Image description

তীব্র শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় দুই বছরের আলিফ হোসেনকে রাজধানীর শ্যামলীতে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়েছে। কুমিল্লার মুরাদনগর থেকে আলিফের বাবা-মা ঢাকা এসেছেন ছেলের চিকিৎসার জন্য। আলিফের বাবা আবদুল হাই বলেন, ‘ছেলের হার্টে ত্রুটিসহ বিভিন্ন জটিলতা আছে। শ্বাসকষ্ট তীব্র হলে, চিকিৎসকরা ঢাকার শিশু হাসপাতালে রেফার্ড করেন। কিন্তু এখানে পৌঁছে দেখি শয্যা ফাঁকা নেই। শ্বাসকষ্টের জন্য জরুরি ভিত্তিতে ছেলেকে বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করাই। দুই দিন পরে শিশু হাসপাতালে সিট পেয়েছি। ঢাকায় থাকা, খাওয়া, চিকিৎসার খরচ সামলাতে ঋণ করতে হচ্ছে।’ অথচ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে কুমিল্লার পদুয়ার বাজারে ঝকঝকে ২০০ শয্যার শিশু হাসপাতাল ভবন পড়ে আছে। এসব হাসপাতাল ভবন সর্বনিম্ন ১০ মাস থেকে সর্বোচ্চ ছয় বছর ধরে অব্যবহৃত অবস্থায় আছে। অরক্ষিতভাবে পড়ে থাকায় জৌলুস হারাচ্ছে এসব দালানকোঠা।

গত ১০ মে এরকম অব্যবহৃত বরিশাল, খুলনা, রংপুর, রাজশাহী এবং কুমিল্লা শিশু হাসপাতাল চালুর নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। কিন্তু তবুও এই পাঁচ শিশু হাসপাতাল চালুতে দেখা গেছে ধীরগতি। কোথাও যন্ত্রপাতি পৌঁছেনি, আবার কোথাও আসবাবপত্র। এখনো জনবল নিয়োগ হয়নি। খুলনায় উদ্বোধনের আগেই বেজমেন্টে দেখা দিয়েছে ফাটল, লোহালস্করে ধরছে মরিচা। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘পাঁচ শিশু হাসপাতাল চালুর সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। অক্টোবরে চালু করার চেষ্টা চলছে। এই পাঁচটি হাসপাতালের জন্য প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র ও যন্ত্রপাতি পৌঁছানো হচ্ছে। প্রতিটি হাসপাতালে ১ হাজার ৪৭৫ জন করে জনবল প্রয়োজন। পূর্ণ জনবল বরাদ্দ করার জন্য ইতোমধ্যেই প্রধানমন্ত্রী জনপ্রশাসন মন্ত্রীকে নির্দেশনা দিয়েছেন।’

কুমিল্লা ২০০ শয্যার শিশু হাসপাতাল : জানা যায়, প্রায় ১০ মাস আগে কুমিল্লা শিশু হাসপাতাল ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। ২০০ শয্যার এই শিশু হাসপাতাল উদ্বোধন হবে বলে মাসখানেক ধরে আলোচনা হচ্ছে। তবে এখনো কোনো জনবল নিয়োগ হয়নি। আসেনি যন্ত্রপাতি ও আসবাবপত্র। কুমিল্লার সিভিল সার্জন ডা. জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘উদ্বোধন হবে বলে আমরাও শুনছি। তবে সেই পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি। ঢাকা অফিস এটার বিষয়ে সরাসরি কাজ করছে।’

বরিশাল শিশু হাসপাতাল : প্রায় এক বছর আগে বরিশাল শিশু হাসপাতাল ভবনের কাজ শেষ হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশের পরও সহসাই বুঝে নেওয়া (হ্যান্ডওভার) হচ্ছে না এই শিশু হাসপাতাল। হাসপাতালটি বুঝে নেওয়ার জন্য বরিশাল স্বাস্থ্য বিভাগীয় পরিচালককে নির্দেশনা দিয়েছে মন্ত্রণালয়। গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ফয়সাল আলমের অসুস্থতায় হস্তান্তর প্রক্রিয়াটি কিছুটা পিছিয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। এতে দক্ষিণাঞ্চলের একমাত্র বিশেষায়িত এ শিশু হাসপাতালের কার্যক্রম শুরু পিছিয়ে পড়েছে। 

