Image description

রাজধানীর সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশার হঠাৎ অনুপস্থিতিতে মূল সড়কগুলোতে অন্যান্য যানবাহনের চলাচলের পরিবেশ ছিল বেশ স্বাভাবিক। পথচারীরাও স্বস্তিতে চলাচল করেছেন। রিকশা কম থাকায় এবং বাস সংকট বা রাইড শেয়ারিংয়ের বেশি চাহিদার কারণে স্বল্প দূরত্বে যাতায়াতকারী ও সাধারণ যাত্রীদের হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়েছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশা এবং এর অবৈধ কারখানা ও গ্যারেজ বন্ধের উদ্যোগ নেয়ায় মহানগরীতে যানজট কমে যায়। কিন্তু ব্যাটারিচালিত রিকশার চালকদের ‘রাজনৈতিক কার্ড’ হিসেবে ব্যবহার করে রাস্তায় নামানো হয়। গুলশান, বনানী ও জাতীয় প্রেসক্লাব এলাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশার চালক ও মালিকরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ ও ধর্মঘট পালন করে।

মূলত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে ফেরার হুমকি এবং জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের লংমার্চ কর্মসূচি দেশকে রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা একই সুতায় গাঁথা। ডিসেম্বরে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টির অপচেষ্টা চলছে। আর যেটা ব্যাটারিচালিত রিকশার নামে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছাত্রলীগ-যুবলীগ-শ্রমিক লীগ, মজদুর লীগ, আওয়ামী লীগের আর্থিকভাবে দুর্বল নেতাকর্মীদের নামানো হচ্ছে। আর সে আন্দোলনে ‘বাতাস’ দিচ্ছে বিরোধী দল। বিগত আওয়ামী লীগ আমলে শিবির যেমন গুপ্ত আন্দোলন ও অবরোধ করেছে। বর্তমান সরকারের সময়ে তেমনি আওয়ামী লীগ দেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য গুপ্তভাবে ব্যাটারিচালিত রিকশার চালক-মালিক ও শ্রমিকসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে পরিস্থিতি অস্থির করার অপচেষ্টা করছে।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগের ইউনিয়ন, ওয়ার্ড, পৌরসভা ও উপজেলা পর্যায়ের অনেক নেতাকর্মী আত্মগোপনে রয়েছেন। তাদের একটি অংশ পরিচয় গোপন করে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে অবস্থান করছেন। এরই মধ্যে ব্যাটারিচালিত রিকশাকে কেন্দ্র করে রাজধানী ও আশপাশ এলাকায় তৈরি হওয়া আন্দোলন নতুন করে রাজনৈতিক ইস্যু সৃষ্টি করেছে। অভিযোগ রয়েছে, আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী লীগের কিছু নেতাকর্মী নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় আড়াল করতে ঢাকায় এসে ব্যাটারিচালিত রিকশা চালানোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। আবার কেউ কেউ সরাসরি রিকশার মালিকানা, গ্যারেজ পরিচালনা কিংবা ব্যাটারিচালিত রিকশার ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছেন। আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের একাংশ ব্যাটারিচালিত রিকশার চালকরা বলছেন, এটি মূলত জীবিকার জন্য নিজেদের আন্দোলন। কিন্তু অন্যপক্ষ বলছে, সাধারণ চালক ও মালিকদের অসন্তোষকে ব্যবহার করে কয়েকটি রাজনৈতিক দল নিজেদের স্বার্থে আন্দোলনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে।

সাম্প্রতিক সময়ে আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের কেউ কেউ রাজধানীতে এসে ব্যাটারিচালিত রিকশা চালানোর আড়ালে অবস্থান করছেন। তাদের উদ্দেশ্য নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় গোপন রেখে নিরাপদে থাকা। এমনকি কেউ কেউ রিকশা গ্যারেজ, রিকশা ভাড়া দেয়া এবং চালকদের সংগঠিত করার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। কোনো কোনো ব্যক্তি রাজনৈতিক পরিচয় গোপন করে এ পেশায় যুক্ত হয়েছেন। এদিকে ডিসেম্বর মাসে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফিরবেনÑ এমন একটি আলোচনা বিভিন্ন মহলে ছড়িয়ে পড়েছে। এই দাবির কোনো বাস্তব সম্ভাবনা না থাকলেও এ ধরনের গুঞ্জনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টির আশঙ্কার কথাও বলা হচ্ছে। শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়টি সামনে রেখে ব্যাটারিচালিত রিকশা চালক ও মালিকদের আন্দোলনে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তাদের ব্যবহার করে বৃহত্তর আন্দোলনের ক্ষেত্র তৈরি করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

