এক হাতে অক্সিজেন মাস্ক, অন্য হাতে ঝুলে থাকা স্যালাইনের বোতল। কোলে তিন বছরের সংকটাপন্ন শিশু। আর পাশে এক স্বজন বহন করছেন ভারী অক্সিজেন সিলিন্ডার—এভাবেই রোগীকে নিয়ে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের দিকে দিশেহারা হয়ে ছুটছেন স্বজন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এমন এক ভিডিওকে ঘিরে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্বাস্থ্যসেবার অব্যবস্থাপনা নিয়ে সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
স্বজনের অভিযোগ, মুমূর্ষু শিশুটিকে দ্রুত জরুরি বিভাগে নেওয়ার জন্য স্ট্রেচার বা ট্রলি চাওয়া হলে কর্মচারীরা টাকা দাবি করেন। দাবি করা টাকা দিতে না পারায় ট্রলি মেলেনি। বাধ্য হয়ে
শিশুটিকে কোলে নিয়েই স্বজনদের ওয়ার্ডের দিকে ছুটতে হয়েছে। পরে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়ার পথে শিশুটির মৃত্যু হয়।
মারা যাওয়া শিশুটির নাম সাফা মারওয়া, সে ফরিদপুর সদর উপজেলার কানাইপুর ইউনিয়নের হোগলাকান্দি গ্রামের রবিন শেখের মেয়ে।
জানা গেছে, বাড়ির সামনের সড়কে শিশু সাফা মারওয়াকে একটি অটোরিকশা চাপা দিয়ে পালিয়ে যায়। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তাকে দ্রুত ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসেন পরিবারের সদস্যরা। চিকিৎসকের কাছে দ্রুত পৌঁছানোর জন্য জরুরি বিভাগ থেকে একটি ট্রলির প্রয়োজন ছিল। কিন্তু অভিযোগ ওঠে, এ সময় ট্রলি চাইলে টাকা দাবি করা হয়। তাৎক্ষণিক টাকা দিতে না পারায় ট্রলি দেয়নি। শেষমেশ কোনো উপায় না দেখে শিশুটিকে কোলে তুলে নিয়েই অক্সিজেন ও স্যালাইন ঝুলিয়ে জরুরি বিভাগের দিকে দৌড়াতে হয় স্বজনদের।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ৩২ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, এক ব্যক্তি মুমূর্ষু শিশুটিকে কোলে নিয়ে ছুটছেন। শিশুর মুখে তখন অক্সিজেনের মাস্ক লাগানো। সঙ্গে থাকা অন্য দুজন যথাক্রমে ভারী অক্সিজেন সিলিন্ডার ও স্যালাইনের বোতল হাতে নিয়ে দৌড়াচ্ছেন। হাসপাতালের এমন চরম অব্যবস্থাপনা নিয়ে স্বজন ও উপস্থিত সাধারণ মানুষকে ক্ষোভ প্রকাশ করতে শোনা যায়।
শিশুটির বাবা রবিন শেখ মঙ্গলবার বিকেলে বলেন, ‘অটোরিকশা চাপা দিলে আমার মেয়েকে নিয়ে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যাই। প্রথমে ইমার্জেন্সি থেকে অক্সিজেন ও স্যালাইন পুশ করানো এবং পরে সেখানকার ট্রমা সেন্টার থেকে হাতে ব্যান্ডেজ করানো হয়। তিন বছরের এই শিশুকে এখান থেকে ওখানে নেওয়ার জন্য ট্রলি দরকার হলেও আমরা হাসপাতালে ট্রলি পাইনি। আমার বাচ্চাটা এমন কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে, কিন্তু নার্সরা কি স্বাভাবিক গল্পগুজবে মশগুল। আমাদের চিল্লাচিল্লিতে তাদের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘এমন মুমূর্ষ রোগীকে ডাক্তাররা তেমন কোনো চিকিৎসা না দিয়েই ঢাকা রেফার করে দিলেন। এত অসুস্থ মানুষ নিয়ে ঢাকায় যাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আমার তিন বছরের মেয়েটি পথেই গাড়ির মধ্যে মারা গেল। এই কষ্টের কথা আমি কাকে বলব!’
তবে টাকার জন্য ট্রলি না দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মানষ কৃষ্ণ কুণ্ডু। তিনি বলেন, এ অভিযোগ পাওয়ার পর আমি সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের দায়িত্বরত নার্স ও ওয়ার্ড বয়দের সঙ্গে কথা বলেছি, রোগীর স্বজনদের অভিযোগ সঠিক নয়। শিশুটির শারীরিক অবস্থা ঝুকিপূর্ণ ছিল, তাই ট্রলিতে তাকে নেওয়া হলে তা আরও বেশি ঝুকিপূর্ণ হতো বলে নার্সরা শিশুটিকে ট্রলিতে নিতে বারন করেছেন। এর বেশি কিছু নয়।