নগরীর আমানতগঞ্জ এলাকায় প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে ২০০ শয্যার বিশেষায়িত এই শিশু হাসপাতাল। বরিশাল স্বাস্থ্য বিভাগীয় পরিচালক ডা. রেফায়েতুল হায়দার বলেন, ‘স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে হাসপাতালটি বুঝে নেওয়ার জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছে। অপ্রত্যাশিতভাবে গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী অসুস্থ হওয়ার কারণে হাসপাতালটি বুঝে নিতে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে। হাসপাতাল বুঝে নেওয়ার পরই কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হবে না। প্রয়োজনীয় জনবল, চিকিৎসা সরঞ্জাম, আসবাবপত্রসহ আরও অনেক আনুষঙ্গিক বিষয় প্রয়োজন হবে। প্রয়োজনীয় চাহিদাও দেওয়া হয়েছে।’

খুলনা শিশু হাসপাতাল : খুলনা শিশু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয় প্রায় ১০ বছর আগে। এই বিভাগীয় শিশু হাসপাতাল প্রকল্পের কাজ কাগজেকলমে শেষ হয়েছে দেড় বছর আগে। যেকোনো মুহূর্তে হস্তান্তর। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা গেছে নির্মাণকাজে রয়েছে নানা অসঙ্গতি। দরপত্র অনুযায়ী কাজ করেনি ঠিকাদার। শুধু তাই নয়, কাজ শেষ হতে না হতেই হাসপাতালে জরুরি বিভাগে প্রবেশপথে বেজমেন্টে ফাটল ধরেছে। কাজ শেষ বললেও এখনো নিরাপত্তা প্রাচীর, প্রধান ফটক নির্মাণ ও কাঙ্ক্ষিত ভূমি উন্নয়ন কিছুই করা হয়নি। ১২৫০ কেজি প্যাসেঞ্জার কাম বেড লিফটে মালামাল ও বৈদ্যুতিক সাব-স্টেশন নির্মাণকাজের ৩০০ কেভিএ জেনারেটর স্থাপন করা হয়নি। বিভিন্ন ফিটিংসে এরই মধ্যে মরিচা ধরছে।

গত ১ জুন হাসপাতাল নির্মাণকাজ যাচাই কমিটির সুপারিশে বলা হয় নির্মাণকাজে ৬টি দরপত্রে সরবরাহ করা মালামালের সংখ্যায় গরমিল আছে। নির্মাণকাজ যাচাই কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তরের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. এস এম শাহরিয়ার। তিনি বলেন, নির্মাণকাজে ত্রুটি ও অসঙ্গতিগুলো লিখিত আকারে বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কাজে জমা দেওয়া হয়েছে।’ নির্মাণ কার্যক্রম যাচাই টেকনিক্যাল কমিটি সদস্য ও সিভিল সার্জন ডা. মাহফুজা খাতুন জানান, কাজ শেষ হলেও সীমানা প্রাচীর, প্রধান ফটক নেই। চারপাশ ফাঁকা রয়েছে। বেশ কিছু জায়গায় অসম্পূর্ণতা রয়েছে। তবে খুলনা গণপূর্ত বিভাগ-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুল হাসান বলেন, প্রজেক্টের শতভাগ কাজ শেষ হয়েছে বলেই হস্তান্তর করা হয়েছে। বাউন্ডারি ওয়াল, প্রধান ফটক ও ভূমি উন্নয়নে বরাদ্দ কম ছিল।

রাজশাহী শিশু হাসপাতাল : রাজশাহী ২০০ শয্যাবিশিষ্ট শিশু হাসপাতাল চালুর ব্যাপারে তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। অথচ প্রায় তিন বছর ধরে খালি হাসপাতাল ভবন পড়ে আছে। রাজশাহী বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. হাবিবুর রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘হাসপাতালের যন্ত্রপাতি কিংবা জনবল কবে নাগাদ আসবে জানা নেই। আসবাবপত্র কিছুদিনের মধ্যে আসতে পারে।’  

রংপুর শিশু হাসপাতাল : ছয় বছর আগে রংপুর ১০০ শয্যাবিশিষ্ট আধুনিক শিশু হাসপাতালের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। জানা গেছে, এ হাসপাতাল চালুর প্রস্তুতি নিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য উপপরিচালক ডা. ওয়াজেদ আলী বলেন, হাসপাতাল চালুর বিষয়ে সব জটিলতা কেটে গেছে। গত সপ্তাহে এক ট্রাক আসবাবপত্র এসেছে। বাকি যন্ত্রপাতি ও আসবাবপত্র এলে দ্রুত হাসপাতালটি চালু করা হবে।

[প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন নজরুল মৃধা, রংপুর; শামসুজ্জামান শাহীন, খুলনা; সাইদ মেমন, বরিশাল; কাজী শাহেদ, রাজশাহী; মহিউদ্দিন মোল্লা, কুমিল্লা]