটনা থাকে। নিখোঁজ ব্যক্তিদের অজ্ঞাত লাশের মধ্যে খোঁজ পাওয়ার বিষয়ে পিবিআই জানায়, ২০২২ সালের ১২ অক্টোবর ময়মনসিংহের কোতোয়ালিতে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান অজ্ঞাত এক ব্যক্তি। পরে তার আঙুলের ছাপ নিয়ে পরিচয় শনাক্ত করেন ময়মনসিংহ পিবিআইয়ের এসআই লোকমান হোসেন। জানা যায়, ওই ব্যক্তির নাম ইলিয়াস ভূঁইয়া। বাড়ি নরসিংদীর সদর উপজেলার আমলিয়া ইউনিয়নের কান্দাইল গ্রামে। ইলিয়াস মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলেন। স্বজনদের ভাষ্য, তিনি প্রতিবন্ধী কার্ডধারী ছিলেন। এক থেকে দেড় বছর আগে বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার পর কিশোরগঞ্জ থেকে তাকে পাওয়া গিয়েছিল। এরপর দুর্ঘটনায় নিহত হওয়ার প্রায় ছয় মাস আগে আবারও নিখোঁজ হন তিনি।

পিবিআইয়ের সাইবার ক্রাইম অ্যান্ড ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাবে কর্মরত সার্জেন্ট নাভিদ ইমতিয়াজ জানান, অজ্ঞাত লাশ শনাক্তের পদ্ধতি নিয়ে পিবিআই কাজ শুরু করে ২০১৬ সালে। ২০১৮ সালে পুরো ব্যবস্থাটি দাঁড় করানো হয় এবং ২০১৯ সালের মার্চ থেকে এর মাধ্যমে নিয়মিত কাজ শুরু হয়। প্রযুক্তিটির মূল ভিত্তি হচ্ছে ফিঙ্গারপ্রিন্ট। কোনো অজ্ঞাত লাশ উদ্ধার হওয়ার পর তার আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করা হয়। এরপর সেটি জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) তথ্যভান্ডারের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়। পরিচয় পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট থানা ও তদন্ত কর্মকর্তাদের মাধ্যমে স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তবে এই ব্যবস্থারও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যাদের এনআইডি নেই এবং যাদের বয়স ১৮ বছরের কম, তাদের ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তির মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। পিবিআই সূত্র বলছে, ২০১৯ সালের মার্চ থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত অজ্ঞাত লাশের পরিচয় শনাক্ত হওয়ার পর ২৪৮টি হত্যা মামলা হয়েছে। এর মধ্যে পুরুষ ভুক্তভোগী ১৭১ জন এবং নারী ৭৭ জন।

অজ্ঞাতই থাকছে বেশির ভাগ : রাজধানীর মহাখালীতে ২০২৩ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর ভোরে ট্রেনে কাটা পড়ে মৃত্যু হয় ১২-১৩ বছর বয়সি তিন শিশুর। দুর্ঘটনার পর খবর পেয়ে লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) মর্গে পাঠায় ঢাকা রেলওয়ে থানা পুলিশ। এরপর প্রায় তিন সপ্তাহ লাশগুলো মর্গে পড়ে থাকলেও নিহতদের পরিচয় শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। পরে লাশগুলো অজ্ঞাত বা বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করে আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম। ঘটনার দুই বছর পেরিয়ে গেলেও নিহত ওই শিশুরা অজ্ঞাতই রয়ে গেছে। জানা গেছে, ২০২১ সাল থেকে গতবছর এপ্রিল পর্যন্ত শুধুমাত্র ঢাকা শহরেই ২ হাজার ১৩৭টি অজ্ঞাত লাশ দাফন করে আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম। এর মধ্যে ২০২১ সালে ৪৬৫টি, ২০২২ সালে ৪৪৩টি, ২০২৩ সালে ৪৮৬টি, ২০২৪ সালে ৫৫৮টি এবং গতবছরের এপ্রিল পর্যন্ত ১৮১টি অজ্ঞাত লাশ দাফন করা হয়েছে।

ডিএনএ ডেটাবেস তৈরির বিকল্প নেই : অপরাধ বিশেষজ্ঞ মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ওমর ফারুক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, পরিচয় শনাক্ত না হওয়া লাশের অধিকাংশই পচনশীল অবস্থায় উদ্ধার হয়। এতে করে ফিঙ্গারপ্রিন্টের মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত হয় না। আমাদের দেশে ফরেনসিক টেস্টের দুর্বলতার কারণে কোনো ক্লু পাওয়া যায় না। ডিএনএ সংরক্ষণ করা হলেও ক্রসম্যাচে স্বজন পাওয়া যায় না। দিনদিন অজ্ঞাত লাশের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় পুলিশও গুরুত্ব কমিয়ে দিয়েছে। এক্ষেত্রে জাতীয়ভাবে প্রতিটি নাগরিকের ডিএনএ ডেটাবেস তৈরি ছাড়া বিকল্প নেই। জন্মনিবন্ধনের সঙ্গেই ডিএনএ প্রোফাইল করা বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।