এছাড়া ব্যাটারিচালিত রিকশার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপির ভূমিকা নিয়েও রাজনৈতিক মহলে রয়েছে নানা গুঞ্জন। সরকারবিরোধী বিভিন্ন কর্মসূচিতে প্রত্যাশিত রাজনৈতিক সাফল্য না পাওয়ার পর নতুন ইস্যুতে জনসম্পৃক্ততা তৈরির চেষ্টা করছে এসব দলের নেতাকর্মীরা। ব্যাটারিচালিত রিকশার মালিক ও চালকদের অসন্তোষকে রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ দেয়ার চেষ্টা করা হলে তা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করতে পারে। বিশেষ করে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে বড় ধরনের জমায়েত বা অবরোধ তৈরি হলে সাধারণ মানুষের চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা থাকে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজধানীর অলিগলি থেকে প্রধান সড়ক পর্যন্ত ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় যান চলাচলের শৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়েছে। এসব রিকশার বেপরোয়া চলাচল, হঠাৎ লেন পরিবর্তন, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা এবং প্রধান সড়কে প্রবেশের কারণে যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। রাজধানীর ব্যস্ত সড়কে একদিকে দ্রুতগতির বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরসাইকেল ও পণ্যবাহী যান অন্যদিকে ধীরগতির রিকশা ও ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যান সব মিলিয়ে সৃষ্টি হচ্ছে হ-য-ব-র-ল অবস্থা। বিশেষ করে সড়কের নির্ধারিত লেন বা চলাচলের নিয়ম না মেনে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করছে। সড়ক ব্যবস্থাপনায় আরেকটি বড় সমস্যা হলো একই সড়কে ভিন্ন গতির যানবাহনের অবাধ চলাচল। দ্রুতগতির যানবাহনের সঙ্গে ধীরগতির যান একই জায়গায় চললে সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়ে। ব্যাটারিচালিত রিকশার ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। এসব যান যদি নির্দিষ্ট গতি ও নির্দিষ্ট সড়কে চলাচল করে, তাহলে এক ধরনের শৃঙ্খলা তৈরি করা সম্ভব। কিন্তু অনুমোদনহীনভাবে প্রধান সড়কে প্রবেশ, বিপরীতমুখী চলাচল বা ট্রাফিক সংকেত অমান্য করার প্রবণতা থাকলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকেই যায়।

ব্যাটারিচালিত রিকশা বিস্তারের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো দেশের বিভিন্ন গ্রাম ও জেলা থেকে মানুষ রাজধানীতে এসে এই পেশায় যুক্ত হচ্ছেন। রাজধানীতে তুলনামূলক বেশি উপার্জনের প্রত্যাশা অনেককে ঢাকামুখী করছে। প্রথমে একজন আত্মীয় বা পরিচিত ব্যক্তি ঢাকায় এসে রিকশা চালানো শুরু করেন। কিছুদিন পর তিনি নিজের পরিবারের সদস্য, আত্মীয় বা গ্রামের পরিচিত অন্য ব্যক্তিদের রাজধানীতে নিয়ে আসেন। ফলে ধীরে ধীরে একটি নেটওয়ার্ক তৈরি হয়। গ্রামের একজনের মাধ্যমে অন্যরা ঢাকায় এসে রিকশা চালানোর কাজে যুক্ত হন। ব্যাটারিচালিত রিকশার বিস্তারের সঙ্গে শুধু যানবাহনের সংখ্যা বাড়েনি, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিপুলসংখ্যক নতুন চালক। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এমন অনেক চালক রয়েছেন যারা আগে অন্য পেশায় যুক্ত ছিলেন। কেউ দিনমজুরি করতেন, কেউ ছোট ব্যবসা করতেন, কেউ নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন, আবার কেউ বিভিন্ন ধরনের পরিবহনসেবার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তুলনামূলক সহজে আয় করার সুযোগ থাকায় তাদের অনেকে আগের পেশা ছেড়ে ব্যাটারিচালিত রিকশা চালানোকে বেছে নিয়েছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে শুধু একটি নির্দিষ্ট যান বন্ধ করাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সমন্বিত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, নির্দিষ্ট রুট নির্ধারণ, চালকদের প্রশিক্ষণ, যানবাহনের নিবন্ধন ও ফিটনেস নিশ্চিত করা এবং সড়কের ধারণক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গণপরিবহন পরিকল্পনা। ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা, রুট ও চলাচলের সময় নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। ব্যাটারিচালিত রিকশাকে কেন্দ্র করে আন্দোলন ভবিষ্যতে কোন দিকে যাবে, তা নির্ভর করবে সরকারের নীতি, আদালতের সিদ্ধান্ত, স্থানীয় প্রশাসনের পদক্ষেপ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থানের ওপর। রাজধানীর সড়কের ধারণক্ষমতা সীমিত। এই সীমিত সড়ক অবকাঠামোর ওপর যখন বিপুলসংখ্যক ধীরগতির যানবাহন চলাচল করে, তখন পুরো পরিবহন ব্যবস্থার ওপর তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ফলে একদিকে গণপরিবহন স্বাভাবিক গতিতে চলতে পারে না, অন্যদিকে ব্যক্তিগত গাড়ি ও অন্যান্য যানবাহনের যাত্রার সময়ও বেড়ে যায়।

ব্যাটারিচালিত রিকশার চালক হাফিজ ইনকিলাবকে বলেন, আগে তিনি একটি যাত্রীবাহী বসের হেলপার ছিলেন। ব্যাটারিচালিত রিকশা চালানো শুরু করার পর প্রতিদিন আয় করার সুযোগ তৈরি হয়েছে তার। আর ঝামেলাও কম। রিকশা চালিয়ে প্রতিদিন নগদ আয় করার সুযোগ রয়েছে। নিজের সময় অনুযায়ী কাজ করা যায়। নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানের অধীনে চাকরি করার প্রয়োজন হয় না। তবে ঢাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশার চলাচল সব সড়কে না দিয়ে নির্দিষ্ট সড়কে করে দেয়া প্রয়োজন।

সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানিয়েছেন, ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণে নীতিমালা তৈরি হচ্ছে। জোনভিত্তিক নির্দিষ্ট এলাকায় নির্দিষ্টসংখ্যক রিকশা চলতে পারবে তবে মূল সড়কে চলতে দেয়া হবে না।
বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) প্রফেসর ড. হাদিউজ্জামান ইনকিলাবকে বলেন, ব্যাটারিচালিত রিকশা ঢাকার ক্যান্সারে পরিণত হয়েছে। অবাধে পঙ্গপালের মতো সড়কে নামছে কোনো নিয়মনীতির মধ্যে নেই এগুলো। চালকের কোনো প্রশিক্ষণ নেই, লাইসেন্স নেই। অটোরিকশা কিনতে কোনো কাগজপত্র লাগছে না, ফলে কালো টাকা বিনিয়োগ হচ্ছে। তারা একটা সিএনজির দাম দিয়ে অনেকগুলো অটোরিকশা কিনতে পারছে। রাজধানী ও আশপাশ এলাকায় অসংখ্য অটোরিকশা তৈরির গ্যারেজ গড়ে উঠেছে। সড়ক থেকে মূল সড়কে এখন তারা মহাসড়কে চলে এসেছে। অটোরিকশাগুলোর চার্জিং পয়েন্টে বাসা-বাড়ির নামে বৈদ্যুতিক সংযোগ এনে তা বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করছে। ব্যাটারিরিকশাগুলো সড়কে যানজট থেকে শুরু করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে।